আমাদের হাসপাতালে প্রথম রোগী আসে ১৭ জুলাই। সেদিন আমরা চার-পাঁচজন রোগী পেয়েছিলাম। পরদিন অর্থাৎ ১৮ জুলাই ছিল রক্তস্নাত একটি দিন। সেদিন আমার অটিতে (অপারেশন থিয়েটার) ডিউটি ছিল। দুপুরের দিকে আমার এক সহকর্মী এসে আমাকে বলে, ‘‌নীলা দ্রুত নিচে আয়, দেখ এখানে নরকের দরজা খুলে গেছে। নিচতলায় পৌঁছেই দেখি শত শত বাচ্চা। তাদের সবার বয়স ১৪-২৫-এর মধ্যে। কেউ এক চোখ চাপা দিয়ে রেখেছে, কেউ-বা দুই চোখ। আর সারা শরীরে পিলেট। প্রতি ১০ সেকেন্ড পর পরই রোগী আসছিল। ১৮ জুলাই আমরা রাত প্রায় ১০টা পর্যন্ত সার্জারি করেছি। ১৯ জুলাইয়েও সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত টানা সার্জারি হয়েছে। এ দুদিন মিলিয়ে আমরা প্রায় ২০০ জন রোগীর সার্জারি করেছি। পরবর্তী সময়ে ২০-২১ জুলাই কারফিউ চলাকালীনও প্রচুর রোগী এসেছে হাসপাতালে। একই ধরনের সিনারিও হয় ৩, ৪ ও ৫ আগস্ট। কারো এক চোখে, কারো দুই চোখেই পিলেট। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো এগুলো কোনোটাই রাবারের ছিল না। আমাদের হাসপাতালে যেসব সার্জারি হয়েছে সবই ছিল মেটালিক পিলেট আর কিছু রিয়েল বুলেটও পেয়েছি। আমাদের চোখে একটা বালুকণা ঢুকলেই কত অস্বস্তি হয়, সেখানে তাদের চোখে অত্যন্ত দ্রুতগতির ও গরম মেটালিক পিলেট ঢুকেছে। এতে তাদের চোখের রেটিনা, কর্নিয়া মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। ১৮ জুলাই আমরা যখন ওটিতে ব্যস্ত, তখন অপারেশন চলাকালীন একটি ছেলে আমাকে বলে, আন্টি আমার হাতটা একটু ধরেন, আমার অনেক ভয় লাগছে। আমি পুরোটা সময় ওর হাতটা শক্ত করে ধরে বসে ছিলাম।

অভ্যুত্থান চলাকালীন আমাদের ইনস্টিটিউটে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৮৬৪ এবং ভর্তি ছাড়া প্রায় এক হাজার রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। অপারেশন হয়েছে অন্তত ৫৫০ রোগীর। এর মধ্যে ১১ জন আর কখনই পৃথিবীর আলো দেখতে পাবে না, ৪৯৩ জন তাদের এক চোখ হারিয়েছে চিরতরে। ৩ আগস্টের কথা বলছি, সেদিন আমি আর আমার স্বামী দুজনেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছি। আমার স্বামী আমাকে বলে আমরা দুজন দুই জায়গায় দাঁড়াব, যাতে গোলাগুলি হলেও নুসাইবার অন্তত একজন প্যারেন্ট জীবিত থাকে।

জুলাই কেন সফল হয়েছে জানেন, কারণ এখানে সন্তান, বাবা-মা, নানা-নানি একযোগে সবাই ছিলেন। এটা এমন আন্দোলন, যেখানে জিন্স আর বোরকা পাশাপাশি হেঁটেছে। এ একতাকে দমন করার মতো শক্তি পৃথিবীর কোথাও নেই।