বাংলাদেশের হোম লোন বাজারের বর্তমান চিত্র ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কেমন?

আমাদের দেশে নগরায়ণ হয়েছে মূলত কয়েকটি বড় শহরকে কেন্দ্র করে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সব সরকারি-বেসরকারি অফিস কেন্দ্রীভূত থাকায় নগরায়ণ হয়েছে প্রধানত ঢাকাকেন্দ্রিক। জনসংখ্যার দিক থেকে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি। ফলে বিশাল জনগোষ্ঠীর জায়গার সংস্থানে এ শহরে আবাসনের চাহিদাও আগের তুলনায় বেড়েছে। পাশাপাশি ঢাকায় জমি ও ফ্ল্যাটের দাম বেড়ে যাওয়ায় এ চাহিদা এখন দ্বিতীয় সারির শহর ও শহরতলিতেও ছড়িয়ে পড়ছে। দেশজুড়ে ব্র্যাক ব্যাংকের বিস্তৃত শাখা ও নেটওয়ার্ক থাকায় এ নতুন চাহিদার জায়গাগুলোতেও আমরা গ্রাহকের পাশে দাঁড়াতে পারছি।

তবে আমাদের দেশে বর্তমানে বাড়ি ও ফ্ল্যাটের কেনাবেচা কমেছে, ফলে হোম লোন নেয়ার প্রবণতাও আগের তুলনায় কিছুটা কম। উচ্চ সুদহার ও মূল্যস্ফীতির কারণে হোম লোনের বাজার চাপে আছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে, যার ফলে খরচও বেড়েছে। জমি ও ফ্ল্যাটের দাম বৃদ্ধির এ ধারায় চাপ বেড়েছে আবাসন চাহিদার মূল চালিকাশক্তি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপর।

আশার কথা হলো, চলতি বছরের শুরুর দিকে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হলে এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতা কমে এলে দেশের অর্থনীতি এ চাপ থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসবে। তখন আবাসনের চাহিদাও বাড়তে শুরু করবে এবং হোম লোন নেয়ার পরিমাণও আগামী দিনে বাড়বে।

জমি ও নির্মাণ ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির সময়ে মধ্যবিত্তের নিজস্ব আবাসনের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যাংক খাত কীভাবে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে?

দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আবাসন চাহিদা মেটাতে ব্যাংক অনেকভাবেই ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে গ্রাহকদের ফ্ল্যাটে করা বিনিয়োগ নিরাপদ করতে ব্যাংক কাজ করতে পারে। যেমন ব্র্যাক ব্যাংকের মাধ্যমে কোনো গ্রাহক হোম লোন নিতে চাইলে ব্যাংকের নিজস্ব সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের কারিগরি দল সম্পত্তিটি সরজমিনে যাচাই করে। আর আমাদের ইন-হাউজ লিগ্যাল টিম প্রতিটি দলিল, মালিকানার ধারাবাহিকতা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন খতিয়ে দেখে। অর্থাৎ আমরা অর্থায়নের পাশাপাশি গ্রাহকের লেনদেনকেও সুরক্ষিত রাখতে ভূমিকা রাখি।

একই সঙ্গে ডেভেলপার ও ব্যাংকের মধ্যে সমন্বিত অংশীদারত্বের মাধ্যমে প্রি-অ্যাপ্রুভড প্রকল্প চালু করা যেতে পারে, যেখানে ক্রেতারা নির্দিষ্ট প্রকল্পে সহজে অর্থায়ন পাবেন। যেমন দেশের শীর্ষস্থানীয় ও প্রতিশ্রুতিশীল ডেভেলপারদের সঙ্গে ব্র্যাক ব্যাংক যৌথভাবে কাজ করছে, যাতে গ্রাহকেরা আইনি ঝামেলামুক্ত প্রকল্পে অর্থায়ন পান। এতে নথিপত্র প্রস্তুতি দ্রুত হয় এবং প্রক্রিয়াকরণ খরচও কমে। নির্মাণাধীন প্রকল্পে ডেভেলপার ও গ্রাহকের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমেও আমরা অর্থায়ন করছি।

ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া দ্রুত ও ডিজিটাইজড করাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে হোম লোনের অনুমোদন কার্যক্রম আরো কার্যকর করা প্রয়োজন, যাতে কাগজপত্র ও যাচাই-বাছাইয়ে মাসের পর মাস সময় না লাগে। খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই ব্র্যাক ব্যাংকের হোম লোন আবেদনের পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাইজড হয়ে যাবে। ফলে আগামী দিনে আমাদের সারা দেশের গ্রাহকরা ঘরে বসেই হোম লোনের আবেদন করতে পারবেন। এছাড়া দক্ষ সেলস ও অপারেশন টিম থাকায় আবেদনের পর দ্রুততম সময়েই ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রাহকরা হোম লোন পাচ্ছেন।

মূল কথা হলো ব্যাংককে শুধু একটি লোন প্রডাক্ট বিক্রিতে থেমে থাকলে চলবে না। দীর্ঘমেয়াদি ইএমআই, সহজ প্রক্রিয়া ও সম্পত্তির পূর্ণ যাচাইয়ের সুবিধা দিয়ে গ্রাহকদের বাড়ি কেনার যাত্রায় একজন বিশ্বস্ত সঙ্গী হয়ে উঠতে হবে।

আবাসনে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে সুদহার, কিস্তির সক্ষমতা ও ঋণঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোর কৌশল কেমন হওয়া উচিত?

হোম লোন দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় ইন্টারেস্ট রেট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। এসব ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে স্বচ্ছ হওয়ার পাশাপাশি গ্রাহকদের ঋণ নেয়ার সময়েই সব তথ্য অবহিত করতে হবে। ইন্টারেস্ট রেট নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলোকে একটি বেঞ্চমার্ক তৈরি করে নিতে হবে, যাতে গ্রাহকদের সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সহজ হয়। যেমন ব্র্যাক ব্যাংক একটি বেঞ্চমার্ক রেটের সঙ্গে মার্জিন যোগ করে হোম লোনের ইন্টারেস্ট রেট নির্ধারণ করে। ছয় মাস পরপর এ রেট পুনর্মূল্যায়ন করা হয়, যাতে গ্রাহকদের কম খরচে সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করা যায়।

গ্রাহকের কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি ব্যাংকের শক্তিশালী ও আধুনিক মানের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। আন্তর্জাতিক মানের টুল ব্যবহার ও করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে গ্রাহকের কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করার পাশাপাশি ব্যাংকের ঝুঁকিও কমে আসে।

পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানিসাশ্রয়ী আবাসনকে উৎসাহিত করতে ব্যাংক খাতে ‘গ্রিন হোম ফাইন্যান্সিং’-এর কী ধরনের সম্ভাবনা দেখছেন?

বাংলাদেশে ‘গ্রিন হোম ফাইন্যান্সিং’-এর সম্ভাবনা অনেক বড়, কারণ আমাদের এখন জ্বালানি সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয় নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন, রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং, জ্বালানিসাশ্রয়ী নির্মাণসামগ্রী বা পরিবেশবান্ধব নকশার বাড়ি তৈরির দিকেই আমাদের মনোযোগ দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে এসব বাড়িতে বিদ্যুৎ ও পানির বিল কম হওয়ায় গ্রাহকের মাসিক খরচও কমে, যা ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়ায়।

তবে গ্রাহক বা ব্যাংক, কারো একার পক্ষেই গ্রিন হোম ফাইন্যান্সিং করা কঠিন। কারণ এ ধরনের টেকসই বাড়ি নির্মাণের খরচ সাধারণ বাড়ি নির্মাণের তুলনায় বেশি হয়। তাই গ্রাহকদের উৎসাহ দিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সাধারণ গৃহ ঋণের তুলনায় কম ইন্টারেস্টে বা বিশেষ ছাড়ে অর্থায়ন করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা বা জলবায়ু তহবিলের সঙ্গে অংশীদারত্বে কম ইন্টারেস্টে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা তৈরি করা গেলে ব্যাংকগুলো আরো সহজে গ্রিন হোম ফাইন্যান্সিং করতে পারবে।

পরিকল্পিত নগরায়ণ ও ভবিষ্যতের আবাসন চাহিদা বিবেচনায় দেশের হোম লোন বাজারকে আরো গতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে আপনার মতে কোন নীতিগত উদ্যোগগুলো সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে?

ভবিষ্যতের আবাসন চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ দেশের হোম লোন বাজারকে আরো গতিশীল করছে। যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক হোম লোনের সীমা ২ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ কোটি টাকা করেছে। জমি ও ফ্ল্যাটের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে আগের সীমায় গ্রাহকের প্রকৃত চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। এমন সময়োপযোগী পদক্ষেপের জন্য আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সাধুবাদ জানাই।

একই সঙ্গে ঋণের সীমাকে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, যাতে ভালো ঋণ ব্যবস্থা মেনে চলা ব্যাংকগুলো বেশি ঋণ দেয়ার সুযোগ পায়, আর বেশি খেলাপি ঋণের ব্যাংক কিছু সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়। ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্র্যাক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে আমরা গ্রাহকদের প্রয়োজন অনুসারে বড় ধরনের হোম লোন দিতে পারব। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব পদক্ষেপ আবাসন খাতে দীর্ঘমেয়াদি ও নিরাপদ বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করবে।

তবে আবাসন খাতে অর্থায়নে কিছু সমস্যাও রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা কাগজপত্রের প্রক্রিয়ায় ও জমি রেজিস্ট্রেশনে বেশি সময় লাগায় ঋণ বিতরণ ও সম্পত্তি হস্তান্তর পিছিয়ে যায়। এছাড়া সম্পত্তি হস্তান্তরে কর, ভ্যাট ও নিবন্ধন ফি মিলিয়ে মোট মূল্যের ১০-১২ শতাংশ পর্যন্ত খরচ হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি।

এসব সমাধানে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট নীতিগত পদক্ষেপ দরকার। জমি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা গেলে হোম লোন ছাড়ের সময় কমে আসবে। নিবন্ধন ফি ও কর যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং মধ্যবিত্তের জন্য একটি বিশেষ রিফাইন্যান্স স্কিম চালু করাও জরুরি, যাতে কম ইন্টারেস্টে হোম লোন দেয়া সম্ভব হয়। আর দীর্ঘমেয়াদে একটি হাউজিং বন্ড বাজার গড়ে তোলাও প্রয়োজন, কারণ ২০-২৫ বছরের ঋণ দিতে হলে ব্যাংকের হাতে দীর্ঘমেয়াদি তহবিলও থাকা চাই।