প্রতিটি গল্পের পেছনে আছে অদম্য ইচ্ছাশক্তি, শ্রম, পরিকল্পনা আর সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এ উদ্যোক্তারা শুধু নিজেদের সফলতা নিয়ে ভাবেননি, বরং সমাজে প্রভাব ফেলতে চেয়েছেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, স্থানীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার কিংবা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশীয় পণ্যের মানোন্নয়ন—প্রত্যেকেই চেষ্টা করেছেন ভিন্ন কিছু গড়ার। উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আর্থিক প্রস্তুতি। সেই জায়গায় নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে প্রাইম ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটি শুধু ঋণ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেনি, বরং পাশে থেকেছে প্রতিটি ধাপে, প্রতিটি চ্যালেঞ্জে। সঠিক দিকনির্দেশনা, প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়ন এবং দ্রুত সহায়তার মাধ্যমে ব্যাংকটি হয়ে উঠেছে উদ্যোক্তাদের আত্মবিশ্বাসের অন্যতম ভিত্তি। উদ্যোক্তারা বিশ্বাস করেন, ব্যাংকের সহযোগিতা তাদের শুধু মূলধনের জোগান দেয়নি, বরং বড় পরিসরে ভাবার, ঝুঁকি নেয়ার এবং কিছু পরিবর্তন আনার সাহসও দিয়েছে। এসব উদ্যোক্তার সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি দৃশ্যমান অগ্রগতি। আর এ অগ্রগতির নেপথ্য সঙ্গী হয়ে প্রাইম ব্যাংক গড়ে তুলছে সম্ভাবনার এক নির্ভরযোগ্য ভিত্তি

১২ থেকে পাঁচ শতাধিক

এক যুগ আগের গল্প। ২০১২ সাল। যখন শহরের বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনে পেশাদার ক্লিনিং সার্ভিসের ধারণা খুব একটা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, শুকতারা আক্তার ইয়াসমিন তখনই শুরু করেন ‘বেস্ট ক্লিনিং সার্ভিস’। তবে শুরুটা সহজ ছিল না। সীমিত পুঁজি, কম জনবল আর অজস্র অনিশ্চয়তা নিয়ে এগোতে হয়েছে তাকে। কখনো এমন সময়ও এসেছে, যখন মাস শেষে কর্মীদের বেতন পরিশোধ করতেও হিমশিম খেতে হতো তাকে। শুকতারা আক্তার বলেন, ‘যখন আমার কর্মীদের বেতন দিতে পারছিলাম না, তখন প্রাইম ব্যাংকই আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের সহযোগিতা ছাড়া হয়তো আমি আজ এখানে আসতে পারতাম না।’

শুরুতে শুধু অফিস বা ছোট পরিসরের কাজ পেলেও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে চাহিদা। বর্তমানে ‘বেস্ট ক্লিনিং সার্ভিস’ সেবা দিচ্ছে দেশের বিভিন্ন পাঁচ তারকা হোটেল, করপোরেট অফিস, হাসপাতাল, শপিং মল, গার্মেন্টস ও রেসিডেন্সিয়াল ভবনে। শুধু শহরেই নয়, শহরতলির বড় বড় প্রকল্পেও এদের ক্লিনিং কার্যক্রম চলছে নিয়মিত।

শুকতারা বলেন, ‘আমি চাই, শুধু নিজের প্রতিষ্ঠান বড় হোক, তা নয়। চাই মানুষ কাজ পাক, নিজেকে গড়ার সুযোগ পাক।’

এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তার পরবর্তী লক্ষ্য—এ সেবা উদ্যোগকে দেশের সব জেলা শহরে ছড়িয়ে দেয়া। বর্তমানে এ লক্ষ্য পূরণে কাজ চলছে ধাপে ধাপে।

হোমিওপ্যাথিতে স্বপ্ন

বাংলাদেশের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা খাতকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর করতে প্রায় এক শতাব্দীর পুরনো একটি কোম্পানিকে নিয়ে কাজ চলা শুরু করে দ্য হোমিও রিসার্চ ল্যাবরেটরি (বিডি) লিমিটেড (এইচআরএল)। কোম্পানিটির শিকড় প্রায় ১০০ বছর পেছনে ছড়ানো থাকলেও এর আধুনিক রূপ যাত্রা শুরু করে ২০১৪ সালে।

নরসিংদীর ঘোড়াশালে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার বর্গফুট জায়গার ওপর গড়ে ওঠে নতুন কারখানা। বর্তমানে এখানে প্রায় ১৫০ কর্মী সরাসরি উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ছিল দেশের সব ধরনের হোমিওপ্যাথিক সলিউশনের চাহিদা পূরণ করা। চিনকোনা থেকে শুরু করে কমপ্লেক্স মিক্সচার, ড্রপস, ট্রাইট্রেশন, সলিউশন ও ট্যাবলেট।

হোমিওপ্যাথিক ট্যাবলেট উৎপাদনের সক্ষমতা প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম অর্জন। এ সক্ষমতা আগে বাংলাদেশে ছিল না বললেই চলে। এ ট্যাবলেট উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি হোমিও চিকিৎসায় নতুন একটি দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

প্রতিষ্ঠানটিতে নতুন প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি স্থাপনের চ্যালেঞ্জ ছিল অনেক। তখনই এইচআরএল সহযোগিতা খুঁজে পায় প্রাইম ব্যাংকের কাছে। ২০১৪ সাল থেকেই প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অংশীদার হিসেবে পাশে থেকেছে ব্যাংকটি।

এইচআরএলের উদ্যোক্তা মো. বেলায়েত হোসেনের সন্তান ও প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মো. ওয়াসিফ হোসেন বলেন, ‘যখন যন্ত্রপাতি আধুনিকীকরণের কাজ শুরু করি, তখনই প্রাইম ব্যাংকে যাওয়া। তাদের সহযোগিতায় আমরা বিভিন্ন মেশিনারিজ স্থাপন করেছি।’

এইচআরএল বর্তমানে একটি সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠান হলেও উদ্যোক্তারা এখানেই থেমে থাকতে চান না। ভবিষ্যতের জন্য রয়েছে স্পষ্ট ও সাহসী পরিকল্পনা। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তারা হারবাল মেডিসিন উৎপাদন শুরু করতে চান। পাশাপাশি একটি ১০ বছরের রোডম্যাপ তৈরি করেছেন তারা। লক্ষ্য রয়েছে, বর্তমান ব্যবসাকে ১০ গুণ বৃদ্ধি করা। এ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে নতুন প্রযুক্তি, রফতানি বাজারে প্রবেশ, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আরো উন্নয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা।

ভাবনা থেকে খামার

মেসার্স ইলমা ডেইরি ফার্ম নামে ২০১২ সালে গরুর খামারের যাত্রা শুরু করেন তাহমিনা আক্তার মৌ। সে সময় হাতে ছিল সীমিত পুঁজি, অভিজ্ঞতা একেবারেই সামান্য। তিনি জানান, তার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা এসেছে একজন নারী থেকেই। তিনি তার শাশুড়ি। তাহমিনার ভাষায়, স্বামী প্রবাসে ছিলেন। তাই চেয়েছিলাম তাকে কিছুটা সাহায্য করতে। সেই ভাবনা থেকেই খামার গড়ার সিদ্ধান্ত নিই।

খুব ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে ইলমা ডেইরি ফার্মে প্রায় ২৫০টি গরু লালন-পালন করা হচ্ছে। খামারে প্রায় ২০ জন কর্মী সরাসরি কাজ করছেন। শুধু পশুপালন নয়, গোখাদ্য উৎপাদন, গরুর স্বাস্থ্য রক্ষণাবেক্ষণ এবং দুধ সংগ্রহ-বিতরণেও রয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা।

তাহমিনা বলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম, আমার খামার শুধু আমার নয়, এটা যেন এলাকার মানুষের জন্যও একটি সম্ভাবনার জায়গা হয়। যারা কাজ পাচ্ছে না, তাদের যেন কাজের সুযোগ করে দিতে পারি।’

২০২২ সালে তাহমিনা আক্তার প্রাইম ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হন। ব্যাংকটির আর্থিক সহযোগিতা ও পরামর্শ তাকে শুধু মূলধনের জোগান দেয়নি, বরং আত্মবিশ্বাসও দিয়েছে বড় পরিসরে কাজ করার। তিনি বলেন, ‘আমার নিজের একটা সীমিত সক্ষমতা ছিল। কিন্তু প্রাইম ব্যাংক আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের সহায়তায় বড় করে কিছু ভাবার সাহস পেয়েছি। এখন ব্যবসাকে আরো সামনে এগিয়ে নিতে চাই।’

তাহমিনার পরিকল্পনায় রয়েছে খামারটির আরো সম্প্রসারণ। ঘাস ও পশুখাদ্যের উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে খরচ কমিয়ে আনার চিন্তা করছেন তিনি। এছাড়া দুধ প্রক্রিয়াকরণ এবং ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণের দিকেও নজর দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘আমি চাই, আমার খামার একদিন একটা ব্র্যান্ড হয়ে উঠুক—যেখানে শুধু দুধ নয়, মানুষের আস্থা এবং সম্মানও থাকবে।’

Untitled-1

নারীদের এগিয়ে নেয়ার স্বপ্ন

বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের পথচলা কখনই খুব সহজ ছিল না। পরিবার, সমাজ ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ পেরিয়েই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হয় তাদের। তেমনই একজন উত্তরা দাস। সামুদ্রিক খাদ্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘এম ইউ সি ফুডস লিমিটেড’-এর কর্ণধার।

উত্তরা দাস পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রাম কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর জীবনের গতিপথ নিয়েছে নতুন মোড়। তার পারিবারিক শিকড় মাছ ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বহু আগে থেকেই। দাদু ও বাবা দুজনেই ছিলেন মাছ ব্যবসায়ী। সেই সূত্রে মাছের জগৎ সম্পর্কে তার আগ্রহ জন্মায় খুব ছোটবেলা থেকেই। তবে ব্যবসায় সরাসরি আসার সুযোগ হয় তার শ্বশুর সুবল চন্দ্র দাসের হাত ধরে। যিনি ১৯৮৫ সালে যশোরে নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন এম ইউ সি ফুড লিমিটেড।

শ্বশুরের এ প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে নারীদের জন্য কিছু করার সুযোগ হয় উত্তরা দাসের। তিনি চেয়েছেন শুধু লাভের হিসাব নয়, বরং নারীবান্ধব, সামাজিক দায়বদ্ধতাপূর্ণ একটি কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে। উত্তরা দাসের মতে, ‘নারীদের এগিয়ে নেয়ার সুযোগ তৈরি করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’

তার এ দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রমে। বর্তমানে প্রায় ১৫০ জন নারী কর্মী এখানে সরাসরি নিয়োজিত আছেন। তাদের বেশির ভাগই গ্রামীণ এলাকা থেকে আসা। তাদের আবাসনের ব্যবস্থাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানে।

এম ইউ সি ফুডস লিমিটেডের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে প্রাইম ব্যাংক। উত্তরা দাস বলেন, ‘প্রাইম ব্যাংক ১৫ বছর ধরে আমাদের পাশে আছে। যখনই দ্রুত কোনো অর্থের প্রয়োজন হয়েছে, তারা কখনই মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। বরং আমাদের প্রবৃদ্ধির অংশীদার হয়ে থেকেছে।’

২০২৩ সালে এম ইউ সি ফুডস বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের সরকারি অনুমোদন পায়। এর মাধ্যমে তারা কাঁচামালের উৎস নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে, যা তাদের উৎপাদনে নতুন মাত্রা এনেছে। এটি শুধু একটি ব্যবসায়িক অর্জন নয়, বরং টেকসই উন্নয়ন ও রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপও বলে মনে করেন উত্তরা দাস।

কম দামে ভালো খাবার

মানুষকে কম দামে ভালো মানের খাবার দেয়ার চিন্তা থেকেই চট্টগ্রামের জনপ্রিয় ফাস্টফুড ব্র্যান্ড ‘সিজল’-এর যাত্রা শুরু। ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রামে যাত্রা শুরু করে ‘সিজল’। শুরুর দিকে মেনুতে ছিল মাত্র কয়েকটি বার্গার ও স্ন্যাকস আইটেম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই মেনুতে যুক্ত হয়েছে পিৎজা, পাস্তা, রাইস বোল, ডেজার্ট এবং নানা মৌসুমি খাবার। আজ সিজলের শাখা ছড়িয়ে পড়েছে আগ্রাবাদ, চৌমুহনী, ফটিকছড়ি, চিকানদণ্ডী ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন এলাকায়।

সিজলের অন্যতম উদ্যোক্তা শহীদ উল্লাহ কোরেশীর ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু হয়েছিল ভিন্ন খাতে। একসময় তিনি সিদ্ধান্ত নেন ফাস্টফুড ব্যবসায় নামার। প্রথম একটি দোকান নেয়ার সময় সেখানে ‘ফুড কোর্ট’ লেখা দেখে উদ্বুদ্ধ হন। এরপর বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেন ‘সিজল’-এর পথযাত্রা। ব্যবসার শুরুতে নিজস্ব অর্থায়নে বিদেশ থেকে কিছু যন্ত্রপাতি আমদানি করে তৈরি করতে শুরু করেন ফাস্টফুড ও কনফেকশনারি আইটেম।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ২৫০ জন কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। উদ্যোক্তার ভাষায়, ‘মানুষকে কম দামে ভালো খাওয়ানোর চিন্তা থেকেই আমরা সিজল শুরু করি। এখন আমাদের চাহিদা নেই—বয়সের শেষ প্রান্তে এসেছি। এখন শুধু চাই আরো কিছু কর্মসংস্থান হোক। সে চিন্তা থেকেই আরো নতুন কিছু করার চিন্তা করছি।’

গ্রাহকদের সুবিধার্থে সিজল ডিজিটাল প্লাটফর্মেও সক্রিয়। ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সরাসরি অর্ডার গ্রহণ, হোম ডেলিভারি সুবিধা এবং নিয়মিত অফারের মাধ্যমে তারা ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে নিজেদের স্বাদ ও সেবা। ব্যবস্থাপনায় আধুনিকতার ছাপও স্পষ্ট।

বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল ব্র্যান্ড যেখানে কেবল মুনাফা হিসাব করে চলে, সেখানে সিজল চেষ্টা করছে স্থানীয় স্বাদ, সহনীয় মূল্য এবং আন্তরিক সেবা বজায় রাখতে। আধুনিক ফাস্টফুড সংস্কৃতির সঙ্গে স্থানীয় স্বাদ ও চাহিদার মেলবন্ধন ঘটানোর চেষ্টা রয়েছে সিজলের।

সিজলের এ দীর্ঘ পথচলায় সহযাত্রী হয়ে ছিল প্রাইম ব্যাংক। ২০০৯ সাল থেকে ব্যাংকটির সঙ্গে যাত্রা শুরু করা সিজলের দীর্ঘ ১৬ বছরের সম্পর্ক রয়েছে প্রাইম ব্যাংকের। ব্যাংকিং সাপোর্ট ও অর্থনৈতিক সহায়তা সিজলের সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা রেখেছে বলেও জানান কোরেশী।

সিজল আন্তর্জাতিক কোনো ব্র্যান্ড না হলেও চট্টগ্রামের মানুষের কাছে অতি পরিচিত হয়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটি। উদ্যোক্তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে—আরো আধুনিকতার সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নতুন কিছু যুক্ত করা, যাতে করে এ ব্র্যান্ড ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।

বেকারি পণ্যে উদ্যোক্তা

দেশীয় কাপড়ের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার নরসিংদীর বাবুর হাট বাজার। ১৯৭৮ সালে এ বাজারে কনফেকশনারি দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু হয় ওবায়দুল্লাহ ফাহাদের পিতা মো. আবু হানিফ। ওই ব্যবসা ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়। বিভিন্ন ধরনের পণ্য বিক্রি ও সরবরাহের সঙ্গে সঙ্গে তার আগ্রহ বাড়তে থাকে বস্ত্র খাতের প্রতি। একসময় তিনি সিদ্ধান্ত নেন একটি ডাইং প্রজেক্ট গড়ে তোলার। সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘তানিয়া ডায়িং প্রিন্টিং অ্যান্ড ফিনিশিং মিলস’।

এরপর নরসিংদী কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দেন ওবায়দুল্লাহ ফাহাদও। ১৯৯০ সালের দিকে যাত্রা শুরু বস্ত্র কারখানাটিতে বর্তমানে সাত শতাধিক কর্মী রয়েছেন। শুধু ব্যবসা করাই ওবায়দুল্লাহ ফাহাদের একমাত্র লক্ষ্য নয়। তিনি বিশ্বাস করেন, ব্যবসার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। তার ভাষায়, ‘আমরা দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করি। শুধু নিজে ভালো থাকলেই হবে না, আশপাশের মানুষকেও নিয়ে এগোতে চাই।’

ব্যবসার শুরু থেকে ওবায়দুল্লাহ ফাহাদ ও তার পরিবার ছিলেন প্রাইম ব্যাংকের নিয়মিত গ্রাহক। ব্যাংকটির সহায়তা ও আর্থিক সেবার মাধ্যমেই অনেক সময়কার প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রাইম ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক প্রায় ২১ বছরের। ব্যবসার শুরু থেকেই তাদের সহযোগিতা পেয়েছি। অনেক সময় আর্থিক সংকটে তারা পাশে দাঁড়িয়েছে, যেটা আমাদের বড় সাহস দিয়েছে।’

ফাহাদ এখন আরো আধুনিক প্রযুক্তি সংযুক্ত করে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদনক্ষমতা ও মান বৃদ্ধি করতে চান। স্থানীয় বাজার ছাড়াও আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ গ্রহণের বিষয়েও ভাবছেন তিনি। পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি প্রশিক্ষণ ইউনিট স্থাপনের চিন্তাভাবনাও রয়েছে তার।

বংশপরম্পরায়

নারায়ণগঞ্জের মেসার্স জাকির হোসেন অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী মো. জাকির হোসেন। পাট ও পিপি (পলিপ্রোপাইলিন) ব্যাগ বা বস্তা উৎপাদন করছেন বংশপরম্পরায়। দাদা ও বাবাও যুক্ত ছিলেন এ ব্যবসার সঙ্গে। সেই সুবাদে তিনিও চালিয়ে যাচ্ছেন ব্যাগ ও বস্তা উৎপাদন।

মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘‌আমাদের ব্যবসাটা আদি যুগ থেকেই চলমান। দাদা ও–বাবার পথ অনুসরণ করেই আমি এ পথে এসেছি। পরিবার থেকেই শিখেছি ব্যাগের চাহিদা, উৎপাদন প্রক্রিয়া ও ব্যবসার নীতিমালা।’

বাংলাদেশের মতো একটি কৃষি ও শিল্পনির্ভর দেশে প্যাকেজিং ব্যাগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে সিমেন্ট, সার, পশুখাদ্য—প্রায় প্রতিটি পণ্যের পরিবহন ও সংরক্ষণে প্রয়োজন হয় টেকসই ব্যাগের। এ চাহিদা মেটাতেই নিরলস কাজ করে চলেছে তার প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ৩০ জন নিয়োজিত আছেন।

একদিকে পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যাগ, অন্যদিকে আধুনিক প্রয়োজন অনুযায়ী টেকসই ও সাশ্রয়ী পলিপ্রোপাইলিন (পিপি) ব্যাগ। এই দুটি পণ্যেই দক্ষতা গড়ে তুলেছে মেসার্স জাকির হোসেন অ্যান্ড ব্রাদার্স। দেশের বিভিন্ন মিল, ফ্যাক্টরি, কৃষি ও খাদ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান তাদের বড় ক্রেতা।

প্রাইম ব্যাংকের সঙ্গে প্রায় ১৫ বছরের পথচলা জাকির হোসেন অ্যান্ড ব্রাদার্সের। স্বত্বাধিকারী মো. জাকির বলেন, ‘‌প্রাইম ব্যাংক আমাদের যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। ব্যবসার প্রয়োজনে যখনই পাশে দরকার হয়েছে, তারা এসেছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে।’

বিনিয়োগ, যন্ত্রপাতির উন্নয়ন, কাঁচামাল সংগ্রহ ও ক্রেতা সরবরাহ চেইন, সবখানেই ব্যাংকের সহায়তা ব্যবসাকে করেছে আরো টেকসই। জাকির হোসেন মনে করেন, বাংলাদেশের ব্যাগ উৎপাদন খাতের ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যাগের বিশ্ববাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদা রয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে তিনি ব্যবসাকে আরো আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনা করছেন।