আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকারী হিসেবে দেশের ওষুধ শিল্পে অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান অপসোনিন ফার্মা লিমিটেড। ১৯৫৬ সালে প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল খালেক খানের হাত ধরে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ছোট শহর বরিশালে প্রতিষ্ঠিত হয় অপসোনিন ফার্মা লিমিটেড। ১৯৫৬ সালে যাত্রা করলেও ১৯৬২ সালে প্রথম উৎপাদনে যায় প্রতিষ্ঠানটি। এরপর ১৯৮০ সালে অপসোনিন সারা দেশে ওষুধ বাজারজাত শুরু করে। এর মাত্র পাঁচ বছর পর ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে ওষুধ রফতানির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করে। বর্তমানে বাংলাদেশের বাজার ছাড়িয়ে বিশ্ববাজারের প্রায় ৩০টি দেশে বিক্রি হচ্ছে অপসোনিনের ওষুধ। দেশের শীর্ষস্থানীয় ১০ ফার্মাসিউটিক্যালসের মধ্যে অপসোনিন অন্যতম।
বর্তমানে আব্দুল খালেক খানের লিগ্যাসি বহন করে চলেছেন তার তিন সন্তান অপসোনিন ফার্মার বর্তমান চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন (অবসরপ্রাপ্ত) আব্দুস সবুর খান, এমডি আব্দুর রউফ খান ও ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর আব্দুর রকিব খান। তাদের তত্ত্বাবধানে ২০১৯ সালে বরিশালের রূপাতলীতে কীর্তনখোলা নদীর তীরবর্তী প্রায় ৫০০ একরেরও বেশি জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে অপসোনিন ফার্মার API ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক। API বা Active Pharmaceutical Ingredients হলো মূলত স্বাস্থ্যসেবা, পরিচ্ছন্নতা, শিল্প ও বিজ্ঞানভিত্তিক কাজে ব্যবহারযোগ্য রাসায়নিক যৌগ, যা মূলত বিশ্বজুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, চীন ও ভারতে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয়। গত কয়েক দশকে ওষুধ শিল্পে অগ্রসরমাণ বাংলাদেশেও বর্তমানে এ জাতীয় এপিআই পার্ক গড়ে উঠেছে ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহারযোগ্য পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে।
১৯৮৭ সালে অপসোনিন বাংলাদেশে সর্বপ্রথম সাপোজিটরি ফরমুলেশন শুরু করে। ১৯৯৪ সালে দেশে সর্বপ্রথম থার্ড জেনারেশন সেফালোস্পোরিন ও অ্যান্টিবায়োটিক সেফট্রিয়াক্সন উৎপাদন করে তারা। নিজেদের ক্রমাগত গবেষণা ও উৎপাদনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি দেশে প্রথম সাপোজিটরি ট্যাবলেট উৎপাদন শুরু করে। ২০২১ সালে দেশে সর্বপ্রথম টপিকাল স্প্রে উৎপাদন করে তারা। বর্তমানে অপসোনিন পেনিসিলিন, ভিটামিন, সেফালোস্পোরিন, স্টেরয়েড, অ্যান্টিভাইরাল মেডিসিনসহ আরো অসংখ্য সলিড, ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, পাউডার, সাসপেনশন, ইনজেকশন ও ইনফিউশন লিকুইড, ক্রিম, ওয়েন্টমেন্ট, সাপোজিটরি, স্প্রে, ইনহেলার ও সেবনযোগ্য সিরাপজাতীয় ওষুধ উৎপাদন করছে। অপসোনিন উৎপাদিত জেনেরিক ওষুধের সংখ্যা ৩৫০-এর বেশি এবং স্বাস্থ্যসেবা পণ্যের সংখ্যা ৭৫০-এর বেশি।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে অবস্থিত অপসোনিনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন গবেষণা ও উৎপাদন ভবনের আকার প্রায় ২৫ লাখ বর্গফুট। বাংলাদেশের ওষুধ উৎপাদনকারী প্লান্টগুলোর মাঝে অপসোনিনের প্লান্টটি প্রযুক্তিগত সেটআপের জন্য অগ্রগণ্য। এখানকার আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি জার্মানি, ইতালি, বেলজিয়াম ও স্পেনের বিশ্বসেরা মেশিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে আমদানি করা হয়েছে। আধুনিক এ যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি স্থাপন করা হয়েছে মূলত ইউএসএফডিএ, ইইউ, টিজিএ ও এমএইচআরএর মতো আন্তর্জাতিক রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রণীত মান রক্ষার লক্ষ্যে। প্রডাকশন ফ্যাসিলিটির উৎপাদনকারী যন্ত্রগুলো ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে অনলাইনেই পরিচালনা করা যায় হাতের স্পর্শ ছাড়াই। ওষুধের দানা উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয় জার্মানি থেকে আমদানি করা Glatt & Huttlin মেশিন। এ মেশিনে প্রতি ব্যাচে ৭০০ কেজি দানাদার উপাদান নিয়ে কাজ করা যায়, যা বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন। মেশিনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাঁচামাল লোডিং ও উৎপাদন শেষে নিজেকে পরিষ্কার করার সক্ষমতাসম্পন্ন। পরবর্তী সময়ে দানাদার উপাদানগুলোকে সঠিকভাবে মিশ্রিত করার জন্য ক্যানন ব্র্যান্ডের স্পেশালাইজড সেন্সর বেজড আইবিসি বিন ব্লেন্ডার মেশিন, তৈরীকৃত উপাদানকে উচ্চ চাপে সলিড ওষুধ বা ট্যাবলেটের আকার প্রদানের জন্য বেলজিয়াম ও যুক্তরাজ্য থেকে আমদানীকৃত ম্যানেস্টি এক্সপ্রেস কমপ্রেশর মেশিন ইত্যাদি অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয়। এর মাঝে কমপ্রেশর মেশিনটির টারেটটি নিয়মিত বিরতিতে পরিবর্তন বা এক্সচেঞ্জ করা যায়, যা প্রতি ঘণ্টায় ৫-১০ লাখ পর্যন্ত ট্যাবলেটকে উচ্চ চাপ প্রদান করতে পারে। সমগ্র পার্কজুড়ে অন্যান্য সব বিভাগেও এ জাতীয় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সমাহার ঘটিয়েছে অপসোনিন বাজারের সেরা ওষুধ উৎপাদনের লক্ষ্যে।
ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা পণ্য উৎপাদন উচ্চ জ্ঞান, প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক একটি কর্মযজ্ঞ হওয়ায় পুরো পার্কের বিভিন্ন বিভাগ ও ফ্যাসিলিটিতে দক্ষ, শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ কর্মীদের নিয়ে কাজ করছে অপসোনিন। কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ রাখার প্রয়াসে প্লান্টটিতে সবুজ ও সুন্দর পরিবেশ, সরকার নির্ধারিত শ্রম আইন অনুসরণ করে পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা এবং যাতায়াতের সুবিধার্থে নিজস্ব বাস/যাতায়াত সেবা প্রদান করা হচ্ছে অপসোনিনের পক্ষ থেকে।
ভেজাল, দূষণ ও একাধিক উপাদানের মাঝে মিশ্রণ এড়ানোর জন্য অপসোনিন ফার্মা ওষুধের থেরাপিউটিক প্রকারের ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন বিভাগে বিভক্ত করে নিজেদের গবেষণা ও উৎপাদন ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। প্রডাকশন ফ্যাসিলিটি, রিসার্চ, প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট, কোয়ালিটি কন্ট্রোল ও অ্যাসুরেন্স, সেফালোস্পোরিন ও পেনিসিলিন উৎপাদন, প্যাকেজিং, স্টোরেজ ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন বিভাগের জন্য আলাদা ভবন রয়েছে সম্পূর্ণ এলাকাজুড়ে। টেকনিক্যাল ও মেজানাইন ফ্লোর বাদে অপসোনিনের উৎপাদন ফ্যাসিলিটির আকার প্রায় ১৫ লাখ বর্গফুট। এখানে প্রতি শিফটে বার্ষিক ১০ বিলিয়ন ট্যাবলেট উৎপাদন করা হচ্ছে প্রায় আড়াই হাজার টন দানাদার উপাদান থেকে। পাশাপাশি প্রতি বছর উৎপাদিত হচ্ছে ১২০ মিলিয়ন ইনজেকশন এবং ১৫০ মিলিয়ন সেবনযোগ্য তরল ওষুধের ভায়াল।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কটির বিভিন্ন ভবনে নিরাপদে ও দূষণমুক্ত উপায়ে যাতায়াত করার জন্য প্রায় ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ওয়াকওয়ে রয়েছে, যা বাইরের পরিবেশ থেকে ভবনের অভ্যন্তরকে সুরক্ষিত রাখে। পরিবেশ রক্ষা ও স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার কথা চিন্তা করে অপসোনিন সবচেয়ে চমৎকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা হলো তাদের ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্লান্ট। ওষুধ বা যেকোনো এপিআই-ভিত্তিক প্লান্টে প্রচুর পরিমাণ বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক। অপসোনিনের ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্লান্টে ৯৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সব সলিড বর্জ্য পোড়ানোর ব্যবস্থা করা হয় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে, যেখানে একশ কেজি সলিড বর্জ্য মাত্র ৬ গ্রাম ছাইয়ে পরিণত হয়। ছাই ও বর্জ্য পোড়ানোর ফলে উৎপন্ন কার্বন নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ডিসপোজ করা হয় যেন তা পরিবেশের ক্ষতি না করে।
১৯৫৬ সালে শুরু হওয়া ছোট প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রমাগত সম্প্রসারণের ফলে কীর্তনখোলার তীরে বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে অপসোনিনের বিশাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কটি। নিজেদের গবেষণা ও উৎপাদন সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতে এখানে ইনসুলিন, বায়োটেকনোলজি, হরমোন, ভ্যাকসিন ও ক্যান্সার গবেষণা কেন্দ্র চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।










