রেমিট্যান্স প্রবাহের দিক থেকে ২০২৪ ছিল রেডর্ক গড়ার বছর। এক্ষেত্রে সোনালী ব্যাংকের ভূমিকা কেমন ছিল?
২০২৪ বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে এক ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের বছর। এ সময়ে দেশে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তনের অনুঘটক সংগঠিত হয়েছে। এ পরিবর্তনে প্রবাসী বাংলাদেশীরা বরাবরের মতো অগ্রদূতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। আহরিত হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ ২৬ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স। রেমিট্যান্স সংগ্রহে জাতীয় পর্যায়ে সোনালী ব্যাংকের অবস্থান দশম। গত বছর এ ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসীরা ৮২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা জাতীয় রেমিট্যান্সের ৩ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।
সোনালী ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সামগ্রিক কমপ্লায়েন্স পরিপালন করে ব্যাংকিং সেবা প্রদান করায় বিনিময় হারের অস্থিরতার কারণে রেমিট্যান্স আহরণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে আছে। ২০২৫ সালে এ ব্যাংক রেমিট্যান্স আহরণে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হবে বলে প্রত্যাশা করছি।
রেমিট্যান্সে অংশীদারত্ব আরো বাড়ানোর জন্য আপনাদের পরিকল্পনা কী?
এ অংশীদারত্ব আরো বাড়ানো ও প্রবাসী রেমিট্যান্স সহজতর করার জন্য এ ব্যাংক থেকে এরই মধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে আমাদের রয়েছে নিজস্ব এক্সচেঞ্জ হাউজ (এসইসিআই ও সোনালী পে ইউকে লিমিটেড)। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে (সৌদি আরব ও কুয়েত) রয়েছে প্রতিনিধি অফিস, যার মাধ্যমে প্রবাসীদের হিসাব খোলাসহ সহজে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণে যাবতীয় ব্যাংকিং সেবা প্রদান করা হয়। এ ব্যাংকের রয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক উন্নততর রেমিট্যান্স সেবা নিশ্চিতে এমএফএস-ভিত্তিক বিভিন্ন সেবা। যেমন সোনালী ই-সেবা, যা ব্যবহার করে প্রবাসীরা বিদেশে থেকেই পাঁচ মিনিটের মধ্যে এ ব্যাংকের যেকোনো শাখায় হিসাব খুলতে পারেন এবং সোনালী ই-ওয়ালেট ব্যবহার করে নিজ হিসাবের যাবতীয় লেনদেন সম্পাদন করতে পারেন। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে এরই মধ্যে সোনালী এক্সচেঞ্জ মোবাইল অ্যাপ প্রচলন করা হয়েছে। তাছাড়া রয়েছে বিএলএজেডইয়ের এর মাধ্যমে বিশ্বের ৩৬ দেশ থেকে ৫ মিনিটে রেমিট্যান্স প্রেরণের সহজ সুবিধা।
বিদেশে নতুন নতুন ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউজের সঙ্গে ড্রয়িং অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তি সম্পাদন এবং এপিআই কানেক্টেভিটি স্থাপনের মাধ্যমে রেমিট্যান্স সংগ্রহ বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নিয়েছি। এসএফএস, এমএফএস বেজড অ্যাপ, ওয়ালেট সার্ভিসের মাধ্যমেও রেমিট্যান্স আহরণ প্রক্রিয়া বাড়নো হবে। রেমিট্যান্স কনসেন্ট্রেশন বিবেচনায় বিভিন্ন দেশে এ ব্যাংকের এক্সচেঞ্জ হাউজ স্থাপন বা প্রতিনিধি নিয়োগ করার বিষয়টিও ভাবা হচ্ছে।
কোন দেশের প্রবাসীরা আপনাদের ব্যাংকের মাধ্যমে বেশি রেমিট্যান্স পাঠান?
সোনালী ব্যাংক দেশের আপামর জনসাধারণের আস্থার প্রতীক। এটি দেশের জনগণের ব্যাংক। বিশ্বের প্রায় সব দেশ থেকেই প্রবাসীরা এ ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠান। তবে সৌদি আরব, কুয়েত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তুলনামূলকভাবে রেমিট্যান্স বেশি আহরিত হয়।
দেশের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে সোনালী ব্যাংক গ্রাহকের আস্থা ও নিরাপদ বিনিয়োগের আশ্রয়স্থল। ১ হাজার ২৩১টি শাখাসংবলিত এ ব্যাংকের রয়েছে দেশেজুড়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, উন্নত ও আধুনিক গ্রাহকসেবার নিশ্চয়তা, আমানত তথা বিনিয়োগের নিরাপত্তা ইত্যাদি কারণে প্রবাসীরা এ ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণে বেশি নিরাপদ বোধ করেন।
প্রবাসীদের জন্য আপনার ব্যাংকে কী ধরনের আমানত ও ঋণ প্রডাক্ট রয়েছে?
সোনালী ব্যাংক দেশের সব জনগণের মতো প্রবাসীদেরও আস্থার ব্যাংক। কমিশন ফ্রি রেমিট্যান্স প্রেরণের সুবিধাসহ প্রবাসীদের জন্য রয়েছে লাভজনক বিভিন্ন আমানত স্কিম। যেমন— সোনালী প্রবাসী মাসিক মুনাফা প্রকল্প (৮ দশমিক ৫ শতাংশ)। অনিবাসী আমানত স্কিম (৭ শতাংশ)
প্রবাসীদের বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করতে সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন?
প্রবাসীদের বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করতে সরকার প্রেরিত রেমিট্যান্সের ওপর আড়াই শতাংশ প্রণোদনা প্রদান করছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বিমানবন্দরে প্রবাসীদের ভিআইপি মর্যাদা প্রদানসহ নানাবিধ সেবা প্রদান সহজতর করা হয়েছে। যেমন প্রবাসী লাউঞ্জ স্থাপন, স্বল্প মূল্যে মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থা ও প্রবাসীদের পরিবার-পরিজনের জন্য অতিথিশালা স্থাপন ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রত্যাশা হলো বাজারভিত্তিক বিনিময় হার প্রচলন, হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ইউনিফর্ম এক্সচেঞ্জ রেট বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
ব্যাংক থেকে রেমিট্যান্সের অর্থ উত্তোলনে অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। রেমিট্যান্স পাঠানো ও উত্তোলন প্রক্রিয়া আরো সহজতর করতে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার বলে মনে করেন?
রেমিট্যান্সের অর্থ উত্তোলনে সাধারণ গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হলে এ ব্যাংক ত্বরিত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সোনালী ব্যাংক যাবতীয় কমপ্লায়েন্স পরিপালন করে উন্নততর গ্রাহকসেবা নিশ্চিতকরণে বদ্ধপরিকর। গ্রাহকের অভিযোগ গ্রহণ ও তাৎক্ষণিক প্রতিকার নিশ্চিত করতে রয়েছে কাস্টমার কেয়ার সার্ভিস। গ্রাহকরা ১৬৬৩৯-এ কল করে তাৎক্ষণিক যেকোনো সেবা ও প্রতিকার পেতে পারেন। এছাড়া রেমিট্যান্স পাঠানো ও উত্তোলন প্রক্রিয়া আরো সহজতর করতে প্রযুক্তিনির্ভর গ্রাহকসেবা (এমএফএস, ইএফটি, ওয়ালেট) বৃদ্ধিকরণ, শাখা পর্যায়ে স্বতন্ত্র রেমিট্যান্স ডেস্ক সেবা নিশ্চিতকরণ ও রেমিট্যান্স ফোকাল পয়েন্ট নিয়োজিত করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
হুন্ডির বাজার নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার?
হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণ দণ্ডনীয় অপরাধ। হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে মানি লন্ডারিং আইনের যথাযথ প্রয়োগ/বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, প্রবাসীদের মধ্যে হুন্ডি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বিনিময় হারের অস্থিরতার কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে সমাধান কী হতে পারে?
বিনিময় হার অস্থিরতার কারণে এখনো রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সোনালী ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সামগ্রিক কমপ্লায়েন্স পরিপালন করে ব্যাংকিং সেবা প্রদান করে বিধায় বিনিময় হার অস্থিরতার কারণে রেমিট্যান্স আহরণে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছে না। ফলে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নির্ধারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক মনিটরিং জোরদারকরণ ও ইউনিফর্ম এক্সচেঞ্জ রেট বাস্তবায়ন এর সমাধান হতে পারে।










