এক দুপুরে ঢাকার এক বাসায় রোদ গায়ে মেখে বসে আছে কয়েকজন শিশু। তাদের সামনে খোলা খাতা, হাতে রঙপেনসিল। মা বললেন, ‘‌এঁকে দেখাও, একটি পাবলিক টয়লেট দেখতে কেমন হওয়া উচিত।’ শিশুটি থামল না এক মুহূর্তও। একজন আঁকল ফুলের টব লাগানো টয়লেটের দরজা, আরেকজন দেখাল র‍্যাম্প দিয়ে একজন হুইলচেয়ারে থাকা প্রবীণ প্রবেশ করছেন। কেউ একজন লিখেও ফেলল ‘‌‍‌এখানে সবাই আসতে পারবে, এখানে লেখা থাকবে “‍স্বাগতম’’।’

শুধু ছবি আঁকা নয়, এটা ছিল একটা প্রশ্ন তোলার শুরু—পথে চলতে চলতে হঠাৎ যদি দরকার পড়ে, কোথায় যাব আমরা? পাবলিক টয়লেট আছে তো? আর থাকলেও সেটা ব্যবহারযোগ্য কি?

এ কথাগুলোই ছড়িয়ে দিতে শুরু হয়েছিল ‘‌পথে হল দেখা’—একটা ব্যতিক্রমধর্মী ক্যাম্পেইন, যেখানে শিশুরা আঁকে, তরুণেরা গল্প বলে, আর সাধারণ মানুষ তাদের ফোনে, টাইমলাইনে শেয়ার করে নিজের অভিজ্ঞতা। এ সাদাসিধে শিল্প, গল্প আর স্মৃতির ভেতর দিয়েই শুরু হয় নতুন এক আলোচনা—টয়লেট নিয়ে, সম্মান নিয়ে, শহর নিয়ে।

টয়লেট নিয়ে সচেতনতা তৈরি করার এ প্রচেষ্টা নিয়ে এসেছে ওয়াটারএইড, যার মধ্যে আছে গল্প, অনুভব, আর মানুষে মানুষে আলাপ। তাই এটা কেবল সচেতনতা নয়, এটা এক ধরনের সম্পর্ক গড়ার চেষ্টাও।

৫-১০ বছর বয়সী শিশুদের আঁকার ভেতরে ফুটে উঠেছে যত্ন আর স্বপ্ন—একটা টয়লেটের সামনে দাঁড়িয়ে হাত ধোয়ার বেসিন, পাশে সূর্যমুখী ফুল, একটা ভালো আলো, আর মাথার ওপর ছাউনি। কারো ছবিতে ছিল বৃদ্ধা ঠাকুরমা, কারো ছবিতে খেলার ছেলেপুলে—সবাই কোনো না কোনোভাবে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, ব্যবহারযোগ্য একটি জায়গার কথা বলছে। যেন ওরা নিজেই জানে প্রয়োজনটা কতটা জরুরি।

১৮-৩৫ বছর বয়সী যুবক-যুবতীরা লিখলেন গল্প, নিজেদের স্বপ্ন নিয়ে, অভিজ্ঞতা নিয়ে, প্রত্যাশা নিয়ে। কেউ বলল মাসিক চলাকালে দিনের কথা, আর কেউ বলল যাওয়ার অযোগ্য টয়লেটের কারণে দিনের পর দিন পানি না খেয়ে ঘরের বাইরে থাকার গল্প। কেউ বলল একবার রাতে এক বাসস্ট্যান্ডে হঠাৎ একটা আধুনিক, পরিচ্ছন্ন টয়লেট দেখে মনে হয়েছিল এ শহর বুঝি একটু যত্ন করতে শিখছে।

যখন একের পর এক অভিজ্ঞতা জমতে থাকে, মানুষ ইদানীং তা নির্দ্বিধায় প্রকাশ করে অনলাইনে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এগুলো এসেছে মানুষের ভেতর থেকে, যা আন্তরিক, ব্যক্তিগত, প্রাসঙ্গিক। তাই এ ক্যাম্পেইনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—এটা আমাদের কথা, আমাদের চোখ দিয়ে দেখা, আমাদের মুখে বলা।

আজকের ঢাকা অনেক আধুনিক। এখানে প্রতিদিন মেট্রোরেল ছুটছে, ওভারপাস উঠছে, বড় বড় শপিং মল জেগে উঠছে শহরের বুকজুড়ে। কিন্তু এ দৌড়ে কোথাও যেন ভুলে যাই একটা মা তার শিশুকে নিয়ে রাস্তায় বের হলে কোথায় পাবেন একটু স্বস্তির জায়গা? কিংবা সারাদিন রোদে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাফিক স্বেচ্ছাসেবক কি জানেন, কোথায় গিয়ে একটু হাত-মুখ ধোবেন?

পাবলিক টয়লেট আছে মানেই যথেষ্ট নয়। তা কেমন আছে, কার জন্য আছে, ব্যবহারযোগ্য কিনা, সে প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল ‘‌পথে হল দেখা’। এটা কোনো সমস্যা সমাধানের ঘোষণা নয়। বরং সমস্যার দিকে তাকিয়ে তা নিয়ে কথা বলার সাহস তৈরি করা।

একটা শিশুর আঁকার ভেতরে যখন টয়লেটের দরজা খুলে যায়, তখন শুধু কাঠামো নয়, খুলে যায় সচেতনতার দরজাও। সবসময় পরিবর্তন আসে নীতিমালায় নয়, আসে মানুষের অনুভব থেকে। কখনো সেটা হয় একটা পেনসিল আঁচড়ে, কখনো একটা হেসে বলা গল্পে, কখনো হয় একটা মোবাইল ভিডিওর ক্যাপশনে। এ ক্যাম্পেইন আমাদের মনে করিয়ে দেয় টয়লেট শুধু প্রয়োজন নয়, সম্মানের জায়গা। আর শহর যদি সত্যিই সবার হয়, সম্মানের হয় তবে সে সম্মানের ছায়াটা যেন রাস্তায় চলতে থাকা প্রতিটি মানুষের ওপর পড়ে।

‘‌পথে হল দেখা’-এর সবচেয়ে বড় সাফল্য হতে পারে টয়লেট নিয়ে কথা বলার অস্বস্তিটা দূর করা, ঠিক সে জায়গা থেকেই বদলে যেতে পারে পুরো শহরের চেহারা।