১৯৯৩ সালে ফাইজার (বাংলাদেশ) লিমিটেড বাংলাদেশ থেকে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নেয়। তাদের রেখে যাওয়া স্থাপনা ও বাজার অংশীদারত্ব ফাইজারের তৎকালীন বাংলাদেশ অংশের প্রধান সৈয়দ হুমায়ুন কবির প্রতিষ্ঠিত সাজিদা ফাউন্ডেশনের অধীনে কিনে নেয়া হয়। এরপর ফাইজার (বাংলাদেশ)-এর নাম পরিবর্তন করে যাত্রা শুরু করে রেনাটা লিমিটেড। ফাইজারের রেখে যাওয়া স্থাপনা থেকে রেনাটা একটি কারখানা লাভ করে ঢাকার মিরপুরে যেখানে ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, তরল ওষুধ, মলম এবং জীবাণুনিরোধী পণ্য উৎপাদন করা হতো। ১৯৯৫ সালে রেনাটা একটি ছোট ভবনকে ORS (ওরস্যালাইন)-এর প্যাকেট তৈরির জন্য রূপান্তরিত করে। পরবর্তী কয়েক বছরে, যন্ত্রপাতির ক্ষমতা বাড়ানোর বাইরে নতুন কারখানায় আর কোনো বিনিয়োগ হয়নি।

২০০৪ সালের দিকে রেনাটা নিজেদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সর্বশেষ গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (GMP) নির্দেশাবলি অনুসরণ করে বিশেষায়িত কারখানা তৈরিতে বিনিয়োগ করা হয়। ২০০৬ সালে মিরপুরে প্রথম পটেন্ট পণ্য তৈরির ফ্যাসিলিটি (PPF) স্থাপন করা হয়। তখন কোম্পানির হাতে খুব কম নগদ অর্থ ছিল, তাই প্রাথমিক বিনিয়োগ ছিল মাত্র ১৪ কোটি টাকা। সস্তায় কিছু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত থেকে সংগ্রহ করা হয়। তবে এই ছোট কারখানাটি কমিশন হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে মানসম্পন্ন পণ্যের স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাজ্যের MHRA সার্টিফিকেশন পায়।

২০০৭ সালে, রেনাটা গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরে একটি নতুন সাইট স্থাপন করে। প্রথমে এখানে সেফালোস্পোরিন ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, শুকনো সিরাপ এবং জীবাণুমুক্ত ড্রাই ফিলিং তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই কারখানায় রেনাটার প্রাথমিক বিনিয়োগ ছিল প্রায় ৩০ কোটি টাকা। এবার বিনিয়োগ বেশি হওয়ায় প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি জার্মানি, কোরিয়া, তাইওয়ান, চীন এবং ভারত থেকে আমদানি করা হয়। এরপর রাজেন্দ্রপুর সাইটে একটি ছোট পেনিসিলিন উৎপাদন ফ্যাসিলিটি স্থাপন করা হয়। এই কারখানাটিতেও ট্যাবলেট, শুকনো সিরাপ এবং জীবাণুমুক্ত ড্রাই ফিলিং তৈরি করা হতো। পেনিসিলিন কারখানার বেশির ভাগ যন্ত্রপাতি চীন থেকে আমদানি করা হয়েছে। এই কারখানার জন্য মোট বিনিয়োগ ছিল ২০ কোটির কাছাকাছি।

রেনাটার হরমোন পণ্যের স্থানীয় চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে মিরপুরের PPF-এ প্রত্যাশিত উৎপাদন করার মতো পর্যাপ্ত ক্ষমতা নেই। ফলে তারা রাজেন্দ্রপুরে একটি নতুন বড় আকারের পটেন্ট পণ্য উৎপাদন ফ্যাসিলিটি স্থাপন করে। এই কারখানাটিতে ট্যাবলেট এবং ক্যাপসুল উৎপাদন করা হতো। নতুন এই PPF কারখানার যন্ত্রপাতি প্রধানত জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ইতালি এবং থাইল্যান্ড থেকে নিয়ে আসা হয়। বিশাল এই অত্যাধুনিক কারখানার প্রাথমিক বিনিয়োগ ছিল প্রায় ১০০ কোটি টাকা। কারখানাটি পরবর্তী সময়ে WHO (জেনেভা) কর্তৃক স্বীকৃত লাভ করে।

২০১০ সালের দিকে, ORS প্যাকের জন্য চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও প্যাকেটজাত ওষুধ পণ্যের জন্য রফতানির অর্ডার আসতে শুরু করে। ফলে মিরপুরের প্যাকেটজাত ওষুধ বানানোর কারখানাটি কয়েকগুণ সম্প্রসারণ করা হয় বর্ধনশীল বাজার চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। এই কারখানাটি UNICEF দ্বারা স্বীকৃত।

পরবর্তী দুই বছরে, ফাইজারের রেখে যাওয়া মূল কারখানার সক্ষমতা শেষ হতে শুরু করে। তাই রাজেন্দ্রপুরে নতুন একটি উৎপাদন কারখানা তৈরির জন্য পরবর্তী বিনিয়োগ শুরু হয়। রাজেন্দ্রপুর জেনারেল ফ্যাসিলিটি (RGF) নামের কারখানাটি ছোট আকারে শুরু হলেও সম্প্রসারিত হয়ে এখন এটি যথেষ্ট বড়। জার্মানি, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কোরিয়া থেকে আমদানি করা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এই কারখানাটি ট্যাবলেট, মাল্টি-ইউনিট-প্যালেট সিস্টেম (MUPS), হার্ড জেলাটিন ক্যাপসুল, অসমোটিক কন্ট্রোলড-রিলিজ অরাল ডেলিভারি (OROS) সিস্টেম ব্যবহার করে ট্যাবলেট এবং সফট জেলাটিন ক্যাপসুল উৎপাদন করে। কারখানাটি USFDA, MHRA, TGA, ANVISA ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্বারা স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।

একই সময়ে রেনাটা হারবাল পণ্য বাজারে নজর দেয়। একটি নতুন বিশেষায়িত কারখানার প্রয়োজন হয় হারবাল পণ্য উৎপাদনে কিন্তু রাজেন্দ্রপুর সাইট অন্যান্য প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ছিল। তবে রেনাটার একটি বড় পোলট্রি ফার্ম ছিল ভালুকার কাশোর এলাকায় যা দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। সেই মুরগির ফার্মটিকে তখন হারবাল পণ্যের কারখানায় রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নতুন কারখানাটি অত্যাধুনিক হলেও রূপান্তর প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ছিল। সত্য বলতে মুরগির ফার্মটি ধ্বংস করে দিয়ে সম্পূর্ণ নতুনভাবে শুরু করা তুলনামূলক সহজ হতো রূপান্তর করার চেয়ে। হারবাল কারখানাটিতে ট্যাবলেট, ক্যাপসুল এবং সফট জেলাটিন ক্যাপসুল উৎপাদন করা হচ্ছে।

ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য ছাড়াও রেনাটা পশুপাখির স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও কাজ করছে। ২০১৬ সাল নাগাদ প্রাণীর পুষ্টিপণ্য তৈরির জন্য যেই ছোট বিভাগটি কাজ করছিল তার ক্ষমতা ও গুণমান উভয়ই প্রয়োজনের চেয়ে কম হিসেবে প্রতীয়মান হয়ে ওঠে। তাই কাশোর সাইটে একটি নতুন অত্যাধুনিক স্থাপনা, কাশোর নিউট্রিশন ফ্যাসিলিটি (KNF) নির্মিত হয়। এখানে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিগুলো জার্মানি থেকে আমদানি করা হয়েছে।

২০১৬ সালের দিকে রেনাটা গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) বিভাগে বড় আকারে বিনিয়োগ শুরু করে। অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাজ্য থেকে আনা অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক নিয়োগ করা হয় বাংলাদেশের তরুণ গবেষক ও বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য। ছয় বছরের কঠোর প্রশিক্ষণের পর ১৬০ বিজ্ঞানীর এ তরুণ দল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদন, উন্নয়ন ও লাইসেন্স প্রদান করা শুরু করে। এসব বিনিয়োগই রেনাটার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে প্রাপ্ত অর্থের মাধ্যমে করা হয়েছে। ছোট ছোট আকারে সম্প্রসারণ করার ফলে বিষয়টি সম্ভব হয়েছে।

২০১৯ সালে রেনাটা ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতার ফলে সাধারণ এবং পটেন্ট পণ্যের কাঁচামালের অভাবের মুখোমুখি হয়। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি অনকোলজি এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য ব্যবহার্য পণ্যের বাজারে প্রবেশ করতে পারছিল না। সীমাবদ্ধতাগুলো সমাধান প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্রয়োজন ছিল। অংকটি যথেষ্ট বড় হওয়ার কারণে রেনাটাকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিতে হয়।

ঋণ গ্রহণের পর কাশোরে প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার বর্গফুটের একটি বিশাল ফ্যাসিলিটি; রাজেন্দ্রপুরে অনকোলজি সলিড, অনকোলজি স্টেরাইল, পটেন্ট স্টেরাইল এবং কাশোর সাইট থেকে ১ দশমিক ৫ কিমি দূরে হাবিরবাড়ীতে একটি নতুন পটেন্ট-প্রডাক্ট-ফ্যাসিলিটি ইত্যাদি বড় প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০২০ সালের শুরুর দিকে বিশ্বজুড়ে মহামারী আঘাত করে। রেনাটা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ভালোভাবেই সামাল দেয় এবং নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখে। তবে ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য আমদানি-রফতানি কার্যত ১৮ মাসের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, ফলে যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিলম্ব ঘটে।

যখন সব যন্ত্রপাতি রেনাটায় পৌঁছায়, ততদিনে মুদ্রাস্ফীতির ফলে বাংলাদেশী মুদ্রার গুরুতর অবনমন ঘটে। তখন এই অপরিকল্পিত মুদ্রাস্ফীতির অর্থ ছিল যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য প্রায় ২৫-৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া। মহামারীর সময়কার এ পরিস্থিতি কোম্পানির জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। পুঁজির জন্য এলসি পরিশোধ করতে কোম্পানিকে চড়া সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ গ্রহণ করতে হয়েছে। তাছাড়া মুদ্রামানের অবনমন, সুদের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ খরচ দ্বিগুণ হওয়ার কারণে লাভের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে মহামারী এবং পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট বাংলাদেশের প্রায় সব কোম্পানিকে প্রভাবিত করেছে, রেনাটা এর ব্যতিক্রম নয়। তবে এই কঠিন সময়েও যে বিনিয়োগগুলো করা হয়েছে তা কয়েক বছরের মধ্যে ইতিবাচক ফল বয়ে আনার বিষয়ে আশাবাদী রেনাটা কর্তৃপক্ষ।

১৯৯৩ সালে শুরুর সময় উৎপাদন ও গুণমান নিশ্চিতে ৪৭১ জন কর্মচারী নিয়োগ করেছিল রেনাটা। আজ সেই সংখ্যা বেড়ে ৪ হাজার ৩৯৮ জনে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য, কর্মচারীদের অধিকাংশই ২৪-৪৩ বছর বয়সী। তাছাড়া কঠোর মান নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর (SRA) দ্বারা সফলভাবে অডিট পাস করার ফলে এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে এ বিশাল কর্মশক্তির সদস্যরা বিশ্বমানের। বিশেষ করে গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) বিভাগের দিক থেকে, রেনাটা বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে অনন্য।

কঠিন ব্যবসায়িক পরিবেশ সত্ত্বেও অদূর ভবিষ্যতে ভালো দিন আসার বিষয়ে রেনাটা আশাবাদী। রেনাটার কিছু চমকপ্রদ শক্তির জায়গা রয়েছে। এগুলো হলো: (১) চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনে রোগীদের জন্য রেনাটার ওষুধ ও পণ্যের উল্লেখযোগ্য অবস্থান (২) একটি শক্তিশালী R&D পাইপলাইন যেখানে এরই মধ্যে ৭৮টি বায়োইকুইভ্যালেন্ট পণ্য তৈরি হয়েছে (৩) ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়াসহ ৫০টি দেশে বর্ধনশীল রফতানি। প্রতিবন্ধকতা সামাল দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো রেনাটা তাই দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে বর্তমানে মূল্যবান এক সদস্য।