২০২৪ সালে প্রবাসী বাংলাদেশীরা রেকর্ড ২৬ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। রেমিট্যান্সের এ বাজারে আপনার ব্যাংকের অংশীদারত্ব কেমন ছিল?

২০২৪ সালে জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। টাকার অংকে গত বছর আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। গত বছরের শুরুতে রেমিট্যান্স আহরণের জন্য জনতা ব্যাংকে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তার পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার কোটি টাকা। যদিও বছরটিতে ১৬৯ কোটি ৭৯ লাখ ডলার বা ২০ হাজার ২৮৮ কোটি টাকার রেমিট্যান্স এসেছে। এক্ষেত্রে আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৩৫ শতাংশ। দেশের আহরিত মোট রেমিট্যান্সের ৬ শতাংশের বেশি এবং বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে রেমিট্যান্স আহরণে জনতা ব্যাংকের অবস্থান ছিল তৃতীয়।

ভবিষ্যতে এ অংশীদারত্ব আরো বাড়ানোর জন্য কি ধরনের পরিকল্পনা নিচ্ছেন?

এ অংশীদারত্ব আরো বাড়ানোর জন্য জনতা ব্যাংক বেশকিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যাংকের ওভারসিজ শাখাগুলোয় রেমিট্যান্স সংগ্রহের জন্য অ্যাপস চালু করা, এনপিএসবির মাধ্যমে ফরেন রেমিট্যান্স পেমেন্ট করা এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে রেমিট্যান্স পেমেন্ট সার্ভিস চালু করা।

কোন কোন দেশের প্রবাসীরা আপনাদের ব্যাংকের মাধ্যমে বেশি রেমিট্যান্স পাঠান?

সংযুক্ত আরব আমিরাতে জনতা ব্যাংকের চারটি শাখা (আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ, আল-আইন) রয়েছে। এছাড়া জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানি এসআরএল, ইতালির রোম ও মিলানে দুটি শাখা রয়েছে, যার মাধ্যমে সেখানে থাকা প্রবাসীরা সহজে রেমিট্যান্স প্রেরণ করে থাকেন। এছাড়া বিশ্বের প্রায় সব দেশ থেকেই প্রবাসীরা তাদের কষ্টার্জিত আয় জনতা ব্যাংকে ফরেন রেমিট্যান্স হিসেবে প্রেরণ করে থাকেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশগুলো হলো ইউএসএ, ইউএই, সৌদি আরব, কুয়েত, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, ইতালি, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের দেশগুলো, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি।

কেন আপনাদের ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীরা বেশি নিরাপদ মনে করবেন?

জনতা ব্যাংকে পাঠানো রেমিট্যান্স স্বয়ংক্রিয়ভাবে এপিআইয়ের এর মাধ্যমে বেনিফিশিয়ারির হিসাবে ২৪/৭ ক্রেডিট করা হচ্ছে এবং অন্য ব্যাংকের বেনিফিশিয়ারির হিসাবে বিইএফটিএনের মাধ্যমে প্রেরণ করা হচ্ছে। তাছাড়া দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক হিসেবে অত্র ব্যাংকের রয়েছে চারটি ওভারসিজ শাখাসহ দেশজুড়ে ৯২৯টি শাখার একটি সুবিশাল নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে রেমিট্যান্সের বেনিফিশিয়ারিরা সহজে রেমিট্যান্স সেবা গ্রহণ করতে পারেন।

বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করতে সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে কী ধরনের প্রত্যাশা করেন?

৫ আগস্ট-পরবর্তী বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবাসীদের বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ডের বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা প্রত্যাহার, এনআরবি বন্ডগুলোর পুনর্বিনিয়োগ সুবিধা চালু, প্রবাসে কর্মে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী বা দুর্ঘটনায় শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশীদের ক্ষতিপূরণ বাবদ আগত রেমিট্যান্সের বিপরীতে সরকারি প্রণোদনা বা নগদ সহায়তা প্রদান ইত্যাদি।

তথাপি এসডিজি লক্ষ্যমাত্রার অংশ হিসেবে প্রবাসী কর্তৃক বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রেরণে উচ্চ ফি হ্রাসের ব্যাবস্থা করতে হবে। এ জন্য রেমিট্যান্স প্রেরণে বিদেশে ব্যাংক বা এক্সচেঞ্জ কোম্পানি নির্ধারিত চার্জ বা কমিশন মওকুফের ব্যবস্থা করে মওকুফকৃত চার্জ বা কমিশনের অর্থ বিদেশে ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ কোম্পানিগুলোকে সরকার কর্তৃক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে টাকায় পুনঃভরণ হিসেবে প্রদান করা যেতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা অদক্ষ বাংলাদেশী শ্রমিকরা যেন দেশে সহজে রেমিট্যান্স প্রেরণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য (এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর শাখাগুলোর অবস্থান, এক্সচেঞ্জ রেট, রেমিট্যান্স প্রেরণের মাধ্যম, বাংলাদেশী ব্যাংকগুলোর শাখা এজেন্টগুলোর অবস্থান, ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রডাক্টের তথ্য) বাংলাদেশী বিভিন্ন ব্যাংকে হিসাব খোলার সুবিধাসহ বিভিন্ন বিনিয়োগ তথ্য ও সেবা (যেমন বন্ডে বিনিয়োগ) পেতে পারে সেজন্য বাংলাদেশী দূতাবাসগুলোয় রেমিট্যান্স তথ্য কেন্দ্র চালু করা যেতে পারে।

রেমিট্যান্স পাঠানো ও উত্তোলন প্রক্রিয়া আরো সহজতর করতে কী উদ্যোগ নেয়া দরকার বলে মনে করেন?

রেমিট্যান্সের অর্থ উত্তোলনে কোনো গ্রাহক সমস্যার সম্মুখীন হলে ব্যাংকের ভিজিল্যান্স ডিপার্টমেন্টে অভিযোগ জানাতে পারেন। ভিজিল্যান্স ডিপার্টমেন্টের যোগাযোগের ঠিকানা অত্র ব্যাংকের ওয়েবসাইটে দেয়া আছে। রেমিট্যান্স পাঠানো ও উত্তোলন প্রক্রিয়া আরো সহজতর করতে মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণ সহজলভ্য করতে হবে, প্রবাসী অধ্যুষিত দেশগুলোয় ব্যাংকের কালেকশন এজেন্ট বাড়াতে হবে।

হুন্ডির বাজার নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার?

হুন্ডিকে নিরুৎসাহিত করে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণের জন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তথাপি বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণে উৎসাহিত করার জন্য প্রবাসী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন ধরনের অ-আর্থিক প্রণোদনা/সুবিধা দিতে বিভিন্ন প্রাধিকার সুবিধা সংবলিত রেমিটার স্মার্ট কার্ড চালু করা যেতে পারে, যা প্রবাসীদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করবে। খোলাবাজার/কার্ব মার্কেট এবং ব্যাংকের এক্সচেঞ্জ রেটের পার্থক্য যেন খুব বেশি না হয়, সেদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ রাখতে হবে।

বিনিময় হার নিয়ে অস্থিরতায় রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে সমাধান কী হতে পারে?

রেমিট্যান্স আহরণের জন্য বর্তমান বাস্তবতায় এক্সচেঞ্জ রেট একটি প্রধান উপাদান। সেজন্য বিনিময় হার নিয়ে যেন অস্থিরতা তৈরি না হয় তার জন্য এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তথাপিও যেসব ব্যাংকের বড় বড় এলসির পেমেন্ট (যেমন রাষ্ট্রীয় তেল, সার আমদানি) থাকে, তারা যেন কম এলসি পেমেন্টের চাহিদাসম্পন্ন ব্যাংকগুলোর দ্বারা অসংগত ইন্টারব্যাংক ট্রেডিংয়ের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত না হয় সেদিকে বাংলাদেশ ব্যাংককে লক্ষ রাখতে হবে। এছাড়া খোলাবাজার/কার্ব মার্কেট এবং ব্যাংকের এক্সচেঞ্জ রেটের পার্থক্য যেন খুব বেশি না হয় সেদিকেও বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ রাখতে হবে।

রেমিট্যান্স আহরণে অবদানের জন্য জনতা ব্যাংক কী ধরনের স্বীকৃতি পেয়েছে?

২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেমিট্যান্স সংগ্রহের জন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জনতা ব্যাংক পিএলসিকে ‘রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৪’ প্রদান করে। এছাড়া জনতা ব্যাংক বেশ কয়েক বছর ধরে রেমিট্যান্স সংগ্রহে শীর্ষ একটি ব্যাংক হিসেবে সেন্টার ফর এনআরবি কর্তৃক ‘টপ টেন রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড’ পেয়ে আসছে। রেমিট্যান্স সংগ্রহে শীর্ষ একটি ব্যাংক হিসেবে জনতা ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশ ব্যাংক রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড’ও পেয়েছে। অত্র ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণ করে প্রতি বছর একটি বৃহৎসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশ ব্যাংক রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড এবং সরকার কর্তৃক সিআইপি হিসেবে মনোনীত হয়ে আসছেন।