রেমিট্যান্সের বাজারে গত বছর ঢাকা ব্যাংকের অংশীদারত্ব কেমন ছিল?

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের জন্য ২০২৪ সাল ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বছর। সারা বছরই দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বিশেষত ব্যাংক খাতকে নানা রকম সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়েছে। ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডি’সের সতর্কবার্তা, যা আমাদের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। এসবের মধ্যেও দেশের অর্থনীতির জন্য সুখবর বয়ে নিয়ে আসে রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ রেকর্ড ২৬ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স সংগ্রহ করেছে। দেশের কঠিন সময়ে প্রবাসীরা স্বপ্রণোদিতভাবে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য বজায় রাখতে এবং রিজার্ভ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ঢাকা ব্যাংক প্রবাসী বাংলাদেশীদের কাছ থেকে ২০২8 সালে মোট ৫১ কোটি ডলার রেমিট্যান্স সংগ্রহ করেছে। এটি আমাদের ব্যাংকের জন্য একটি বড় সাফল্য, যা প্রবাসীদের আস্থা ও ভালোবাসারই প্রতিফলন। আমরা ভবিষ্যতে আরো উন্নত সেবা প্রদানের মাধ্যমে প্রবাসীদের এ আস্থা ধরে রাখতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

এ অংশীদারত্ব আরো বাড়ানোর জন্য আপনাদের পরিকল্পনা কী?

ঢাকা ব্যাংক পিএলসি গ্রাহকদের মধ্যে বৈধপথে রেমিট্যান্স আনার জন্য সচেতনতা সৃষ্টির বিভিন্ন উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এসব উদ্যোগের মধ্যে আছে—রেমিট্যান্স প্রেরণ ও গ্রহণ প্রক্রিয়া সহজতর করতে ক্রমাগত ডিজিটাল প্লাটফর্মের উন্নয়ন। গ্রাহকরা যাতে সহজে অনলাইনে অ্যাকাউন্ট করতে পারে সেজন্য ডিজিটাল প্লাটফর্ম তৈরি। প্রবাসীদের জন্য অনলাইনভিত্তিক বিশেষ আমানত স্কিম এবং উচ্চ মুনাফা হারসম্পন্ন বিভিন্ন মেয়াদি আমানত স্কিম। প্রবাসীদের পরিবারের সদস্যদের জন্য সহজ শর্তে গৃহ ঋণ এবং শিক্ষা ঋণ প্রদান। বিনিয়োগ সুবিধা যেমন ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড ও ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড ইস্যু প্রক্রিয়া সহজীকরণ।

এছাড়া প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজীকরণের লক্ষ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ হাউজের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া এবং ঢাকা ব্যাংকের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি করা। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন প্রবাসী মেলায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে প্রবাসীদের কাছ থেকে সরাসরি পরামর্শ ও অভিযোগ সংগ্রহ করে ব্যাংকের সেবার মানোন্নয়ন করা। প্রবাসীদের বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ঈদ এবং অন্যান্য উৎসবের সময় সরকার ঘোষিত ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা ছাড়াও ব্যাংকের নিজস্ব উৎস থেকে অতিরিক্ত প্রণোদনার ব্যবস্থা করা। রেমিট্যান্স সুবিধাভোগীদের দোরগোড়ায় রেমিট্যান্স গ্রহণের সুবিধা প্রদান করার লক্ষ্যে ওয়ালেটের মাধ্যমে রেমিট্যান্স বিতরণ করা। রেমিট্যান্স ডেস্কে কর্মরত ব্যাংক কর্মকর্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অনলাইন সচেতনতা প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা, যাতে তারা গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করে রেমিট্যান্স সেবা অব্যাহত রাখতে পারে।

কোন কোন দেশের প্রবাসীরা আপনাদের ব্যাংকের মাধ্যমে বেশি রেমিট্যান্স পাঠান?

বিশ্বের অনেক দেশের বিখ্যাত এক্সচেঞ্জ হাউজের সঙ্গে আমাদের চুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে কিছু বড় বহুজাতিক মানি ট্রান্সফার কোম্পানি আছে, যারা বিশ্বের বহু দেশ থেকে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে। এসব কোম্পানির মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর প্রায় সব দেশ থেকেই রেমিট্যান্স সংগ্রহ করতে সক্ষম। তবে এসব দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, ইতালি, সিঙ্গাপুর থেকে প্রবাসীরা আমাদের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পাঠান।

প্রবাসীদের জন্য আপনার ব্যাংকে কী ধরনের আমানত ও ঋণ প্রডাক্ট রয়েছে?

আমাদের ব্যাংকে প্রবাসীদের জন্য রয়েছে বিশেষ আমানত স্কিম এবং উচ্চ মুনাফা হারের বিভিন্ন মেয়াদি আমানত স্কিম। এছাড়া প্রবাসীদের পরিবারের সদস্যদের জন্য সহজ শর্তে গৃহ ঋণ এবং শিক্ষা ঋণ প্রদান করা হয়। তাছাড়া আমরা বিনিয়োগ স্কিম যেমন ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড ও ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড ইস্যু করে থাকি।

কেন আপনাদের ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীরা বেশি নিরাপদ মনে করবেন?

প্রবাসীরা ঢাকা ব্যাংককে বিশ্বস্ত বন্ধু মনে করার বহুবিদ উপাদন রয়েছে। আমাদের ব্যাংক ডিজিটাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে দ্রুত, তাৎক্ষণিক, নিরাপদ ও বিশ্বস্ত সেবা প্রদান করে। এ ব্যাংকের বিদেশে বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের ভেতরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ১৫০ শাখা ও উপশাখার সাহায্যে রেমিট্যান্স বিতরণ নিশ্চিত করা হয়। বিশ্বজুড়ে বহুজাতিক, বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য রেমিট্যান্স পার্টনার আমাদের রয়েছে, যারা প্রবাসীদের জন্য দ্রুত, তাৎক্ষণিক, সহজতর ও নিরাপদ রেমিট্যান্স প্রেরণের নিশ্চয়তা প্রদান করে। আমরা প্রতিটি রেমিট্যান্সের বিপরীতে সরকারি ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা তাৎক্ষণিক ও ঝামেলাবিহীনভাবে বিতরণ করে থাকি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারল্য সংকটের কারণে, কিছু ব্যাংক গ্রাহকের রেমিট্যান্সের টাকা সম্পূর্ণ দিতে পারছে না। সেখানে আমাদের ব্যাংক শতভাগ নিশ্চয়তা দিচ্ছে যাতে গ্রাহক তার রেমিট্যান্সের সম্পূর্ণ টাকা কোনো ঝামেলা ছাড়াই একবারে উত্তোলন করতে পারে। এছাড়া ঢাকা ব্যাংক থেকে অন্যান্য ব্যাংকে রেমিট্যান্স ট্রান্সফার প্রসেস অত্যন্ত প্রযুক্তিনির্ভর ও দ্রুত, যা আমাদেরকে গ্রাহক, বৈদেশিক পার্টনার ও অন্যান্য ব্যাংকের কাছে অধিকতর আস্থাভাজন করে তুলেছে।

রেমিট্যান্স পাঠানো ও উত্তোলন প্রক্রিয়া আরো সহজতর করতে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার বলে মনে করেন?

রেমিট্যান্সের জন্য বিশেষ কাউন্টার স্থাপন, মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধার সম্প্রসারণ এবং গ্রাহকসেবা প্রশিক্ষণ জোরদার করা উচিত।

হুন্ডির বাজার নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার?

রেমিট্যান্স প্রেরকদের জন্য বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। হুন্ডি বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং তার প্রচারণার জন্য প্রয়োজনবোধে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী দূতাবাসগুলো প্রবাসীদের সচেতন ও সহযোগিতার জন্য ব্যাংকগুলোকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে পারে। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী দূতাবাসগুলা দেশের ব্যাংকগুলোর সহযোগিতায় বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য প্রবাসীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করতে পারে।

বিনিময় হার নিয়ে অস্থিরতার সমাধান কী হতে পারে?

বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে কার্যকর নীতি প্রণয়ন করতে হবে। রেমিট্যান্স প্রেরকদের জন্য বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকগুলোর মধ্যে বিনিময় হারসংক্রান্ত অসুস্থ প্রতিযোগিতা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। তাছাড়া ব্যাংকগুলোর ওপেন পজিশন লিমিটকে আরো বাড়ানো যেতে পারে। এ বৃদ্ধির ফলে জরুরি সংকটের সময়ে ব্যাংকগুলো তাদের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দিতে গিয়ে বেশি বিনিময় হার দিয়ে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকবে এবং নিজেরাই বৈদেশিক মুদ্রার সংকলন করতে পারবে। এতে অনেকটা বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।