এম সাইফুর রহমান ১৯৭৬-৭৯ পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় উপদেষ্টা হিসেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি সে সময়টাকে খুব উপভোগ করেছিলেন। যদিও তিনি এ কথা কোনো বইয়ে লিখে যাননি বা কখনো খুব আয়োজন করে বলেননি। তবে পারিবারিক আলাপে, গুণীজনদের সঙ্গে তিনি সে সময়ের কাজের অভিজ্ঞতা প্রায়ই বলতেন। বিশেষ করে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. এমএন হুদা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বিএম আব্বাস, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুহম্মদ শামসউল হক তাদের সঙ্গে কাজ করার যে সুযোগ তার হয়েছিল এবং প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের যে আস্থা তাদের পুরো টিমের ওপর ছিল, সেটা তিনি বেশ উপভোগ করেছেন। তিনি বলতেন, এতে তিনি সামনে এগোনোর, বিশেষ করে রাজনীতিতে আসার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন।
আমি মনে করি, সাইফুর রহমানের রাজনীতিতে আসা যতটা না তার ইচ্ছার কারণে ঘটেছিল, তার চেয়ে বেশি ঘটেছিল দৈবক্রমে। ১৯৭৬-৭৯ ও ১৯৭৯-৮২ দুই সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারীকরণ, তৈরি পোশাক খাত বা গার্মেন্ট শিল্পের সূচনা করা—এ বিষয়গুলো নিয়ে গর্ব করে বলতেন।
তার পরের সময়টা ১৯৯১-৯৫ সাল। তখন তিনি অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। এ মেয়াদে তার কাজের উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো ভ্যাটের সূচনা। ওই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় সম্ভবত আমাদের দেশেই প্রথম ভ্যাট চালু হয়েছিল। ভ্যাট প্রবর্তনের পরবর্তী সময়েই সম্ভবত ঢাকার মেয়র নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হয়। পরাজয়ের মূল কারণ হিসেবে অনেকেই তখন সাইফুর রহমানের ভ্যাট প্রবর্তনের বিষয়টিকে দায়ী করেন। তবু এত কিছুর পরও তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। কারণ তিনি ভ্যাট প্রবর্তনের সুফল সম্পর্কে আশাবাদী ও নিশ্চিত ছিলেন।
২০০১-০৫ সালে তিনি যখন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন, তখন অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সব সরকারই কিন্তু তার অর্থনৈতিক নীতিগুলো বা তৎকালীন সরকারের অর্থনৈতিক নীতিমালাকেই এগিয়ে নিয়ে গেছে। এ কারণেই তিনি বলতেন, দলগতভাবে আমরা যেভাবেই দেখি না কেন, অর্থনৈতিক নীতিমালা বা মডেল কিন্তু একই। ২০০১-০৫ সালে এ ধারাকে আরো ত্বরান্বিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে তিনি বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছিলেন। তিনি প্রায়ই গর্ব করে বলতেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আস্থা এবং মোটা দাগে আমলাতন্ত্রের সহায়তা তিনি পেয়েছেন। এ দুটো কারণেই তিনি অনেক কাজ করতে পেরেছেন।
১৯৮০ সালে নুরুল কাদের ও এমআর সিদ্দিকী গার্মেন্ট শিল্প তৈরির জন্য ব্যাক টু ব্যাক এলসি ও বন্ডের জন্য তাকে রাজি করালেন, তখন তিনি অনুমান করেছিলেন যে এ ইন্ডাস্ট্রি অনেক দূর যাবে। কারণ তিনি বলতেন, আমাদের মেয়েরা খুব সুন্দর সেলাই করতে পারে।
ভ্যাট চালুর সময় একটা গুজব ছিল যে ভ্যাটের বিষয়টি প্রত্যাহার না করলে তাকে পদত্যাগ করতে হবে। কিন্তু তিনি একেবারেই অটল ছিলেন এ বিষয়ে, যা-ই ঘটে যাক ভ্যাট চালু থাকতে হবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর আস্থা তার ওপর ছিল। তিনি মনে করতেন, কোনো রকম রাজনৈতিক চাপ এ ব্যাপারে কাজ করবে না। তার পরও এ গুজবের কিছু সত্যতা ছিল। তখন তিনি পকেটে পদত্যাগপত্র নিয়ে ঘুরতেন। মাস খানেক তিনি এ কাজ করেছিলেন।
তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘এত মন্ত্রী, এত মন্ত্রণালয় এগুলোর খরচ সরকারের জন্য একটা বাড়তি বোঝা!’ আমার যতটুকু মনে পড়ে, তিনি একসময় উদ্যোগ নিয়েছিলেন, ৯-১০টা মন্ত্রণালয় বাদ দিয়ে সবগুলোকে এক জায়গায় আনবেন।
১৯৭৮-৭৯ সাল থেকে যে অর্থনৈতিক মডেলটা তৈরি হয়েছে অর্থাৎ বাজার উদারীকরণ, বেসরকারি খাতকে সমৃদ্ধ করা, সরকারের আকার ছোট করা এগুলোই এম সাইফুর রহমানের সবচেয়ে বড় অর্জন। তিনি চেয়েছিলেন আমাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। সাইফুর রহমানের ভ্যাটের পুরো পরিকল্পনাটা বাস্তবায়ন করার পেছনে শাহ আবদুল হান্নানের বড় অবদান ছিল। তাকে পরবর্তী সময়ে সাইফুর রহমান ডেপুটি গভর্নর করেছিলেন। পারিবারিকভাবে সাইফুর রহমান খুব একটা সামাজিক ছিলেন না। আমি কখনো তার বন্ধুবান্ধব বা তাদের সঙ্গে বসে তাকে আড্ডা দিতে দেখিনি। অনেকে বলেন, তিনি ভীষণ রাগী ছিলেন, কিন্তু তার মনটা অনেক কোমল ছিল। তবে পারিবারিকভাবে আমাদের সব ভাইবোনেরই বাবার সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব ছিল। তিনি আমাদের পরিবারের কাণ্ডারি হলেও প্রকৃতপক্ষে আমাদের মা সবাইকে আগলে রাখতেন।
পিতা এবং রাজনীতিবিদ ও অর্থনীতিবিদ সাইফুর রহমান একরকম নন। পারিবারিকভাবে তিনি খুব একটা সামাজিক ছিলেন না তা আগেও বলেছি। তাই তার সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার স্মৃতি আমাদের বেশ কম। ২০০৮ সালে সম্ভবত আমার ছোট ভাইকে আমি বলেছিলাম, ‘বাবাকে নিয়ে চলো আমরা ঘুরতে যাই, সম্ভবত এটাই বাবাকে নিয়ে শেষ ঘুরতে যাওয়া হবে।’ আমার এ কথাই সত্যি হয়েছিল। চিকিৎসার জন্য তিনি কুয়ালালামপুরে ছিলেন তখন, আমরা দুই ভাই ও আমাদের পরিবার মিলে দুদিনের জন্য সেখানে গিয়েছিলাম। এটাই বাবার সঙ্গে আমার একমাত্র ছুটি কাটানোর স্মৃতি। ছোটবেলায় আমাদের নিয়ে বাবার ছুটি কাটানোর বিষয়টা ছিল একেবারেই সিলেট ও চট্টগ্রামনির্ভর। সেটাও আমরা জোর করে সঙ্গে যেতাম, তিনি তার কাজে যাওয়ার সময়। আমরা মায়ের সঙ্গে অনেক জায়গায় গিয়েছি, কিন্তু বাবার সঙ্গে যাওয়া হয়নি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন বাবা মনে করতেন আমরা কলেজে পড়ি। তার ঠিক জানা ছিল না, আমরা কে কোথায় পড়ছি।
অনেকেই মনে করতেন, তিনি একগুঁয়ে ছিলেন। কিন্তু তিনি আসলে সবার কথা শুনতেন। তার অনেক সমালোচক তার প্রিয়ভাজন ছিলেন। একজনের নাম বলতে পারি ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি কিন্তু বাবার কড়া সমালোচক ছিলেন। তার পরও বাবা তাকে বেশ সমীহ করতেন। তিনি সবসময় তার মতামতটা জানাতেন, সে কারণে হয়তো অনেকে তাকে ভুল বুঝত। তিনি স্পষ্টবাদী ছিলেন। যেটা মনে আসত সেটাই বলতেন। এ কারণে সরকারি কর্মকর্তারাও তার ওপর আস্থা রেখেই কাজ করতেন। তারা জানতেন, বকাবকি হলেও চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে না।
ছাত্রজীবনে তিনি রাজনীতি করতেন না, কিন্তু একটা সংগঠনের সদস্য ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে নিজের অংশগ্রহণকে তিনি কোনোদিন অতিরঞ্জিত করেননি। তিনি মনে করতেন, এটা সব ছাত্রের দায়িত্ব ছিল।
বাবার সঙ্গে আমার অনেক মজার স্মৃতি আছে। তিনি ১৭ বছর সরকারি কর্মচারী ছিলেন। অনেক ঘটনাই আছে। তার মধ্যে দু-একটা বলি। আলুর দাম ৫০ পয়সা বেড়ে গিয়েছিল তখন। রাত দেড়টায় একটা টেলিফোন কল এসেছিল বাসায়। আমার পাশেই ছিল টেলিফোনটা, আমার ঘরে নিচতলায়। এত রাতে রিং হওয়ায় আমি একটু বিরক্ত হলাম, প্রথমবার ধরতে পারিনি, দ্বিতীয়বার ধরলাম। অপর প্রান্ত থেকে একটা গম্ভীর গলায় কেউ বললেন, ‘মন্ত্রী সাহেব আছেন?’ আমিও বললাম, ‘কে বলছেন আপনি?’ ওপাশের মানুষটা বললেন, ‘আমি রাষ্ট্রপতি বলছি, মন্ত্রী সাহেবকে একটু ডেকে দিন।’
আমি প্রথমে বিশ্বাস করতে চাইনি। আবার পর মুহূর্তেই মনে করেছিলাম, ক্যু হয়ে গেছে নাকি! আমি দ্রুত ওপরতলায় গেলাম। বাবার রুমে নক করলাম। তাকে বললাম, ‘প্রেসিডেন্ট সাহেব কল করেছেন।’ তিনি দোতলার ফোনটা ধরলেন। আমি নিচতলা থেকে কথা শোনার আগ্রহে টেলিফোনটা ধরে আছি। প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘আপনি তো ঘুমিয়ে গেছেন, আপনি জানেন কিনা আলুর দাম আট আনা বেড়ে গেছে, আপনি কাল সকালবেলা ব্যাপারটা যদি কাইন্ডলি দেখেন’!
বাবা বললেন, ‘আমি দেখব কিন্তু রাষ্ট্রপতি মহোদয়, আপনি এখনো কি বঙ্গভবনে’?
প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘হ্যাঁ’।
তখন তিনি বললেন, ‘আপনার বিশ্রাম প্রয়োজন, আপনি বাসায় যান।’
যা-ই হোক, আমি আশ্বস্ত হলাম যে কোনো ক্যু হয়নি, এরপর আমি ওপরে গেলাম। তিনি অনেকক্ষণ ওই চেয়ারেই বসা ছিলেন। আমাকে বললেন, ‘দেখো, একটা দেশের রাষ্ট্রপতি রাত দেড়টার সময় আমাকে বলছেন, আলুর দাম আট আনা বেড়ে গেছে এবং তিনি সেটা নিয়ে চিন্তিত। এ রকম নেতাই আমাদের দরকার।’
এটা বাবার সঙ্গে আমার একটা স্মরণীয় ঘটনা।
আমাদের পেশাগত জীবনে তিনি কখনই কোনো মত দেননি। তিনি কখনই আমাদের বলেননি—কী করতে হবে। বাবা বইয়ের পড়াশোনার বাইরেও আমাদের ভাবতে বলতেন। কারণ এতে অনেক কিছু শেখার আছে। এছাড়া কখনই তিনি আমাদের বলেননি যে এটা করো, ওটা করো। তিনি বলতেন, ‘যেটা তোমরা ভালো মনে করো, সেটাই করো।’
সিলেটের আঞ্চলিক গান ছাড়া তেমন কোনো গান তিনি শুনতেন না। আড্ডা দেয়ার অভ্যাস একেবারেই ছিল না। তবে তিনি নজরুলভক্ত ছিলেন। সম্ভবত ১৯৭৬ সালের দিকে তিনি আমাদের নিয়ে কবি নজরুলের বাসায় যেতেন। ওটাই আমাদের সন্ধ্যায় বেড়ানোর জায়গা ছিল। তিনি বলতেন, কাজী নজরুল ইসলাম শুধু কবি না, উনি যুগে যুগে, শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষকে অনুপ্রাণিত করবেন। কাজী নজরুল ইসলামকে তিনি মহাকবি হিসেবে বিবেচনা করতেন। আমরা আগে-পরে নজরুলকে প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি, এটা নিয়ে তার আক্ষেপ ছিল। তিনি বলতেন, গুণীজনের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকলে সমাজের উন্নতি হয় না।
এম কায়সার রহমান: এম সাইফুর রহমানের মেজো সন্তান এবং
চেয়ারম্যান, কোয়ালিটি ফিডস লিমিটেড










