বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে সাইফুর রহমানের যে খ্যাতি তা কিন্তু রাজনৈতিক কারণে নয়। আমার মতে, তিনি বাংলাদেশ বিনির্মাণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তার উদ্ভাবনী চিন্তা এবং বাংলাদেশের প্রতি তার যে ভালোবাসা, সে জায়গা থেকে নতুন একটা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি কাজ করেছেন। তিনি মন্ত্রী থাকা অথবা না থাকা অবস্থায় দেশের কথা ভেবেছেন। তিনি ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক। যদিও তিনি অর্থনীতির ছাত্র নন, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে, সংস্কারে, পরিমার্জনে ও অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য যেসব পদক্ষেপ দেশের জন্য ভালো হবে, সেসব পদক্ষেপই তিনি নিয়েছেন।
আমার মনে পড়ে, তিনি যখন প্রথম ভ্যাট শুরু করলেন আমি তখন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি ছিলাম। তখন সব মেম্বার এটার বিরুদ্ধে ছিল। আমি যেহেতু তখন তাদের মুখপাত্র, আমি তার সঙ্গে একমত হতে পারিনি। আমরা এর বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ করেছিলাম। তখন সবাই রীতিমতো মারমুখী অবস্থায় ছিল যে ভ্যাট চালু করা যাবে না, করলে ব্যবসা-বাণিজ্য সব বন্ধ করে দেবে। কিন্তু তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তিনি মনে করতেন, দেশের অর্থনীতি ও রাজস্ব নীতিকে যদি এগিয়ে নিতে হয়, জনগণকে রাজস্ব প্রদানে উৎসাহিত করতে হলে এসব পদক্ষেপ অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে।
একইভাবে তৈরি পোশাক খাতে ব্যাক টু ব্যাক এলসি চালু করেছিলেন তিনি। ওটা যদি না হতো আজকে তৈরি পোশাক খাত এ অবস্থায় আসতে পারত না। বর্তমানে পোশাক রফতানি খাতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। সাইফুর রহমানের বৈপ্লবিক নীতি ও সংস্কারের কারণেই পোশাক খাতে এ উন্নতিগুলো হয়েছে। বর্তমানে ৮৩ শতাংশ রফতানি আয় আসে পোশাক খাত থেকে। এসব নীতি বাস্তবায়নে তিনি কার্যকর ভূমিকা পালন করেছেন, নীতিনির্ধারণ করেছেন।
অতীতে আমাদের অর্থনীতি ছিল পাট শিল্পনির্ভর। সে নির্ভরশীলতা রূপান্তর করা হয়েছিল পোশাক শিল্পে। অবশ্য এখন আমরা আবার অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি পোশাক শিল্পের ওপরে। সেটা উচিত না। এখানে আরো বৈচিত্র্য থাকা উচিত। এটাকে বৈচিত্র্যময় করতে বিভিন্ন নীতিমালা প্রয়োজন ছিল, যা অতীতের সরকারগুলো করতে পারেনি। সে জায়গা থেকে আমরা এখন সাইফুর রহমানের মতো ব্যক্তিত্বের অনুপস্থিতি অনুধাবন করি। কারণ তিনি যে ধরনের বৈচিত্র্যময় পরিবর্তন আনতে পেরেছিলেন, তেমনটা করা না গেলে আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়া কষ্টকর হবে।
সাইফুর রহমান তার অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নতুন নতুন নীতিমালা ও কাঠামো তৈরি করেছেন। বিশ্বব্যাংকের বোর্ড অব চেয়ারম্যানসের তিনি একমাত্র সদস্য ছিলেন, আইএমএফের চেয়ারম্যান ছিলেন। তখন তাকে সংবর্ধনা দিয়েছি। কারণ বাংলাদেশের জন্য এটা অনন্য অর্জন ছিল। তিনি কিন্তু অন্য সাধারণ রাজনীতিবিদের মতো ছিলেন না। তিনি বাস্তববাদী ছিলেন।
মুক্তবাজার অর্থনীতি নিয়েও আমরা তাকে দোষারোপ করেছি। বলেছি যে আপনি সবকিছু উন্মুক্ত করে দিচ্ছেন, আমাদের অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যেতে হবে, আমরা এটার জন্য প্রস্তুত না। তিনি বলতেন, সফলতার এটিই একমাত্র পথ। আজ আমরা দেখতে পাই—মুক্তবাজার অর্থনীতিই বিশ্বের একমাত্র অর্থনীতি।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতেও তিনি অনেক সংস্কার করেছেন। ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল রেখেছেন। অনিয়ম-দুর্নীতিকে শক্ত হাতে দমন করেছেন। তিনি নতুন নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার বিরোধী ছিলেন। এমনকি এ বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও লড়াই করছেন।
আমি মনে করি, সাইফুর রহমানের কাছে আমরা ঋণী। তার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে, তাকে স্মরণ করে, তার কাজগুলোকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা যদি আমরা করি, তাহলে সেটা বাংলাদেশের জন্য বড় পাওয়া হবে।
মাহবুবুর রহমান: প্রেসিডেন্ট, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ










