বাংলাদেশের নগরায়ণ ও আবাসন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই ঢাকাকেন্দ্রিকতার বিষয়টি আসে। আপনি সমস্যাটিকে কীভাবে দেখেন?
আমাদের মূল সমস্যাটা আসলে শুধু ঢাকার নয়, পুরো দেশের অবকাঠামোগত ভারসাম্যের। সরকারকে অবকাঠামো করতে হবে, রাস্তা করতে হবে, ব্রিজ করতে হবে। বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থারও উন্নতি করতে হবে। শহর, জেলা, উপজেলা, সব জায়গায় উন্নয়ন দরকার। আমাদের দেশে সবাই ঢাকায় যেতে চায়। কেন যেতে চায়? কারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ভালো শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, সুযোগ-সুবিধা, সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক। এ প্রবণতাকে থামাতে হলে শুধু ঢাকার ভেতরে অবকাঠামো উন্নয়ন করলে হবে না। ঢাকার বাইরে অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে। জায়গাটিতে আমরা যদি যথেষ্ট গুরুত্ব না দিই, তাহলে কোনো সময়ই সমস্যাটার স্থায়ী সমাধান হবে না।
তাহলে ঢাকার ওপর চাপ কমানোর মূল কৌশল কী হওয়া উচিত বলে মনে করেন?
ঢাকাকে আরো বড় করার চেয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলকে শক্তিশালী করা জরুরি। মানুষের সামনে বিকল্প তৈরি করতে হবে। এজন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকায় নতুন এমআরটি লাইন করার বিষয়টি সরকার অনুমোদন করেছে। এটা খুবই ভালো পদক্ষেপ। ঢাকার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে এ ধরনের গণপরিবহন ব্যবস্থা অবশ্যই প্রয়োজন। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আমার মনে হয়, পরিকল্পিতভাবে পাঁচ-ছয়টি মোটরওয়ে তৈরি করে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক অঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোকে যুক্ত করা যেতে পারে। ছোট একটি দেশ আমাদের। অথচ দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে এখনো অনেক সময় লাগে, মানুষকে ফ্লাইট ধরতে হয়। তাইওয়ানের কথা যদি বলি, তাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় আকাশপথে চলাচল উল্লেখ করার মতো নয়। তাদের সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা এত শক্তিশালী যে সময় বাঁচানোর জন্য অভ্যন্তরীণ আকাশপথ ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। বাংলাদেশেও আমাদের জায়গাটিতে যেতে হবে। হাইস্পিড ট্রেন, মোটরওয়ে অর্থাৎ উচ্চগতির যানবাহনের জন্য তৈরি বিশেষ মহাসড়ক বা এক্সপ্রেসওয়ে তৈরিতে বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে হবে। এটা পুরো অর্থনীতির বিষয়। পরিবহন কস্ট কমে আসবে। লজিস্টিকস কস্ট কমবে।
রফতানির কি সমস্যা রয়েছে?
আমরা বাংলাদেশ থেকে ইস্পাত রফতানির চেষ্টা করি। কিন্তু এখানে খরচ অনেক বেশি। ইস্পাতে বিশ্বজুড়ে একটা বিষয় আছে। এটা হাই ভলিউম, লো মার্জিনের ব্যবসা। অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করতে হয়, কিন্তু মুনাফার মার্জিন তুলনামূলক কম। ফলে লজিস্টিকস কস্ট বেশি হলে রফতানি করা খুব কঠিন হয়ে যায়। বাংলাদেশে ফ্রেইট ও লোকাল ট্রান্সপোর্ট কস্ট খুব বেশি। অনেক সময় এটা অস্বাভাবিক পর্যায়ে চলে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়। আমি বারবার বলছি, মোটরওয়েগুলো করতেই হবে। ট্রান্সপোর্ট কস্ট কমিয়ে আনতেই হবে।
শুধু যোগাযোগ ব্যয় নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক ব্যয় নিয়েও কি উদ্বেগ রয়েছে?
হ্যাঁ। বাংলাদেশকে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকার মতো দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশ অনেক বেশি ব্যয়বহুল দেশ হয়ে গেছে। এটা শুধু শিল্পের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ক্ষেত্রেও বড় সমস্যা তৈরি করছে। বিশেষ করে জমির দাম। বাংলাদেশে একটা জমির দাম যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, এটা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের ভূমিকা কী?
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এখানে। শিল্পের বড় একটি ভিত্তি এখানে রয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রামকে দেশের অর্থনীতিতে আরো শক্তিশালীভাবে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দিতে হলে এর সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ আরো শক্তিশালী করতে হবে। চট্টগ্রামকে শুধু একটি বন্দরনগরী হিসেবে দেখলে হবে না। এটাকে একটি বড় অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে দেখতে হবে। চট্টগ্রাম থেকে সিলেট, ঢাকা, উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও বন্দরগুলোর সঙ্গে দ্রুত ও কার্যকর যোগাযোগ থাকতে হবে। একইভাবে সিলেটসহ অন্য গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোকেও দেশের অর্থনীতিতে আরো শক্তিশালী ভূমিকা রাখার সুযোগ দিতে হবে।
উন্নত বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে ডিজিটাইজেশনকে কীভাবে দেখেন?
আসল ডিজিটাইজেশন করতে হবে, শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই ডিজিটাইজেশন হয় না। পুরো ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করতে হবে। এটা করা গেলে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায়ও বড় পরিবর্তন আসবে। তখন জোর করে রাজস্ব আদায় করতে হবে না। সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থার মধ্যেই স্বাভাবিকভাবে রাজস্ব আদায় হয়ে যাবে। সবার মধ্যে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসা ও অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, তথ্যের ব্যবহার এবং কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা গেলে সরকারের রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যবসার পরিবেশও উন্নত হবে।
উন্নত বাংলাদেশ গড়তে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজটি কী বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের উদ্যোক্তারা উৎপাদনে সক্ষম। ইস্পাত শিল্পে আমরা বিশ্বের সর্বশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। ভবিষ্যতে আরো প্রযুক্তি আসবে, শিল্প সেটা গ্রহণ করবে। এখন সরকারের কাজ হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে কারখানার বাইরে অপ্রয়োজনীয় খরচ ও বাধাগুলো কমে আসে। বিশেষ করে ট্রান্সপোর্ট ও লজিস্টিকস কস্ট কমাতে হবে। সারা দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারলে শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন হবে না। চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো অর্থনীতিতে আরো শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে। উৎপাদন ছড়িয়ে পড়বে। কর্মসংস্থান ছড়িয়ে পড়বে। আবাসন ছড়িয়ে পড়বে। তখন দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এক জায়গায় আটকে থাকবে না। পুরো দেশই অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠবে। আমার বিশ্বাস, এ পরিবর্তন করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর ফল দ্রুতই দৃশ্যমান হবে।










