‘দুর্যোগ সহনশীল আবাসন’ বলতে কী বোঝায় এবং দেশের ভিন্ন দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় এ ধরনের আবাসনের মূল বৈশিষ্ট্য কী হওয়া উচিত?
বাংলাদেশকে দুর্যোগের দিক থেকে বড় আকারে তিনটা ভাগে দেখা যায়—ভূমিকম্প, বন্যা ও সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড়। দুর্যোগ সহনশীল আবাসনের মূল কনসেপ্ট হচ্ছে, যে এলাকায় যে ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বেশি, সে অনুযায়ী বাড়ির নকশা করতে হবে। সাইক্লোনের ক্ষেত্রে বাতাস ও পানির তোড় দুটােই বিবেচনায় নিতে হবে। বন্যার ক্ষেত্রে এমনভাবে বাড়ি করতে হবে, যাতে পানি এলেও বাড়িটা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আর ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে ভবনকে ভূমিকম্প সহনীয় করে নির্মাণ করতে হবে।
বাংলাদেশের কোন কোন অঞ্চল বর্তমানে দুর্যোগ সহনশীল আবাসনের জন্য সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবি রাখে এবং এর প্রধান কারণগুলো কী?
ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায়, বিশেষ করে উপকূলীয় ১৭-১৯টি জেলায় এর প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। বন্যার ক্ষেত্রে দেশের নিচু এলাকাগুলো, বিশেষ করে সিলেটের হাওর অঞ্চলসহ যেসব এলাকায় প্রতি বছর বন্যা হয়, সেখানে আলাদা পরিকল্পনা দরকার। ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে পুরো বাংলাদেশই কোনো না কোনোভাবে ঝুঁকির মধ্যে আছে। তবে দিনাজপুর, রংপুর, কুড়িগ্রাম থেকে শুরু করে সিলেট, ময়মনসিংহ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত কিছু এলাকায় ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্প ভিন্ন ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় আবাসন কাঠামো ও নির্মাণ পদ্ধতিতে কী ধরনের পার্থক্য থাকা প্রয়োজন?
ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রে উঁচু প্লাটফর্মের ওপর বাড়ি করা যেতে পারে, যাতে জলোচ্ছ্বাসের পানি নিচ দিয়ে চলে যায় এবং বাতাসের চাপ সহ্য করতে পারে। কয়েকটি পরিবারকে নিয়ে ক্লাস্টার হোম করা যেতে পারে। বন্যার ক্ষেত্রে জায়গা নির্বাচন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোথায় পানি কতটা ওঠে, সেটা বিবেচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী মাটি ভরাট করে বা উঁচু প্লাটফর্মের ওপর ঘর করতে হবে। ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে ভবনের নকশা ও নির্মাণকাজ অবশ্যই বিল্ডিং কোড অনুযায়ী করতে হবে। বিশেষ করে ইটের ও আরসিসি ভবন নির্মাণে প্রশিক্ষিত প্রকৌশলী ও দক্ষ রাজমিস্ত্রি প্রয়োজন।
নদীভাঙন ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় টেকসই এবং নিরাপদ আবাসন নির্মাণে স্থান নির্বাচন ও নির্মাণ পদ্ধতির ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত?
প্রথমে জায়গাটা প্রোপারলি চুজ করতে হবে। গ্রামের লোকের সঙ্গে কথা বলে, অর্থাৎ পার্টিসিপেটরি পদ্ধতিতে পরিকল্পনা করতে হবে। গ্রামের মানুষ জানে কোন জায়গায় প্রতি বছর পানি আসে, কোথায় ভাঙন হয় আর কোন জায়গাটা তুলনামূলক নিরাপদ। নদীর পাড় বা ভঙ্গুর এলাকায় শুধু বাড়ি তৈরি করে দিলেই হবে না। আগে জায়গা নির্বাচন করতে হবে। যেখানে বেশি পানি ওঠে, সেখানে এলিভেটেড বা উঁচু প্লাটফর্ম করতে হবে। আর অল্প বন্যাপ্রবণ এলাকায় মাটি দুই-তিন ফুট উঁচু করে শক্ত ভিত্তির ওপর ঘর তৈরি করা যেতে পারে।
উপকূলীয় এলাকায় ক্লাস্টার হোম বা গুচ্ছভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হতে পারে এবং এর সম্ভাব্য সুবিধাগুলো কী?
ক্লাস্টার হোমের একটা সুবিধা হচ্ছে, কয়েকটা পরিবারকে একসঙ্গে রাখা যায় এবং খরচও কমে। উপকূলীয় এলাকায় পাঁচ-ছয়টি পরিবারকে নিয়ে উঁচু প্লাটফর্মের ওপর ঘর তৈরি করা যেতে পারে, যাতে পানি নিচ দিয়ে চলে যায়। সাইক্লোন শেল্টারে যেখানে দেড়-দুই হাজার মানুষ আশ্রয় নিতে পারে, সেখানে সবাই যেতে পারে না। অনেকে আবার নিজের ঘর ছেড়ে যেতে চান না। সেক্ষেত্রে কয়েকটি পরিবারকে নিয়ে ক্লাস্টার হোম করা কার্যকর একটা ব্যবস্থা হতে পারে।
দেশে বর্তমানে নির্মিত আবাসিক ভবনগুলোর কতটা দুর্যোগ সহনশীল বলে আপনি মনে করেন এবং বিদ্যমান ভবনগুলোর প্রধান দুর্বলতাগুলো কোথায়?
সমস্যা হচ্ছে, আমাদের দেশে বিল্ডিং কোড ও বিভিন্ন আইন আছে, কিন্তু এগুলোর বাস্তবায়ন খুবই দুর্বল। গ্রামেও এখন পাঁচ-ছয়তলা, এমনকি কোথাও কোথাও ১০ তলা ভবন তৈরি হচ্ছে। এগুলো ভূমিকম্প সহনীয়ভাবে তৈরি হচ্ছে কিনা, সেটা নিশ্চিত করার জন্য প্রশিক্ষিত প্রকৌশলী ও রাজমিস্ত্রি প্রয়োজন। পুরনো ভবনগুলোও পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী শক্তিশালী করতে হবে। শুধু নতুন ভবন তৈরি করলেই হবে না, বিদ্যমান ভবনগুলোও ঝুঁকিমুক্ত করতে হবে।
দেশে বিল্ডিং কোড ও বিভিন্ন আইন-বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও ভবনগুলোকে দুর্যোগ সহনশীল করার ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের প্রধান ঘাটতিগুলো কী?
আমাদের দেশে বিল্ডিং রেগুলেটরি ল আছে, ফায়ার সেফটি ল আছে, রাজউকের বিধিমালা আছে, বিল্ডিং কোড আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বাস্তবায়ন। আইন তৈরি করলেই হবে না, আইন মানানোও নিশ্চিত করতে হবে। রাজউকের পক্ষে একা ঢাকার এত বিপুলসংখ্যক ভবন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। এজন্য থার্ড পার্টি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা দরকার। তারা ভবনের নকশা, রড, কংক্রিট, নির্মাণের প্রতিটি ধাপ পরীক্ষা করে সার্টিফিকেট দিতে পারে। এরপর রাজউক চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে।
দুর্যোগ সহনশীল ভবন নির্মাণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে?
ব্যাংকের একটা মেজর রোল আছে। আমেরিকা বা জাপানে কেউ ভবন নির্মাণের জন্য লোন চাইলে ভবনটা ভূমিকম্প ও ফায়ার রেজিস্ট্যান্ট কিনা, সেটা চেক করা হয়। বীমা কোম্পানিগুলোও ভবনের ঝুঁকি বিবেচনা করে। আমাদের দেশেও ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠান যদি ভবনের নিরাপত্তাকে ঋণ ও বীমার সঙ্গে যুক্ত করে, তাহলে সরকারের ওপর চাপ কমবে। মানুষও নিরাপদ ভবন নির্মাণে উৎসাহিত হবে।
আগামী দিনে বাংলাদেশে দুর্যোগ সহনশীল আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারের নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কী ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন?
আমাদের আলাদা প্রকল্প না করে একটা সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে। কোথায় কোন দুর্যোগের ঝুঁকি বেশি, সেটা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী আবাসন পরিকল্পনা করতে হবে। প্রকৌশলী ও রাজমিস্ত্রিদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, প্ল্যানিং ও আর্কিটেকচার বিভাগগুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, দুর্যোগ হওয়ার পর প্রতি বছর ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ না করে দুর্যোগ হওয়ার আগেই এমনভাবে আবাসন তৈরি করতে হবে, যাতে দুর্যোগ এলেও মানুষ ও তাদের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
দুর্যোগ সহনশীল আবাসন প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
গ্রামের লোকের সঙ্গে কথা বলে, অর্থাৎ পার্টিসিপেটরি পদ্ধতিতে প্ল্যানটা তৈরি করতে হবে। কারণ গ্রামের মানুষ জানে কোন এলাকায় ক্ষতি হবে আর কোন এলাকায় কম ক্ষতি হবে। ফ্লাড হোক বা সাইক্লোন, কোন জায়গা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত আর কোন জায়গা কম—এটা চিহ্নিত করে তারপর গুচ্ছগ্রাম বা আবাসন তৈরি করা উচিত।
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কম খরচে দুর্যোগ সহনশীল আবাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোন ধরনের আবাসন মডেল কার্যকর হতে পারে?
কয়েকটি পরিবারকে নিয়ে ক্লাস্টার হোম করলে খরচ কমানো সম্ভব। পাঁচ-ছয়টা ফ্যামিলিকে একসঙ্গে নিয়ে উঁচু প্লাটফর্মের ওপর বাসা তৈরি করা যায়। এতে কয়েকটি পরিবার একসঙ্গে থাকতে পারবে এবং আলাদা আলাদা করে প্রত্যেক পরিবারকে বড় খরচ করতে হবে না। আবার প্রতি বছর বন্যায় ঘর ভেঙে গেলে একজন মানুষকে অনেক টাকা খরচ করতে হয়, অনেক সময় তাকে গরু বিক্রি করতে হয়, ব্যাংক থেকে লোন নিতে হয় অথবা গ্রামের মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা নিতে হয়। তাই শুরুতেই দুর্যোগ সহনশীল ঘর তৈরি করা দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর।
পাহাড়ধস বা ল্যান্ডস্লাইডপ্রবণ এলাকায় আবাসন নির্মাণ ও বসতি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন?
ল্যান্ডস্লাইডের ক্ষেত্রে প্রথম কথা হচ্ছে, পাহাড়ের পাদদেশে কোনোভাবে বাসা তৈরি করতে দেয়া যাবে না। এটা মূলত ম্যানেজমেন্টের বিষয়। জুলাই-আগস্টে যখন ল্যান্ডস্লাইডের সময় এবং বৃষ্টি হয়, তখন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকা মানুষকে আগে থেকেই ইভাকুয়েট করতে হবে। বাসা ভালো না খারাপ সেটা এখানে বড় বিষয় না। পাহাড়ের মাটি ভেঙে পড়লে ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হবেই। তাই কোথায় বসতি করা যাবে, সেটাই আগে ঠিক করতে হবে।
দুর্যোগ সহনশীল আবাসন ও নিরাপদ ভবন নির্মাণে প্রকৌশলী ও রাজমিস্ত্রিদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা কতটা এবং এক্ষেত্রে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার?
এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের গ্রামেও এখন পাঁচ-ছয়তলা, কোথাও কোথাও ১০ তলা ভবন তৈরি হচ্ছে। এগুলো ভূমিকম্প সহনীয় হচ্ছে কিনা, সেটা নিশ্চিত করার জন্য ট্রেনড ইঞ্জিনিয়ার এবং ট্রেনড মেসন দরকার। আগে বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ ইঞ্জিনিয়ার ও প্রায় এক হাজার মেসনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটা অনেক বছর আগে। আবার নতুন করে এ উদ্যোগ নেয়া দরকার।
নতুন ভবন নির্মাণের প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণে থার্ড পার্টি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা কতটা প্রয়োজনীয় এবং এর মাধ্যমে কী ধরনের চেক অ্যান্ড ব্যালান্স প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব?
রাজউকের পক্ষে প্রত্যেক সময় গিয়ে প্রতিটি বিল্ডিং চেক করা সম্ভব নয়। এজন্য একটা ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মকে এনগেজ করা যেতে পারে, যারা নির্মাণের প্রতিটি ধাপ মনিটর করবে। রড ঠিকমতো দেয়া হচ্ছে কিনা, কংক্রিটের কোয়ালিটি ঠিক আছে কিনা, বিল্ডিংয়ের ডিজাইন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কিনা—এসব তারা পরীক্ষা করবে এবং সার্টিফিকেট দেবে। এরপর রাজউক সে সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে ফাইনাল সার্টিফিকেট দেবে। এতে কোনো ভুল হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও দায়বদ্ধ থাকবে। এ চেক অ্যান্ড ব্যালান্সটা আমাদের দরকার।
দুর্যোগ সহনশীল আবাসন ও নিরাপদ ভবন নির্মাণে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, প্ল্যানিং ও আর্কিটেকচার বিভাগগুলোকে কীভাবে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে?
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, প্ল্যানিং ও আর্কিটেকচার বিভাগ আছে। তাদের যদি নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কী কী বিষয় বিবেচনা করতে হবে এবং পুরনো ভবন কীভাবে মজবুত করতে হবে, এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে অনেক কাজে লাগবে। শুধু পিডব্লিউডির ওপর দায়িত্ব দিলে হবে না। পিডব্লিউডি মূলত সরকারি ভবনের দায়িত্বে থাকে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো দরকার।










