বাংলাদেশে পাঁচ শতাধিক শহর রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি শহরে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আছে যা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। বাকি শহরগুলো বড় ও ছোট পৌরসভা এবং কিছু অ-পৌর শহর। পৌরসভাগুলো পরিচালিত হয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে। প্রায় সব শহরেই গ্রামীণ বৈশিষ্ট্য প্রকট। তাই এগুলো শহরমুখী জনস্রোত এবং জলবায়ুজনিত অভিবাসীদের গন্তব্য নয়—ঢাকা ও চট্টগ্রামই তাদের লক্ষ্য।
তাই বলে এটা মনে করা ঠিক হবে না যে ছোট ও মাঝারি জনকেন্দ্রগুলো বাড়ছে না। বরং এ জনপদগুলোর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঢাকা ও চট্টগ্রামে করা একই ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর প্রশাসন ও মনিটরিং ব্যবস্থার অভাবে আরো বেশি গুরুতর ও অপরিবর্তনীয় ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড ঘটছে। উদাহরণস্বরূপ আমরা বলতে পারি, বেশির ভাগ পৌরসভায় বাড়ি নির্মাণের সময় সেট-ব্যাক নিয়মগুলো মেনে চলা হচ্ছে না। ফলে ১০-১৫ ফুট রাস্তার পাশেই ১০-১৫ তলা ভবন হয়ে যাচ্ছে। প্রায় সব পৌরসভায় ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে পানির সর্বশেষ নিষ্কাশনের স্থান বা আউটফল ঠিক না করেই। ফলে ছোট শহরে জলাবদ্ধতা চিরদিনের জন্য স্থায়ী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। একইভাবে প্রায় প্রতিটি শহরের জন্য কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার ও পাহাড়ি অঞ্চলের জেলা শহরগুলোতে হোটেল, রিসোর্ট ও হাউজিং তৈরি করতে পাহাড় কাটা হচ্ছে। নরসিংদী, বগুড়া, যশোর, সাভারের মতো শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসমৃদ্ধ শহরগুলোয় অনিরাপদ ও দূষণকারী শিল্পের বিস্তার হচ্ছে।
এ ধরনের বস্তুগত ও পরিবেশগত পরিবর্তনের বিপরীতে স্মার্ট ও টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে এবং দেশব্যাপী বড়-ছোট নগর ও গ্রামীণ এলাকার পরিবেশগত ও অর্থনৈতিকভাবে সর্বোত্তম বণ্টন নিশ্চিত করতে আমাদের একটি জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা কাঠামো (এসপিএফ) প্রয়োজন। এ কাঠামো শুধু বসতি ও প্রতিটি শ্রেণীর জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক-অর্থনৈতিক অবকাঠামো এবং সুবিধার ক্রমবিন্যাস নিশ্চিত করবে না, বরং এমন বিষয়গুলোও চিহ্নিত ও সমাধান করবে যা জাতীয় ও আঞ্চলিক স্তরেই করা প্রয়োজন। ফলে স্থানীয় স্তরে প্রকল্প তৈরি ও বাস্তবায়ন সহজ হবে। বেসরকারি খাতের জন্য এ কাঠামো স্পষ্ট বিনিয়োগবার্তা দেবে—ঢাকার বাইরে কোথায় বিনিয়োগ করা যাবে এবং কোন সেক্টর বা স্থানে বিনিয়োগ করা যাবে। বলে রাখা ভালো, সব শহর ও গ্রামের পরিকল্পনা করে যোগ করলেই জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা করা হয়ে যায় না, এটি একটি জাতীয় পরিকল্পনা যা আলাদাভাবে করতে হবে।
আমাদের ছোট ও মাঝারি শহরগুলোর পরিচালন কাঠামো (গভর্ন্যান্স) ঠিক করতে হবে। বর্তমানে এ শহরগুলোর নিজের পরিকল্পনা তৈরির ক্ষমতা নেই এবং যারা পরিকল্পনা অনুযায়ী বৃদ্ধি ও নির্মাণ কার্যক্রম হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করবে এমন কোনো সমরূপ কর্মীও নেই, যা কিছু শহরের জন্য শহর উন্নয়ন অধিদপ্তর (ইউডিডি) বা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) দ্বারা তৈরি করা হয়। তাই পরিকল্পনাগুলো কেবল একটি কাগজের নথি হিসেবেই থেকে যায়, যা স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষ দ্বারা প্রয়োগ করা হয় না বা এর মালিকানাবোধও তাদের তৈরি হয় না। তাই ছোট ও মাঝারি শহরগুলোর অপরিকল্পিত বৃদ্ধি রোধ এবং পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইউডিডিকে উপজেলা পর্যন্ত বিস্তার করা প্রয়োজন। আর পৌরসভা ও এর বাইরে পরিকল্পনামাফিক উন্নয়ন হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্থানীয় সরকার স্থানিক পরিকল্পনা অধিদপ্তর (এলজিএসপিডি) তৈরি করা আবশ্যক।
ছোট শহরের জন্য কোনো পরিকল্পনা না থাকায় বা থাকলেও বাস্তবায়ন মনিটরিং না করায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (এনএইচএ) কম এবং মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য এমন জায়গায় প্লট উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েছে যা স্থানীয় অর্থনৈতিক কেন্দ্র থেকে দূরে অবস্থিত। উপজেলা কর্তৃপক্ষ খাসজমিতে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ‘আশ্রয়ণ’ প্রকল্প গ্রহণ করেছে, যা অনেক ক্ষেত্রে এমনকি উপজেলা সড়কের সঙ্গেও সংযুক্ত নয়। উভয় ক্ষেত্রে দূরদর্শী পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক উপযোগিতার কোনো বিচার করার বদলে ব্যক্তিনির্ভর পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত যে নেয়া হয়েছে সেটা বলাই বাহুল্য।
কিন্তু ছোট ও মাঝারি শহর নিয়ে জাতীয় পরিকল্পনা কাঠামোর আলোকে সমন্বিত ও সিরিয়াস পরিকল্পনা করা ও বাস্তবায়ন করা সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলে আবাসন, যোগাযোগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অন্যান্য নাগরিক সুবিধা প্রদানের জন্য নানা ধরনের উদ্ভাবনী ও সৃষ্টিশীল প্রকল্প নিতে পারবে। বেসরকারি আবাসন উদ্যোক্তারা কেবল ঢাকায় ভিড় না করে এসব ‘মফস্বল’ শহরে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারবেন তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক দামে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসহ আবাসন দেশের মানুষের, বিশেষ করে প্রবাসীদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারবেন। আবার দরিদ্র মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের জন্য নানা ধরনের আবাসন ‘মফস্বল’-এর মার্কেটে নিয়ে আসতে পারবেন। সরকার যদি ঢাকার ভাসানটেক বা বাউনিয়াবাঁধ মডেলের এসব আবাসন ভাড়া নিতে বা কিনতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে কাজে লাগায় তাহলে সরকার, ডেভেলপার ও দরিদ্র মানুষ মিলে দারুণ একটা মডেলের সূচনা হতে পারে। শুধু তা-ই নয়, এসব নির্মাণযজ্ঞের জন্য ছোট শহরগুলোর অর্থনীতিতে দারুণ ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ তৈরি হবে। সবকিছু মিলিয়ে ছোট শহরগুলোতে যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হবে সেটা যদি ২০০টি শহরেও নিশ্চিত করা যায় তাহলে দেশব্যাপী যে বিশাল সাড়া পড়বে তার অভিঘাত বড় শহরগুলোতেও পড়বে। অনেক ঢাকামুখী মানুষ তখন নিজের কাছের শহরে ভাগ্যকে পরীক্ষা করবে। আবার বড় শহর থেকেও বিপরীত অভিবাসন হতে পারে ছোট, ছিমছাম, নির্মল বায়ু, খোলা জায়গা ও নির্দিষ্ট সুযোগ-সুবিধা ও বাসযোগ্যতার তালিকায় উঁচুতে থাকা এসব ছোট শহরে।
এর ফলে প্রকৃতপক্ষেই নতুন এক বাংলাদেশের দেখা পাওয়া যাবে। আর সেটা হবে ছোট ও মাঝারি শহরের বাংলাদেশ। ঢাকা মানেই বাংলাদেশ নয়—এটা যখন সম্ভব হবে, বাংলাদেশে নগরায়ণ তখন টেকসই হবে।










