যেখানে স্বৈরাচারের চোখ রাঙানিতে সাধারণ মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যায়, ঠিক সেখানেই অবরুদ্ধ জনপদের চাপা ক্ষোভ ও প্রতিবাদের প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে কার্টুনের প্রতিটি আঁচড়। কার্টুন কেবল নিছক বিনোদন নয়; ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকবদল ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে কার্টুন কাজ করেছে এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে।

ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, বন্দুকের নলের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল কার্টুনিস্টদের তুলি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কার্টুনিস্ট ডেভিড লোর আঁকা কার্টুন অ্যাডলফ হিটলারের ফ্যাসিবাদের অসারতাকে এমনভাবে উন্মোচন করেছিল যে হিটলার তাকে তার ব্যক্তিগত ‘হিট লিস্ট’-এ যুক্ত করেছিলেন।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের একটি হাতিয়ার ছিল জোনাথন শাপিরোর কার্টুন। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর হুমকি সত্ত্বেও তিনি আফ্রিকান জনগণের স্বাধীনতার স্বপ্নকে তুলে ধরেছিলেন।

২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’-এ সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে কার্টুনিস্ট আলী ফারজাতের কার্টুনগুলো সাধারণ মানুষকে রাজপথে নামতে সাহস জুগিয়েছিল। স্বৈরশাসকের পেটুয়া বাহিনী তার হাত ভেঙে দিয়েছিল, কিন্তু তার আঁকা প্রতিবাদ স্তব্ধ করতে পারেনি।

আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতায় কার্টুনকে দেখা হয় একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ‘রাজনৈতিক মন্তব্য’ হিসেবে। আমেরিকার ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ এবং ‘পয়েন্টার ইনস্টিটিউট’-এর মতো বিশ্বখ্যাত সাংবাদিকতা বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, ‘‌কার্টুন জার্নালিজম কেবল সংবাদের অলংকরণ নয়; বরং তা সংবাদপত্রের হৃদয় ও মুক্ত গণমাধ্যমের অন্যতম ধারালো অস্ত্র। হাজারটা শব্দ দিয়ে যে কঠিন সত্য ফুটিয়ে তোলা যায় না, একটি সম্পাদকীয় কার্টুন তা এক নিমেষেই স্পষ্ট করে দেয়।’

বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও দেখা যায়, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পটুয়া কামরুল হাসানের আঁকা সেই বিখ্যাত পোস্টার—‘‌এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’—কীভাবে স্বাধীনতাকামী জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। অথচ বিগত দেড় দশকে দেশের সংবাদপত্রের পাতা থেকে চিরচেনা রাজনৈতিক কার্টুনগুলো প্রায় নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল।

এর পেছনে কারণও ছিল সুনির্দিষ্ট ও ভয়াবহ। সে সময়ের কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং লাগামহীন দমন-পীড়নের ফলে সাংবাদিকতা ও শিল্পচর্চায় গ্রাস করেছিল এক দমবন্ধ করা ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’। কার্টুন আঁকার অপরাধে কার্টুনিস্ট আহমেদ কবীর কিশোরকে দিনের পর দিন কারাবরণ করতে হয়েছে, সহ্য করতে হয়েছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক কার্টুন শেয়ার করার কারণেও অনেক তরুণকে গ্রেফতার করা হয়। সংবাদপত্রগুলো এক প্রকার কার্টুনশূন্য হয়ে পড়ে, যা আধুনিক নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার জন্য ছিল এক বড় আঘাত।

দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও ভয়ের দেয়াল ভেঙে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলন বাংলাদেশের কার্টুনিস্টদের এক পরম মুক্তি এনে দেয়। যেন দীর্ঘদিনের অনশন ভেঙে কার্টুনিস্টরা রাজপথে নামেন তাদের ক্যানভাস নিয়ে।

জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোয় রঙতুলি ও ডিজিটাল প্যাডে একেকটি রেখা হয়ে উঠেছিল তরুণদের স্লোগানের প্রতিধ্বনি। ‘বুকের ভেতর তুফান’, ‘রক্ত দিয়ে কেনা স্বাধীনতা’, ‘স্বৈরাচারের পতন’ কিংবা বৈষম্যবিরোধী প্রতিবাদের চিত্রগুলো মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে ওঠে কার্টুনের প্রধান বিকল্প প্লাটফর্ম। অগণিত জ্যেষ্ঠ ও তরুণ কার্টুনিস্টরা রাতারাতি প্রথাগত সেন্সরশিপের দেয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন।

এসব কার্টুনে ফুটে উঠেছিল কীভাবে সাধারণ মানুষের কণ্ঠ স্তব্ধ করা হয়েছিল তার নিখুঁত চিত্রায়ন। ছাত্র-জনতার ওপর চালানো গুলি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ। ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার সংকল্প।

এ প্রতিবাদের চিত্রগুলো স্থান করে নিয়েছিল দেশের অলিগলি ও দেয়ালগুলোয়। ঢাকার দেয়ালগুলো চিত্রিত হয়েছিল নতুন ও প্রবীণ কার্টুনিস্টদের তুলির আঁচড়ে। গ্রাফিতি ও কার্টুনের মিশেলে দেয়ালগুলো হয়ে উঠেছিল মুক্তচিন্তার গ্যালারি। এ তরুণ কার্টুনিস্টরা প্রমাণ করেছেন—শিল্পীকে বন্দি করা গেলেও শিল্পকে কখনই শৃঙ্খলিত করা যায় না।

জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশকে কেবল এক নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই দেয়নি, বরং শিল্পের মাধ্যমে প্রতিবাদের সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব—প্রতিটি মোড়েই কার্টুন ছিল জনতার অধিকার রক্ষার অগ্রভাগে।

আগামী দিনের স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সত্য প্রকাশের লড়াইয়ে কার্টুনিস্টদের এ প্রখর তুলির আঁচড় যে আরো সাহসী এবং আপসহীন ভূমিকা রাখবে, জুলাইয়ের রক্তঝরা দিনগুলো আমাদের সে আশার আলোই দেখিয়েছে।

লেখক: কার্টুনিস্ট