বাংলাদেশের প্রায় দেড় কোটি মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজ করছে। প্রায় ১৭৬টা দেশ থেকে তারা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। কিন্তু ২০২০ সালের আগ পর্যন্ত আমরা যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পেতাম, ২০২১-২২ সালের দিকে সে তুলনায় কম রেমিট্যান্স পেয়েছি। অন্যদিকে আমাদের অনেক বেশি লোক বিদেশে গেছে। আগে প্রতি বছর আমরা গড়ে পাঁচ-ছয় লাখ লোক দেশের বাইরে পাঠাতাম। ২০২৩-২৪ সালের দিকে এসে সংখ্যাটা গড়ে ১০ লাখের বেশি হয়েছে। সে তুলনায় আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহটা বাড়েনি। যদিও ২০২৪ সালের শেষদিকে এসে আমরা রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি দেখছি, তবু লোকবলের তুলনায় পরিমাণটা কম। ধরেই নেয়া যায়, অর্ধেক রেমিট্যান্সও আসছে না। অনানুষ্ঠানিক গবেষণায় বলা হয়, বৈধ চ্যানেলে আমরা ৪৯ শতাংশ রেমিট্যান্স পাই। আমরা যে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাচ্ছি না, তার কারণ প্রবাসীদের আমরা কোনো কার্যকর ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিত করতে পারিনি। তাদের যত সমস্যা আছে, সেগুলো সমাধানেও কোনো প্লাটফর্ম তৈরি করতে পারিনি। আমাদের উদ্যোগ এখন পর্যন্ত শুধু লেনদেন বা ব্যাংকে টাকা পাঠালে কিছু আর্থিক প্রণোদনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে।
একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে, যারা বাইরে যেতে চায়, তাদের প্রথম যুদ্ধটা শুরু হয় টাকাটা জোগাড় করতে পরিবারের সম্পত্তি বিক্রি বা এনজিও থেকে ঋণগ্রহণের মাধ্যমে। তাদের দ্বিতীয় সমস্যা বিমানবন্দর। বাইরে যাওয়ার সময় বোর্ডিং পাস থেকে শুরু করে বিমানে ওঠা পর্যন্ত তাদের পুরো যাত্রায় বিভিন্ন ভোগান্তি পোহাতে হয়। এরপর দেশের বাইরে তারা কাজ করার সময় যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে তার কিংবা পরিবারের জন্য কোনো সুরক্ষা নেই। দেশে ফিরিয়ে আনতেও তার কোনো নিরাপত্তা নেই। এখানেও তাদের বড় ধরনের একটা ঝক্কিঝামেলা রয়েছে।
প্রবাসী রেমিটারদের কোনো অবসর পরিকল্পনা বা পেনশন বলে কিছু নেই। ২০ বছর বাইরে কাজ করে দেশে এলে তারা আবার বেকার হয়ে যায়। পরিবারের যে সম্পত্তি বিক্রি করে সে বাইরে যায়, তাদের জন্যও সে খুব একটা বেশি কিছু করতে পারে না। তারা কোনো সঞ্চয় করলেও দেশে বাড়ি করতে গিয়ে পুরোটাই শেষ করে ফেলে। তারা কেনো উপার্জন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারে না।
আমরা রেমিট্যান্স আনতে তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুপ্রাণিত করছি, কিন্তু সত্যিকারার্থে তাদের জন্য কোনো কোটা নেই। সেটা স্কুলে ভর্তি, হাসপাতালে চিকিৎসা কিংবা কোনো প্লট বা জমি কেনা যা-ই হোক না কেন, তাদের জন্য কোনো কোটা নেই। বিপরীতে আমরা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর জন্য বিভিন্ন ধরনের কোটার ব্যবস্থা রেখেছি।
রেমিট্যান্সকে আমরা হয়তো ৫০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে পারতাম। সেটা করতে হলে আমাদের সামগ্রিক একটা ব্যাংকিং সমাধান দরকার। এটা নিয়ে আমরা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সও পরিকল্পনা করছি যে কীভাবে বিমানবন্দরের ঝামেলা এড়ানো যায়, সহজভাবে বোর্ডিং পাসের ব্যবস্থা কিংবা বাড়ি থেকে তাদের নিয়ে আসা ইত্যাদি। তিনি যখন দেশের বাইরে কাজ করবেন, তাকে যেন তিন-চার বছর পরেই একটা বাড়ি বানানোর জন্য মর্টগেজ সুবিধা দেয়া যায়, তাকে কেন্দ্র করে তার পরিবারের জন্য সহজ শর্তে এসএমই লোন দেয়া যায়, তাহলে যে সম্পদ বিক্রি করে তিনি বাইরে গেছেন, এগুলো আবার পুনরুদ্ধার করার সুযোগ তৈরি হবে। তাকে যদি ইন্স্যুরেন্স সুবিধা কিংবা অবসর পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসা যায়, তাহলে মোটাদাগে তাকে বৈধ চ্যানেলে আনা এবং তার পরিবারের উন্নতির সুযোগ তৈরি হবে। অন্যথায় ব্যাংকের সঙ্গে তার প্রণোদনা ও রেমিট্যান্স বিনিময় হারের বাইরে আর কোনো সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে না। দেশের এ নতুন প্রেক্ষাপটে এ জায়গায় আমাদের বড় আকারে চিন্তা করতে হবে। এখানে আমাদের একটা বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা ফাইন্যান্স কোম্পানি হিসেবেও তাদের ৩৬০ ডিগ্রি সুবিধা দেয়ার একটা প্লাটফর্ম নিয়ে চিন্তা করছি। যেটা হয়তো আমরা শিগগির উদ্বোধন করব।










