চাহিদার প্রায় পুরোটাই এখন দেশে উৎপাদিত ফ্রিজ পূরণ করছে। ফ্রিজের বাজার বিস্তৃত হচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষ কি এখন দেশী ফ্রিজ কিনতে পারছেন?

বর্তমান বাংলাদেশের প্রতিটি ফ্যামিলিতে ফ্রিজ একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। দেশে একক পরিবারের সংখ্যা এবং কর্মব্যস্ত জীবনের পরিসর বাড়ায় প্রতিটি মানুষ অনেক বেশি ব্যস্ত এবং সময় সচেতন হয়ে পড়েছে। যার কারণে প্রতিটি পরিবার এখন একসঙ্গে সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসের বাজার করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এছাড়া দেশে প্রতিটি অঞ্চলের শতভাগ বিদ্যুতায়নের ফলে পণ্যটির চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলছে। বর্তমানে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে ফ্রিজ পাওয়া যায়। ফলে উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সব শ্রেণীর গ্রাহক ফ্রিজের সুবিধা ভোগ করছে।

গত এক বছরে ফ্রিজের দামের ক্ষেত্রে কোনো তারতম্য হয়েছে কি?

কভিড-উত্তর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজায় ইসরায়েলি হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন অনেকটা বাধাগ্রস্ত। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি ও ডলারের মূল্য সমন্বয়ের কারণে পণ্যের মূল্যে কিছুটা সমন্বয় করা হয়েছে। তবে আমাদের সঠিক উৎপাদন পরিকল্পনা, ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং ক্রেতার ক্রয়সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করায় ডলারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পণ্যের মূল্যের ওপর খুব সীমিত। তবে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রভাব পণ্যের মূল্যে সঠিক সমন্বয়ের কারণে এর চাহিদায় কোনো প্রভাব পড়েনি।

আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে ফ্রিজ উৎপাদনে দেশী কোম্পানিগুলোর সাফল্যের পেছনে কী কী বিষয় ভূমিকা রেখেছে?

২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ইলেকট্রনিকস খাতকে এগিয়ে নিতে সরকার শুল্ক, কর, ভ্যাট অব্যাহতিসহ নানা সুবিধা দিয়ে আসছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শতভাগ বিদ্যুতায়িত এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে ইলেকট্রনিকস পণ্যের বাজার অনেক বেশি বিকশিত হয়েছে। এছাড়া দেশে দ্রুত ইলেকট্রনিকস পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি, প্রতিটি মানুষের আধুনিক জীবনের প্রত্যাশা এবং দেশে সহজলভ্য শ্রমের কারণে স্থানীয় কোম্পানিগুলো এ খাতে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। দেশে এ খাত বর্তমানে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথে। দেশে ইলেকট্রনিকস পণ্যের চাহিদার ৮৫-৯০ শতাংশ স্থানীয় উৎপাদকরাই সরবরাহ করে যাচ্ছে। স্থানীয় উৎপাদনের ফলে ফ্রিজের গুণগত মানও উন্নত হয়েছে এবং ফ্রিজের দামও কমছে। ফলে ভালো মানের পণ্য ক্রেতাদের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে আসছে।

২০২৫-এ ফ্রিজের বাজারের গতিপ্রকৃতি কেমন? দেশে মোট বাজারের আকার এখন কত এবং তাতে আপনাদের হিস্যা কতটা?

বর্তমানে বাংলাদেশের রেফ্রিজারেটর বাজার অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। এখানে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। এ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কনকা সবসময় চেষ্টা করে আসছে সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত মানের ফ্রিজ সরবরাহ করতে। আমাদের লক্ষ্য, দেশের সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির পণ্য পৌঁছে দেয়া। বর্তমানে বাংলাদেশে রেফ্রিজারেটর ও ফ্রিজারের বাজার টাকার অংকে প্রায় সাড়ে ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা। বার্ষিক গড় বাজার সম্প্রসারণের হার প্রায় ১০-১৫ শতাংশ। বর্তমানে কনকা বাংলাদেশের রেফ্রিজারেটর বাজারে প্রায় মার্কেট শেয়ারের একটি বিশেষ অংশ নিয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

শহরাঞ্চলের বাইরে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ফ্রিজের চাহিদা কেমন?

দেশের সর্বত্র কনকা, গ্রী ও হাইকো ব্র্যান্ড ফ্রিজের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে সিটি করপোরেশন ও জেলা শহরে কনকা, গ্রী ও হাইকো ব্র্যান্ড ফ্রিজের চাহিদা সবচেয়ে বেশি, কারণ পণ্যের গুণগত মান, দীর্ঘস্থায়িত্ব ও সাশ্রয়ী মূল্য। পাশাপাশি শহরাঞ্চলের বাইরে মানুষ অনেক কর্মব্যস্ত ও প্রয়োজনীয় খাবার সংরক্ষণে চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি-উৎপাদন এ যুগের মানুষের চাহিদা। আপনাদের উৎপাদিত ফ্রিজ এসব শর্ত কতটা পূরণ হচ্ছে?

কনকা ফ্রিজের স্ট্যান্ডার্ড টেকনোলজির মাধ্যমে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে করে তুলেছে আরো সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। কনকা ফ্রিজে রয়েছে ডিজিটাল ডিসপ্লে ও ইনভার্টার টেকনোলজি, যা বাইরে থেকেও ফ্রিজকে কন্ট্রোল করা যাবে। টেম্পারেচার ও অন্যান্য ফাংশন বাইরে থেকে হাতের স্পর্শের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। দুই-চারদিন বা এর চেয়ে বেশি সময়ের জন্য ঘরের বাইরে থাকলে কনকা ফ্রিজটি ইকোনমি মোডের মাধ্যমে ব্যবহার করা যায়। এতে বিদ্যুৎ বিল কম আসবে এবং খাবারও সতেজ থাকবে। কনকার সব ফ্রিজ বিএসটিআইয়ের ফাইভ স্টার এনার্জি রেটিং সমৃদ্ধ, যা ৭১ শতাংশ বিদ্যুৎ খরচ কমাতে সহায়ক। কনকা ও হাইকো ফ্রিজ তৈরিতে যে ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করা হয় তা শতভাগ ফুড গ্রেড ও আমেরিকান এফডিআই কর্তৃক সার্টিফায়েড। এছাড়া পরিবেশ রক্ষা আমাদের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। কনকা রেফ্রিজারেটরগুলোয় আমরা পরিবেশবান্ধব রেফ্রিজারেন্ট ব্যবহার করি, যা ওজোন স্তরের ক্ষতি করে না এবং এর গ্লোবাল ওয়ার্মিং পটেনশিয়ালও অত্যন্ত কম। আমাদের সব রেফ্রিজারেটর শতভাগ সিএফসি ও এইচসিএফসি মুক্ত। কনকা ফ্রিজে রয়েছে সবচেয়ে ওয়াইড এরিয়া। কনকা ফ্রিজের অ্যাকটিভ কার্বন ডিওডোরাইজার ব্যাকটেরিয়াকে ডিঅ্যাক্টিভ করে দেয়। এতে খাবার থাকে সতেজ ও স্বাস্থ্যসম্মত। এছাড়া ভিটামিন ও গার্ডেন ফ্রেশ টেকনোলজির মাধ্যমে ফ্রিজের ভেতরে রাখা সবজি এবং ফলমূল দীর্ঘদিন পর্যন্ত ফ্রেশ থাকে। সূর্যের আলোর মাধ্যমে বাগানে সবজি বা ফলমূল যেমন ফ্রেশ থাকে আমাদের ফ্রিজে তেমনই পাবেন। ভেজিটেবল বক্সের মধ্যে হিউমিডিটি কন্ট্রোল সিস্টেম আছে, যাতে খাবারের মান নিয়ন্ত্রণ করা যায়। দরজা খুলে অনেক সময় মানুষ চলে যায় বা ভুলে যায়, সেজন্য আমাদের ফ্রিজে ৬০ সেকেন্ড পরে অ্যালার্ম বাজবে। বাংলাদেশে আমরাই এ প্রযুক্তি প্রথমে নিয়ে এসেছি।

সামনেই ঈদুল আজহা। ক্রেতাদের মধ্যে এ সময়ে ফ্রিজ কেনার একটা প্রবণতা থাকে। ঈদ উপলক্ষে ক্রেতাদের কোনো বিশেষ সুবিধা দিচ্ছেন কি?

আসন্ন ঈদ উপলক্ষে গ্রাহকদের চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে আমরা যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েছি। আমরা বেশকিছু নতুন ডিজাইন ও মডেলের ফ্রিজ এ সময়ে বাজারে সরবরাহ করছি। গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন পণ্য পাওয়ার জন্য দেশব্যাপী আমাদের সব নিজস্ব শোরুম এবং দুই হাজারেরও অধিক পার্টনার ও ডিলার শোরুমে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করছি। এছাড়া গ্রাহকরা আমাদের ওয়েব পেজের মাধ্যমে ফ্রিজ পছন্দ করে অর্ডার করতে পারেন। ঈদুল আজহা উপলক্ষে আমরা একটি অফার চালু করেছি যার নাম ‘ঘষা দিলেই গোল্ড’। এ অফারে একজন কাস্টমার কনকা ও হাইকো ব্র্যান্ডের ফ্রিজ ক্রয় করলেই একটি স্কাচ কার্ড পাবেন, যা ঘষে পেতে পারেন বিভিন্ন গোল্ডের জুয়েলারিসহ কনকা এবং হাইকো ব্র্যান্ডের নিশ্চিত উপহারসামগ্রী। এছাড়া পণ্য কেনার ক্ষেত্রে প্রায় ৩৫টি ব্যাংকের ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডসহ নগদ এবং মাসিক ৩-১৮ মাসের কিস্তিতে আমাদের বিভিন্ন ধরনের শোরুম, ডিসপ্লে সেন্টার ও ডিলারদের মাধ্যমে ক্রয় করা যায়। আমাদের নিজেদেরও একটা কিস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের কাছ থেকে নিলে ১২ মাস পর্যন্ত কিস্তি সুবিধা দিয়ে থাকি। আমরা আশা করছি গত বছরের তুলনায় এ ঈদে ১৫-২০ শতাংশ বিক্রয় প্রবৃদ্ধি হবে।

আপনাদের বিক্রয়োত্তর সেবা সম্পর্কে বলুন।

আমাদের ব্যবসার প্রথম ও একমাত্র মূলমন্ত্র হচ্ছে গ্রাহকদের সর্বোত্তম বিক্রয়োত্তর সেবা নিশ্চিত করা। এজন্য বাংলাদেশে আমাদের প্রায় সাড়ে চার হাজার দক্ষ টেকনিশিয়ান কাজ করছেন। এছাড়া আমাদের প্রতিনিয়ত ভাবনা থাকে কীভাবে সর্বনিম্ন ব্যয়ের মাধ্যমে সর্বোত্তম বিক্রয়-পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করা যায়। ব্যবহারকারীদের সুবিধার্থে কনকা, হাইকো ও গ্রী ব্র্যান্ডের ফ্রিজে দেয়া হচ্ছে বিশেষ বিক্রয়োত্তর সুবিধা, যাতে প্রতিটি ফ্রিজ স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করা যায়। কনকা, হাইকো ও গ্রী ব্র্যান্ড ফ্রিজের কম্প্রেসরের ১০ বছরের রিপ্লেসমেন্ট ওয়ারেন্টি রয়েছে, অন্যান্য যন্ত্রাংশের রয়েছে দুই বছরের ওয়ারেন্টি। তাছাড়া পাঁচ বছরের ফ্রি বিক্রয়োত্তর সেবাও দেয়া হচ্ছে। ফলে নিয়মিত সার্ভিসিং অনেক সহজ হয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে আমাদের রয়েছে হান্টিং নাম্বার ১৬৬৪৯ কল সেন্টার সেবা। যেকোনো সেবার জন্য গ্রাহকরা এ নম্বরে কল করলে আমরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করি।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: তোফাজ্জল হোসেন