অ্যাডভান্সড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (এসিআই) লিমিটেডের যাত্রা ১৯৯২ সালে হলেও তাদের পূর্বপুরুষ ব্রিটিশ ইম্পেরিয়াল কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (আইসিআই) নামে পরিচিত। কোম্পানিটির যাত্রা শুরু হয় আমাদের স্বাধীনতার আগে ১৯৬৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। শুরুর পর ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি ইম্পেরিয়াল কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ বাংলাদেশ নামে নিবন্ধিত হয়। তবে নব্বইয়ের দশকে তারা দেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিলে তাদের স্থাপনা ও বাজার অংশীদারত্ব কিনে নেন চেয়ারম্যান আনিস উদ দৌলা, যাত্রা শুরু করে বর্তমান এসিআই। আন্তর্জাতিক কোম্পানি আইসিআইয়ের সুনাম ও তাদের ওষুধগুলো ধরে রাখার জন্য আনিস উদ দৌলা পূর্বতন নাম এবং লোগোর সঙ্গে মিল রেখেছিলেন বর্তমান নাম ও লোগোতে। আনিস উদ দৌলার সন্তান ড. আরিফ দৌলা বর্তমানে এসিআইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন।
এসিআই গ্রুপের প্রথম সাবসিডিয়ারি হিসেবে শুরু করে এসিআই ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, যা এখন পর্যন্ত এসিআই গ্রুপের সবচেয়ে লাভজনক ও ভোক্তাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার বিচারে জনপ্রিয় ব্যবসায়িক শাখা। ফার্মাসিউটিক্যালস অংশের মোট সম্পদের বর্তমান পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি, যা এসিআই লিমিটেডের মোট সম্পদের প্রায় ২২ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
মানসম্পন্ন পদ্ধতিতে পণ্য উৎপাদনের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের প্রথম কোম্পানি হিসেবে এসিআই ১৯৯৫ সালে আইএসও ৯০০১ সনদ অর্জন করে। একই বছর প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্ত হয়। এছাড়া এসিআই প্রথম বাংলাদেশী ওষুধ কোম্পানি, যারা যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে। বর্তমানে দেশে যক্ষ্মা আক্রান্ত রোগীদের ওষুধগুলো এসিআই ফার্মা উৎপাদন ও সরবরাহ করছে।
নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে এসিআইয়ের হেলথকেয়ার পণ্য ও ওষুধ উৎপাদন কারখানাটি অবস্থিত। এটি ৮৫ হাজার বর্গফুটের শেডসহ প্রায় সাড়ে ১১ একর আকৃতির বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। বিশ্বমানের ওষুধ ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পণ্য উৎপাদনের জন্য ২৩৫ জন দক্ষ কর্মী বর্তমানে এ কারখানায় কাজ করছেন। কারখানাটির নতুন হেলথকেয়ার ইউনিট নির্মাণে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার বা ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।
কারখানাটি সব আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করে ডিজাইন করা হয়েছে। প্লান্টের কর্মী, তত্ত্বাবধায়ক, কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপকদের দায়িত্বশীল দল WHO দ্বারা সুপারিশকৃত CGMP (CURRENT GOOD MANUFACTURING PRACTICE REGULATION) অনুসরণ করে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। উৎপাদনের জন্য এসিআইয়ের প্লান্টে রাষ্ট্রীয় রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানের সব নিয়মনীতি মেনে চলা হয় এবং ইন-প্রসেস কোয়ালিটি কন্ট্রোল পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় ।
সৃজনশীলতার সমন্বয়ে এসিআইয়ের দক্ষ কর্মীরা প্রতিযোগিতামূলক বাজারের জন্য বৈচিত্র্যময় ও শক্তিশালী ওষুধ এবং স্বাস্থ্যসেবা পণ্যের নতুন প্রণালি ও বাজারে বিদ্যমান ডোজগুলো নিয়ে নিয়মিত গবেষণা ও উৎপাদনে নিযুক্ত রয়েছেন। চৌকস সদস্যবিশিস্ট দলটি ISO প্রণীত নীতিমালা ও নির্দেশাবলি অনুসরণ করে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরের (SOP) অধীনে মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন করে যাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগে দক্ষ কর্মী দ্বারা ওষুধের গুণমান নিয়ন্ত্রণ ও নিশ্চিত করে ক্রমাগত নিজেদের পণ্যের মানোন্নয়নের জন্য ACI-এর পণ্য বর্তমানে বাজারে খুব স্বীকৃত। পণ্যগুলোর মাঝে স্যাভলন ব্র্যান্ডের স্বাস্থ্য সুরক্ষা পণ্যসমূহ ভোক্তাদের মাঝে সুপরিচিত।
বর্তমানে এসিআই ৬৫০ ধরনেরও বেশি ডোজ তৈরি করে; যার মধ্যে রয়েছে কার্ডিওভাসকুলার, অ্যান্টিইনফেকটিভ, সিএনএস, অ্যান্টিডায়াবেটিকস, অ্যান্টিপাইরেটিক, ভিটামিন ও খনিজ, অ্যান্টিবায়োটিক, এনএসএআইডি, অ্যান্টিআলসারেন্ট, স্টেরয়েড, অ্যান্টিস্পাসমোডিকস, অ্যান্টিসাইকোটিক, অ্যান্টিইমেটিকস, অ্যান্টিসেপটিকস, অ্যান্টিএজমাটিকস ইত্যাদি। বহির্বিশ্বে এসিআইয়ের পদচারণ শুরু হয় দুই দশকের বেশি সময় আগে শ্রীলংকায় ওষুধ রফতানি করার মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে তাদের উৎপাদিত ওষুধ বিভিন্ন দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পেয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বব্যাপী চারটি মহাদেশের ৫০টিরও বেশি দেশে এসিআইয়ের ওষুধ রফতানি হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির ৮৫০টির বেশি ওষুধ বিভিন্ন দেশে নিবন্ধিত রয়েছে। ২০১৫ সালে যৌথ গবেষণার মাধ্যমে বিশ্বে সর্বপ্রথম নবজাতকের নাড়ির সংক্রমণ প্রতিরোধে হেক্সিকর্ড ওষুধ আবিষ্কার করে এসিআই। এ ওষুধ নবজাতকের মৃত্যুহার ২৩ শতাংশ কমিয়েছে এবং ৬৮ শতাংশ অন্যান্য গুরুতর সংক্রমণও কমিয়েছে। ফলে ওষুধটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) জরুরি ওষুধের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমানে এসিআইয়ের ওষুধ যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ালমার্ট, ওয়ালগ্রেন্স, পাবলিকস, সিভিএস ইত্যাদি প্রসিদ্ধ চেইন স্টোরগুলো বিক্রি করছে।
এসিআই লিমিটেড বাংলাদেশের হেলথকেয়ার ইকোসিস্টেম উন্নত করার লক্ষ্যে ২০২২ সালে হেলথকেয়ার ইকুইপমেন্ট নামে নতুন একটা বিভাগ চালু করেছে। মূলত হেলথকেয়ার ইকুইপমেন্ট এ দেশের রোগীদের গুণগত মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য অতীব প্রয়োজনীয় USFDA অনুমোদিত বিভিন্ন ডিভাইস যা হাসপাতালে কিংবা বাসায় প্রয়োজন তা নিরবচ্ছিন্ন সরবারাহ করার জন্যই এ উদ্যোগ। হেলথকেয়ার ইকুইপমেন্টের এ অত্যাধুনিক বিভাগ চালুর পর এসিআই US Food and Drug Administration (USFDA)-এর অ্যাপ্রুভাল অর্জন করেছে। ফলে বর্তমানে এসিআইয়ের ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা পণ্যগুলো সরাসরি আমেরিকায় বাজারজাত হচ্ছে। আগে ভারতে টোল উৎপাদনের মাধ্যমে এসিআইয়ের পণ্য আমেরিকায় বাজারজাত করা হতো।
বিশ্বমানের গবেষণা ও উদ্ভাবনী এবং রোগ নির্ণয়ের জন্য এসিআইয়ের উন্নত মানের পণ্যের বিপুল চাহিদা রয়েছে চিকিৎসকদের মাঝে, যা তাদের রোগীদের উন্নত চিকিৎসা প্রদান এবং সঠিক সময়ে হাতের নাগালে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন পোড়া বা ক্ষতের চিকিৎসা, শ্বাসতন্ত্রের যত্নে বিভিন্ন রকম আধুনিক ডিভাইস, ডায়াবেটিস রোগীদের আধুনিক চিকিৎসা (ইনসুলিন পাম্প), ব্রেস্ট ক্যান্সার চিহ্নিতকরণ, স্পোর্টস মেডিসিন, হোম কেয়ার চিকিৎসার আধুনিক ডিভাইস যা উন্নত দেশে ব্যবহৃত হয়, এসিআই সেসব আধুনিক ডিভাইস বাজারজাত করার সঙ্গে সঙ্গে জনগণকে সচেতন করার কাজও বরাবরের মতো চালু রাখবে তাদের নতুন সব উদ্যোগের মাধ্যমে—এমনটাই
প্রত্যাশা উদ্যোক্তাদের।










