মানুষের সভ্যতার ইতিহাস অনেকখানি তার আশ্রয়ের ইতিহাস। একসময় গুহা, গাছের ছায়া কিংবা ডালপালায় তৈরি অস্থায়ী কাঠামো ছিল মানুষের নিরাপদ আশ্রয়। কৃষিভিত্তিক স্থায়ী জনপদ গড়ে ওঠার পর ঘর হয়ে উঠল পরিবার ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্র। এরপর নগরসভ্যতা, শিল্পবিপ্লব, আধুনিক প্রকৌশল এবং প্রযুক্তির বিকাশ আবাসনের ধারণাকে বারবার বদলে দিয়েছে। আজ আমরা সে বিবর্তনের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি।
ভবিষ্যতের আবাসন নিয়ে তাই প্রশ্নটি শুধু কতগুলো বাড়ি নির্মাণ করা হবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো সে বাড়ি কোথায় হবে, কার জন্য হবে, কতটা সাশ্রয়ী হবে এবং পরিবর্তিত পরিবেশে কতদিন নিরাপদ ও বাসযোগ্য থাকবে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ প্রশ্ন আরো গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বর্তমান ঘাটতি ও ভবিষ্যৎ চাহিদা মোকাবেলায় দেশে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ নতুন আবাসন প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের ভূমি সীমিত, জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি এবং কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধাকে কেন্দ্র করে নগরমুখী মানুষের চাপ রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের আবাসন পরিকল্পনায় প্রথম বড় পরিবর্তনটি আসতে হবে ভূমি ব্যবহারে।
আনুভূমিকভাবে শহর বাড়ানোর পরিবর্তে পরিকল্পিত উল্লম্ব সম্প্রসারণ, উচ্চ ঘনত্বের আবাসন, মিশ্র ভূমি ব্যবহার, অব্যবহৃত ও স্বল্প ব্যবহৃত জমির কার্যকর ব্যবহার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুনরায় উন্নয়নের কথা ভাবতে হবে। তবে উচ্চ ঘনত্ব মানে শুধু একই জায়গায় অনেক ভবন কিংবা অনেক মানুষ নয়। সেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, উন্মুক্ত ও সবুজ স্থান, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যসেবা, বাজার, খেলার জায়গা, পানি ও পয়োনিষ্কাশন এবং সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকতে হবে। কারণ আমাদের প্রয়োজন শুধু ‘হাউজিং’ নয়, প্রয়োজন বাসযোগ্য ‘হ্যাবিট্যাট’।
দ্বিতীয় বড় পরিবর্তন আসবে প্রযুক্তিতে। প্রিফ্যাব্রিকেটেড ও মডুলার নির্মাণ, বিল্ডিং ইনফরমেশন মডেলিং (বিআইএম), জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস), আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যুগোপযোগী জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক নির্মাণসামগ্রী ভবিষ্যতে নির্মাণের সময় ও ব্যয় কমাতে পারে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যভিত্তিক প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার আমাদের আবাসন পরিকল্পনা, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবা প্রদানের ধরনেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। প্রযুক্তি আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে কোথায় আবাসনের চাহিদা বাড়ছে, কোন জমি ব্যবহারের উপযোগী, কোথায় দুর্যোগ ঝুঁকি বেশি এবং কোন এলাকার অবকাঠামো কত মানুষের চাপ নিতে সক্ষম।
কিন্তু ভবিষ্যতের আবাসনকে শুধু প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক হলেই চলবে না, তাকে হতে হবে জলবায়ু সহনশীল। বিশ্বব্যাংকের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে স্থানান্তর হতে পারে। ফলে উপকূলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস সহনশীল আবাসন, বন্যাপ্রবণ এলাকায় পানির গতিপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নির্মাণ এবং শহরে ভূমিকম্প সহনশীল ভবন, পর্যাপ্ত জলাধার ও সবুজ এলাকার প্রয়োজন আরো বাড়বে। সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস এবং জ্বালানিসাশ্রয়ী নকশাও ধীরে ধীরে আবাসনের সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হওয়া প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অবশ্য মানুষের সামর্থ্য। বাজারে ফ্ল্যাট থাকলেই আবাসন সমস্যার সমাধান হয় না, যদি অধিকাংশ মানুষ তা কিনতে না পারেন। তাই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহজ অর্থায়ন, সাশ্রয়ী আবাসন, ভাড়াভিত্তিক আবাসন, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ক্রস-সাবসিডির মতো মডেল নিয়ে আরো কাজ করতে হবে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের মধ্যেও স্বল্পব্যয়ের নগর ও গ্রামীণ গৃহায়ন প্রকল্প এবং অসহায় ও দুস্থ নাগরিকদের জন্য গৃহায়ন কার্যক্রমের বিষয়টি স্পষ্টভাবে রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে অনুমোদিত জাতীয় নগরনীতি ২০২৫ পরিকল্পিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু সহনশীল নগরায়ণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সেখানে সাশ্রয়ী আবাসন, বিকেন্দ্রীকরণ, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং নগর ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের বিষয়ও এসেছে। এ নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যতের আবাসন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ভবিষ্যৎ ভূমিকাকেও তাই শুধু প্লট বা ফ্ল্যাট নির্মাণ ও বরাদ্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আমাদের ভাবতে হবে একটি পরিবারকে ঘিরে। সে পরিবারের কর্মসংস্থান কোথায়, শিশুর বিদ্যালয় কত দূরে, চিকিৎসার সুযোগ আছে কিনা, যাতায়াতে কত সময় যাচ্ছে এবং আবাসন ব্যয় তার আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা।
হাজার বছর আগে মানুষ ঘর বানিয়েছিল নিরাপত্তার জন্য। ভবিষ্যতের মানুষও নিরাপত্তা চাইবে, তবে সে নিরাপত্তার অর্থ হবে আরো বিস্তৃত। সেখানে থাকবে দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা, আর্থিক সামর্থ্য, প্রযুক্তির সুবিধা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন।
ভবিষ্যতের গৃহায়ন তাই মূলত ভবিষ্যতের মানুষের জীবনকে পরিকল্পনা করা। সেখানে প্রকৌশল থাকবে, প্রযুক্তি থাকবে, অর্থনীতি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা থাকবে। কিন্তু সবকিছুর কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষকে। একটি উন্নত রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু তার আকাশছোঁয়া ভবনে নয়, বরং সে রাষ্ট্র তার সাধারণ মানুষের জন্য কতটা নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসন নিশ্চিত করতে পেরেছে, শেষ পর্যন্ত সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।










