স্বাস্থ্যসেবা খাতে ইউনিমেড বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৭ সালে বর্তমান চেয়ারম্যান এম মোসাদ্দেক হোসেনের হাত ধরে। সংস্থাটি শুরু করার আগে এর লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশী রোগীদের জন্য গুণগত মানের পণ্য ও সেবা নিশ্চিত করা। প্রতিষ্ঠানটি খুব ছোট পরিসরে শুরু হয়েছিল। প্রায় তিন দশকের কাছাকাছি সময় পাড়ি দিয়ে বর্তমানে ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড প্রায় ৯০০ কোটি টাকা বার্ষিক রেভিনিউর একটি বড় প্রতিষ্ঠান।
কারখানার বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলোর মাঝে Production, Quality Control, Quality Assurance, Product Development, Engineering অন্যতম। পাশাপাশি Packaging, ETP, Warehouse ইত্যাদি বিভাগও রয়েছে।
Production ইউনিটটিই সবচেয়ে বড় বিভাগ, যা মূলত বিভিন্ন ধরনের ওষুধ উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত। উৎপাদিত পণ্যের মাঝে রয়েছে ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, ওরাল সলিউশন, ক্রিম, অয়েন্টমেন্ট, ইনহেলার, ইনজেকশন, সাপোজিটরি ইত্যাদি। Quality Control এবং Quality Assurance ইউনিট দুটি উৎপাদিত ওষুধের গুণগত মান নিরূপণের সঙ্গে জড়িত। এই দুই বিভাগের দক্ষ সদস্যরা উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পর্যালোচনার মাধ্যমে মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেন। Product Development ইউনিটটি নতুন নতুন মলিকুল ও রাসায়নিক উপাদান নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি ফর্মুলেশন ডেভেলপ করে নতুন ওষুধ উপস্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছে। এসব ইউনিট প্রধানত দক্ষ ফার্মাসিস্ট, বায়োকেমিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট ও কেমিস্ট দ্বারা পরিচালিত।
ঢাকা শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে গাজীপুর জেলার মির্জাপুরের বি কে বাড়ি এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ইউনিমেডের কারখানা। প্রতিষ্ঠার শুরুতে কারখানার আকার ছিল মাত্র আড়াই হাজার বর্গফুট। বর্তমানে ছোট এ কারখানা সম্প্রসারিত হয়ে প্রায় ১৩.৫ একরের বিশাল জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। ভবিষ্যতে এ কারখানা আরো বিভিন্ন বিভাগে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে ইউনিমেড কর্তৃপক্ষের, যার মধ্যে অনকোলজি, হরমোন, এগ্রোভেট ও ভেটেরিনারি অন্যতম।
ফার্মাসিস্ট, বায়োকেমিস্ট ও ব্যবসায়ী মিলে মাত্র ২২ জন লোক নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ইউনিমেড। ছোট পরিসরে শুরু করা এ ফার্মাসিউটিক্যালসের বর্তমান ফ্যাক্টরিতে প্রায় ৯০০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। প্রতিষ্ঠানের সব কর্মচারীই বাংলাদেশী। কারখানার শ্রমিকরা মাসিক বেতনের পাশাপাশি বার্ষিক ৩টি উৎসব ভাতা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, তিন বেলা খাবার, প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশের শেয়ার, বাসা ভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনা খরচ, স্বাস্থ্য বীমা ইত্যাদি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।
নিজস্ব ৫০টির বেশি ব্র্যান্ডের স্বাস্থ্যসেবা পণ্যের পাশাপাশি ইউনিমেড যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডের কিছু ব্র্যান্ডের ওষুধও বাজারজাত করে। অ্যাবট, অ্যাবভি, বায়োটেস্ট, জ্যানসেন ও ভিফোর ইত্যাদি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের বাংলাদেশী উৎপাদনকারী ও সাপ্লায়ার ইউনিমেড। মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের ফলে দেশের বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও সম্প্রসারিত হয়েছে ইউনিমেডের পণ্য। এরই মধ্যে কম্বোডিয়া, ভুটান, মিয়ানমার, আফগানিস্তান, মালদ্বীপ, গুয়াতেমালা ও কানাডায় ওষুধ রফতানি করছে ইউনিমেড। পাশাপাশি EUGMP Certification অনুমোদনের জন্য কাজ করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে উন্নত দেশগুলোয় ওষুধ রফতানিতে সাহায্য করবে।
প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই কিছু মূল্যবোধ ও নীতি অনুসরণ করে নিজেদের কারখানা পরিচালনা করছে ইউনিমেড। গুণমান, জ্ঞান ও দায়িত্ব সম্পর্কিত এ মূল্যবোধগুলোর মধ্যে রয়েছে সর্বোচ্চ মানের পণ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা, দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাজারে পণ্য সরবরাহ, যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ কর্মশক্তি নিশ্চিত করা, পণ্যগুলো সঠিক নীতি ও আইন অনুসরণ করে সরবরাহ এবং উৎপাদন, কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা অনুসরণ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সঠিকভাবে বর্জ্য পরিশোধনের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা পরিচালনা করা, কারখানার আশপাশের জনপদে শিক্ষা, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা ইত্যাদি।
বর্তমানে দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির বাজারের আকার প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার, যার মাঝে ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের বাজার অংশীদারত্ব প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। ২০১২ সালে উৎপাদন ও বিপণনের সব খাতে মান ধরে রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিষ্ঠানটি আইএসও ৯০০১: ২০১৫-এর অনুমোদন লাভ করে। ভবিষ্যতেও এ মান ধরে রাখার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়ে দৃঢ়প্রত্যয়ী ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।










