বাংলাদেশের ইন্টেরিয়র ও ফার্নিশিং ইন্ডাস্ট্রি গত কয়েক বছরে দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। গ্রাহকের চাহিদা যেমন বদলেছে, তেমনি বেড়েছে পণ্যের মান, নকশা, স্থায়িত্ব ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের প্রত্যাশা। এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে সুপার ফরমিকা অ্যান্ড লেমিনেশন লিমিটেডের অন্যতম প্রধান ব্র্যান্ড সুপার বোর্ড। ১৯৯৫ সালে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঁচ শতাধিক ডিলার এবং চার হাজারের বেশি সাবডিলারের মাধ্যমে বিস্তৃত রয়েছে। পাশাপাশি প্লাইউড, এমডিএফ, মেলামাইন বোর্ড, ফরমিকা, ভিনিয়ার্ড বোর্ড, এইচপিএল ও ডোরের মতো পণ্যের মাধ্যমে তৈরি করেছে একটি বিস্তৃত প্রডাক্ট পোর্টফোলিও। সম্প্রতি সুপার বোর্ডের বর্তমান অবস্থান, উদ্ভাবন, সাসটেইনেবিলিটি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির বিজনেস ডিরেক্টর মো. সফিউল আথহার তাসলিম

বাংলাদেশের বোর্ড ও ইন্টেরিয়র ইন্ডাস্ট্রিতে সুপার বোর্ডের দীর্ঘ পথচলাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

সুপার বোর্ডের পথচলা আসলে বাংলাদেশের ইন্টেরিয়র ও ফার্নিশিং ইন্ডাস্ট্রির পরিবর্তনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৯৫ সালে আমরা যখন যাত্রা শুরু করি, তখন বাজারের চাহিদা এবং আজকের চাহিদার মধ্যে অনেক পার্থক্য ছিল। সময় বদলেছে, মানুষের জীবনযাপনের ধরন বদলেছে, আর্কিটেকচার ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনের ধারণা বদলেছে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদেরও নিজেদের পরিবর্তন করতে হয়েছে। আমরা শুধু একটি নির্দিষ্ট পণ্য তৈরি করে বাজারে দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকিনি। বরং কীভাবে আরো ভালো মানের, টেকসই ও নান্দনিক পণ্য তৈরি করা যায় সেই চিন্তা থেকেই আমাদের প্রডাক্ট পোর্টফোলিও এবং ম্যানুফ্যাকচারিং ক্যাপাবিলিটি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে। আজ আমরা এটিকে শুধু একটি ব্যবসার জার্নি হিসেবে দেখি না; এটি বাংলাদেশের একটি সামগ্রিক শিল্প খাতের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ পথচলা।

সুপার বোর্ডকে এখন শুধু একটি বোর্ড ম্যানুফ্যাকচারার নয়, বরং একটি কমপ্লিট ইন্টেরিয়র সলিউশন প্রভাইডার হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ পরিবর্তনের পেছনে মূল চিন্তাটা কী?

আমাদের কাছে ‘বোর্ড’ কখনই শুধু একটি কাঁচামাল ছিল না। একটি বোর্ড শেষ পর্যন্ত একটি ফার্নিচার, ডোর, একটি পার্টিশন কিংবা একটি সম্পূর্ণ ইন্টেরিয়র স্পেসের অংশ হয়ে ওঠে। তাই আমরা ধীরে ধীরে এমন একটি প্রডাক্ট ইকোসিস্টেম তৈরি করতে চেয়েছি, যেখানে একজন কাস্টমার তার প্রয়োজন অনুযায়ী একই ব্র্যান্ডের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সলিউশন পেতে পারেন।

প্লেইন বোর্ড থেকে মেলামাইন বোর্ড, প্লাইউড, এমডিএফ, ভিনিয়ার্ড বোর্ড, ফরমিকা ও ইবোনাইট শিটের পাশাপাশি আমাদের প্রিমিয়াম ডোর কালেকশন এবং নতুন অ্যাক্রিলিক প্লাইউড সবকিছুর পেছনেই এ চিন্তা কাজ করেছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, কাস্টমার যখন তার স্পেস তৈরি করবেন, তখন শুধু একটি প্রডাক্ট নয়, বরং একটি নির্ভরযোগ্য কমপ্লিট সলিউশন হিসেবে যেন সুপার বোর্ডকে দেখতে পারেন।

কোয়ালিটি ও সাসটেইনেবিলিটি এখন বিশ্বব্যাপী খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রে সুপার বোর্ডের অবস্থান কী?

আমরা বিশ্বাস করি, ভালো মানের পণ্য এবং পরিবেশগত দায়িত্ব (এনভায়রনমেন্টাল রেসপনসিবিলিটি) এ দুটো বিষয় আলাদা নয়; বরং একে অন্যের পরিপূরক। আমাদের উৎপাদনে ই-জিরো গ্রেড ম্যাটেরিয়ালস ব্যবহারের পাশাপাশি সোয়েলিং (পানির কারণে ফুলে যাওয়া) কম রাখা, জিরো বাবল ফিনিশিং এবং আন্তর্জাতিক টেস্টিং স্ট্যান্ডার্ডস অনুসরণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়। আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গ্রাহক যেন এমন একটি পণ্য হাতে পান, যা একই সঙ্গে শক্তিশালী, দীর্ঘস্থায়ী, নান্দনিক এবং অধিকতর পরিবেশবান্ধব। এ জায়গা থেকেই আমাদের সাসটেইনেবিলিটি জার্নি এগিয়েছে। ২০২৬ সালে কার্ব-ইপিএর (সিএআরবি-ইপিএ) জিরো এমিশন বোর্ড সার্টিফিকেশন অর্জন আমাদের সেই জার্নির খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক। প্লাইউড, পার্টিকেল বোর্ড ও এমডিএফের ক্ষেত্রে এ সার্টিফিকেশন শুধু আমাদের জন্য একটি বড় অর্জন নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক বোর্ড ইন্ডাস্ট্রির জন্যও এটি একটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে প্লাইউড, এইচপিএল ও অ্যাক্রিলিক পণ্যের ক্ষেত্রে কাস্টমারদের আগ্রহ বেশি দেখা যায়, এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

এটি খুবই ইতিবাচক একটি পরিবর্তন। গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নের ছোঁয়া এবং বিদেশী লাইফস্টাইল বা জীবনযাত্রার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার কারণে এখন আমাদের গ্রাহকদের আধুনিক নান্দনিকতার আকাঙ্ক্ষা অনেক বেড়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে এখন তারা ঘরবাড়ি তৈরিতে মানসম্মত এবং ভালো জিনিসের পেছনে খরচ করতে দ্বিধাবোধ করেন না। কাস্টমাররা এখন চান এমন পণ্য, যা ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই হবে। গ্রাহকদের এ বৈশ্বিক রুচি ও প্রিমিয়াম চাহিদার কথা মাথায় রেখেই আমরা প্লাইউড, এইচপিএল ও অ্যাক্রিলিকের মতো আধুনিক ও উচ্চমানের সলিউশন বাজারে নিয়ে আসছি।

আগামী দিনের সুপার বোর্ডকে আপনি কোথায় দেখতে চান?

বাংলাদেশের বাজারে আমরা এরই মধ্যে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছি। তবে আমাদের লক্ষ্য শুধু দেশের বাজারে বড় ব্র্যান্ড হয়ে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমরা সুপার বোর্ডকে একটি স্বনামধন্য গ্লোবাল ব্র্যান্ড বা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। আমাদের পণ্যের কোয়ালিটি, টেকনোলজি ও ইনোভেশন যেন বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে, সেই লক্ষ্যে আমরা প্রডাক্ট পোর্টফোলিও সম্প্রসারণ এবং প্রডাকশন ক্যাপাবিলিটি বাড়ানোর কাজ করছি। আমরা চাই সুপার বোর্ডের নাম নিলেই আন্তর্জাতিক বাজারে কোয়ালিটি, ইনোভেশন, সাসটেইনেবিলিটি এবং ট্রাস্ট—এ চারটি বিষয় মানুষের মনে সবার আগে ভেসে উঠুক।

একজন বিজনেস ডিরেক্টর হিসেবে এক বাক্যে সুপার বোর্ড কী?

সুপার বোর্ড শুধু বোর্ড উৎপাদন করে না, আমরা মানুষের স্বপ্ন ও প্রয়োজন অনুযায়ী আরো সুন্দর, টেকসই ও আধুনিক স্থাপত্য তৈরির বিশ্বস্ত সুযোগ গড়ে তুলি।