আমরা যারা সাংবাদিকতায় এসেছি তারা কেন এসেছি, চাকরি অবশ্যই—কিন্তু তার ঊর্ধ্বে একটা চিন্তা আছে—সমাজসেবা। অন্য অনেক পেশাও সমাজের সেবা করে, কিন্তু আমাদের একমাত্র অস্তিত্ব হচ্ছে সমাজসেবা। আমাদের সংবিধানে (কনস্টিটিউশন) শুধু দুটো পেশাকে কনস্টিটিউশনাল ধারা দিয়ে প্রটেক্ট করা হয়েছে। স্বাধীন জুডিশিয়ারি ও স্বাধীন গণমাধ্যম। কেন? জুডিশিয়ারি তো আমরা বুঝতে পারছি। আমার স্বাধীন জুডিশিয়ারি দরকার। কিন্তু স্বাধীন মিডিয়া কেন কনস্টিটিউশনালি প্রটেক্টেড? কেননা অভিজ্ঞতা বলছে—যে সমাজে স্বাধীন সাংবাদিকতার বিচরণ খুব বলিষ্ঠ, সেই সমাজ গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন হয়, অধিকার প্রতিষ্ঠার নিদর্শন হয়। আমি মনে করি, আমরা যারা সাংবাদিকতায় এসেছি এই উপলব্ধি আমাদের থাকতে হবে। স্বাধীন সাংবাদিকতা করার যে মৌলিক এথিক্যাল ভ্যালিউস (নৈতিক মূল্যবোধ), আমি অনুরোধ করব আপনারা সেটাকে নিজের জীবনে, নিজের চেতনায় সবসময় ধরে রাখবেন। কেননা আমরা সাংবাদিক হয়ে যদি এই মূল্যবোধের পেছনে না থাকি তাহলে সমাজ কিন্তু আমাকে সেই সমাদর করবে না।
যারা এডিটর হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছি, আমরা যেন মনে রাখি আমাদের প্রত্যেকটি আচরণ, কাজ ও মূল্যবোধ আমার পেশাকে, আমার প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবান্বিত করে। আমি যদি সম্পাদক হিসেবে নৈতিকতা পরিপন্থী কোনো কাজ করি তাহলে আমার প্রতিষ্ঠান, আমার পেশা কলুষিত হয়।
মালিকদের কাছে বলতে চাই, সংবাদপত্রে বিনিয়োগ করেছেন, আপনাদেরকে ধন্যবাদ। কিন্তু আপনি অন্য ইন্ডাস্ট্রিতে যে মানসিকতা নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন, সেই মানসিকতা নিয়ে আপনি যদি গণমাধ্যমে বিনিয়োগ করেন তাহলে সেই গণমাধ্যম কখনোই জনগণের আস্থা অর্জন করবে না। আমি সাংবাদিকদের মনে করি আমরা সামাজিক ডাক্তার (উই আর সোশ্যাল ডক্টরস)। আমরা যখন একজন ডাক্তারের কাছে যাই, তখন জানতে চাই আমার কোনো অসুখ-বিসুখ আছে কিনা, দুর্বলতা আছে কিনা, কোলেস্টেরল ও ভিটামিনের অবস্থা কী অর্থাৎ আমার নেগেটিভ ইস্যুগুলোই জানতে চাই। আমি দেখতে সুন্দর, স্বাস্থ্যবান এসব শুনতে ডাক্তারের কাছে যাই না। একইভাবে আমরা যারা সাংবাদিক তারা সবসময় সমাজের শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতাগুলো তুলে ধরছি। কেননা আমরা সমাজকে ভালোবাসি, দেশকে ভালোবাসি, দেশের উন্নতির জন্য এসব করছি।
আমি জুডিশিয়ারির কাছে আপিল করব যে আপনারা মনে রাখবেন যে স্বাধীন সাংবাদিকতা স্বাধীন জুডিশিয়ারির একটা মূল অস্ত্র। এ দুটো একে অপরের পরিপূরক। মাঝে মাঝে আমরা দুঃখের সঙ্গে দেখি, এমন জাজমেন্ট আসে যেটা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী। কনটেমট অব কোর্ট এমন একটা অস্ত্র জুডিশিয়ারির হাতে সেটার যেন অপব্যবহার না হয়। আমরা যদি ভুলক্রমে জুডিশিয়ারি সম্বন্ধে কিছু লিখি আমরা কনটেমট করার জন্য লিখি না। আমরা জুডিশিয়ারিকে হেয় করার জন্য লিখি না। আমরা তাদেরকেও জবাবদিহির মধ্যে রাখতে চাই। জুডিশিয়ারি ইজ ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট ইনস্টিটিউশন এবং জনগণের অধিকার আছে জুডিশিয়ারির পারফরম্যান্স সম্বন্ধে জানার। আমরা অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে জুডিশিয়ারির ওপর লেখালেখি করি। কোনোদিন তাদের অপমান করার জন্য লিখি না। তাই জুডিশিয়ারির প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে, আপনারা যেন স্বাধীন সাংবাদিকতার সহায়ক শক্তি হোন।
সরকার আপনি মনে রাখবেন, আপনাকে কেউ সত্য কথা বলবে না। আপনার দলীয় লোকরা বলবে না ভয়ে। ব্যুরোক্রেসি বলবে না, ইন্টেলিজেন্সও বলবে না। তারা সবসময় আপনাকে প্রশংসার জগতে আবদ্ধ রাখবে। স্বাধীন সাংবাদিকতা হচ্ছে একমাত্র প্রতিষ্ঠান যারা আপনাকে সত্য কথা বলবে। আমি মনে করি, একটা সরকার যদি সত্যিকার অর্থে স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করে উদার দৃষ্টিভঙ্গি রাখে তাহলে তারাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। আপনি যে প্রোগ্রাম নিয়েছেন, আপনি যে প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করছেন এটা কি সঠিক, এটা কি জনগণ গ্রহণ করছে, এটা কি দুর্নীতির মধ্যে ডুবে যাচ্ছে—এ কথা আপনাকে কে বলবে? আপনি যে বাজেট নিয়ন্ত্রণ করেন লক্ষ কোটি টাকার বাজেট, আপনি এক মুহূর্তের জন্য মনে করবেন না এই টাকা আপনার। এই টাকা হচ্ছে করদাতাদের, জনগণের। অবশ্যই আপনাকে আমরা সমর্থন করব, যদি সুন্দর সঠিক গণতান্ত্রিক এবং প্রো-পিপল প্রজেক্ট হয়। কিন্তু ওই প্রজেক্ট যদি দুর্নীতির মূল জায়গা হয়ে যায়, এ কথা কিন্তু আপনাকে শুধু স্বাধীন সাংবাদিকতাই বলবে।










