১৯৯১ সাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিশেষ বাঁকবদলের সময়। দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার অবসান, সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরা, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগ মোকাবেলা, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এক গভীর পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। সেই উত্তাল বছরের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন খালেদা জিয়া। নেতৃত্ব, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সংকট মোকাবেলা ও গণতন্ত্র পুনর্গঠনে ভূমিকার কারণে দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রা তাকে ১৯৯১ সালের ‘সেরা ব্যক্তিত্ব ও আলোচিত চরিত্র’ হিসেবে তুলে ধরেছিল।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে চালু হয় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা। সে ব্যবস্থার অবসান ঘটে ১৯৯১ সালে, পঞ্চম জাতীয় সংসদে দীর্ঘ আলোচনার পর একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনী পাসের মধ্য দিয়ে। সংশোধনীতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের প্রধান বিচারপতির পদে প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি হয় এবং সংসদীয় গণতন্ত্র পুনর্বহাল পায়।
১৫ সেপ্টেম্বর গণভোটে ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোটে পরিবর্তিত ব্যবস্থা জনগণের সমর্থনও পায়। গণভোটের পর ১৯ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
এর আগে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচন সামনে রেখে দেশব্যাপী খালেদা জিয়ার গণজোয়ার তৈরি হয়েছিল। মাত্র দুই মাসে তিনি প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনসভায় বক্তব্য রাখেন। নির্বাচনে পাঁচটি আসনে জয়লাভ করে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বে নতুন মাত্রা যোগ করেন তিনি। কিন্তু নির্বাচনোত্তর নেতৃত্ব তার জন্য ছিল চ্যালেঞ্জিং সময়। সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ আমলের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও তীব্র দলীয় টানাপড়েনের মধ্যে তাকে শুরু করতে হয় সরকার পরিচালনা।
প্রধানমন্ত্রিত্বের ৩৯ দিনের মাথায় সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় পতিত হন খালেদা জিয়া। উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস, যাতে লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারায়। নবনির্বাচিত সরকার পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য দ্রুত তৎপরতা শুরু করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক মহলে ত্রাণ কার্যক্রম প্রশংসা পায়। মার্কিন টাস্কফোর্সের প্রধান জেনারেল স্ট্যাকপল ভয়েস অব আমেরিকার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দৃঢ় মনোভাব ও কঠোরতা প্রশংসনীয়। কোনো দুর্নীতি হয়নি, লুটপাটের প্রশ্নই ওঠে না।’
তৎকালীন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার বিদেশী মিশনগুলোয় পাঠানো চিঠি ১৯৯১ সালের নভেম্বরে খালেদা জিয়ার জন্য বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। চিঠিতে সরকারের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ আনা হলে সরকার তা ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী’ উল্লেখ করে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায়। বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের ঝুঁকি তৈরি করে। সমাধান আসে সরকারি প্রেস নোট, পরবর্তী ব্যাখ্যা ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে চিঠিকে কূটনৈতিক মতবিনিময়ের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে।
গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান বছর আরেকটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত। সংসদে দ্বাদশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফেরাকে তিনি রাজনৈতিকভাবে অগ্রাধিকার দেন। সংসদীয় কমিটির কার্যক্রম, প্রশাসনে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, নতুন শিল্পনীতি প্রণয়ন, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান—সব মিলিয়ে তিনি একটি স্থিতিশীল সরকার কাঠামো তৈরি করতে চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে বৈদেশিক সম্পর্কেও দেখা যায় ইতিবাচক পরিবর্তন। গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়।
সব দিক বিবেচনায় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় ও আলোচনার মাধ্যমে ১৯৯১ সালের ‘সেরা ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে নির্বাচিত করে দৈনিক বাংলা। দেশের রাজনৈতিক রূপান্তর, সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, ঘূর্ণিঝড়ে ত্রাণ-তৎপরতা, প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকার বিষয়গুলো উল্লেখ করে পত্রিকাটি।
একই সময়ে সাপ্তাহিক বিচিত্রা তাকে ১৯৯১ সালের আলোচিত চরিত্র হিসেবে উল্লেখ করে। সাপ্তাহিকটির ১৯৯২ সালের ৩ জানুয়ারি সংখ্যার একটি বিশেষ প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘বছরের আলোচিত চরিত্র ’৯১: প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া’। এটি ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালে পরপর দুই বছর খালেদা জিয়াকে বছরের আলোচিত চরিত্র হিসেবে মনোনয়ন দেয়। তাদের ব্যাখ্যায় বলা হয়, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন ধাপে যিনি এককভাবে সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতৃত্ব দেখিয়েছেন, তিনি খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়া ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ২৩টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে একবারও পরাজিত হননি। ফোর্বস ম্যাগাজিন বিশ্বের ১০০ ক্ষমতাধর নারীর তালিকায় তাকে ২০০৪ সালে ১৪তম, ২০০৫ সালে ২৯তম ও ২০০৬ সালে ৩৩তম স্থানে জায়গা দেয়া হয়। ২০১১ সালের ২৪ মে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি সিনেটে তাকে ‘ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি’ হিসেবে সম্মানিত করা হয়।










