আধুনিক স্থাপত্যে গ্লাসের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশের নির্মাণ শিল্পে গ্লাসের চাহিদা ও ব্যবহারে কী ধরনের পরিবর্তন দেখছেন?
বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্য ও নির্মাণ শিল্পে গ্লাসের (কাচ) ব্যবহার ও চাহিদার ক্ষেত্রে গত এক দশকে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। আগে গ্লাস প্রধানত সাধারণ জানালা বা ঘরের ভেতরের আসবাবপত্রে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে এটি বহুতল ভবনের বাহ্যিক অবয়ব এবং কাঠামোগত প্রধান উপাদান হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। স্থপতি ও প্রকৌশলীরা এখন ভবনের নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব এবং নান্দনিকতার জন্য সাধারণ কাচের পরিবর্তে আধুনিক ও প্রক্রিয়াজাত গ্লাস বেশি ব্যবহার করছেন। এর মধ্যে রয়েছে: টেম্পার্ড, ল্যামিনেটেড, রিফ্লেকটিভ, ডাবল গ্লেজড এবং অটো ফ্রস্ট স্মার্ট গ্লাস।
ভবনের বিদ্যুৎ খরচ কমাতে এনার্জি-এফিশিয়েন্ট ও স্মার্ট গ্লাস বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে এর ব্যবহার কতটা বাড়ার সম্ভাবনা আছে, আর এখন প্রধান বাধা কী?
বাংলাদেশে ভবনের বিদ্যুৎ খরচ কমাতে এনার্জি-এফিশিয়েন্ট ও স্মার্ট গ্লাসের (যেমন লো-ই গ্লাস, ইনসুলেটেড গ্লাস বা ইলেকট্রোক্রোমিক গ্লাস) ব্যবহারের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল, তবে বর্তমানে উচ্চ প্রাথমিক খরচ এবং সচেতনতার অভাব এর প্রধান বাধা। এ প্রযুক্তির গ্লাস ভবনে তাপ প্রবেশ করা কমিয়ে এসির ওপর চাপ কমায় এবং সরাসরি বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে। বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব বা লিড (এলইইডি) সার্টিফায়েড বাণিজ্যিক ও শিল্প ভবনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এসব ভবনে এনার্জি-এফিশিয়েন্ট গ্লাস ব্যবহার প্রায় বাধ্যতামূলক। নাসির ফ্লোট গ্লাস স্থানীয়ভাবেই উন্নত থার্মাল এফিশিয়েন্সি এবং লো-ইমিসিভিটিযুক্ত ইনসুলেটেড গ্লাস শিগগিরই প্রস্তুত করব। ফলে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে।
সরকারিভাবে যদি গ্রিন কনস্ট্রাকশনের জন্য বিশেষ প্রণোদনা বা করছাড় দেয়া হয়, তবে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশে এই এনার্জি-এফিশিয়েন্ট গ্লাসের ব্যবহার বহু গুণ বৃদ্ধি পাবে।
দেশীয় গ্লাস শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা এখন কোন পর্যায়ে? আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছতে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?
বাংলাদেশের দেশীয় গ্লাস বা কাচ শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে চাহিদার তুলনায় অনেক উদ্বৃত্ত এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অত্যন্ত আধুনিক পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে স্থানীয় কোম্পানিগুলো দেশের শতভাগ অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও পণ্য রফতানি করছে। এর মধ্যে নাসির ফ্লোট গ্লাস বাজারের বড় একটা অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। নাসির ফ্লোট গ্লাস সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও অত্যাধুনিক ইউরোপীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাধারণ ফ্লোট গ্লাসের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে টেম্পার্ড গ্লাস, ল্যামিনেটেড গ্লাস, ডাবল গ্লেজড, আর্কিটেকচারাল কোটিং, মাল্টি-কালার ডেকোরেটিভ গ্লাস এবং অটো ফ্রস্ট স্মার্ট গ্লাস উৎপাদন করছে, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডের সমকক্ষ। দেশীয় কাচ বর্তমানে ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় রফতানি হচ্ছে।

গ্লাস শিল্প একটি অত্যন্ত উচ্চ জ্বালানি সংবেদনশীল খাত। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে টিকে থাকতে হলে কারখানায় সাশ্রয়ী মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
যেহেতু দেশীয় বাজারে চাহিদার তুলনায় সক্ষমতা অনেক বেশি, তাই এ উদ্বৃত্ত কাচ আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠাতে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ রফতানি প্রণোদনা দেয়া প্রয়োজন।
কাঁচামাল, জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে আপনারা কী কৌশল নিচ্ছেন? সরকারের কাছ থেকে কী ধরনের সহায়তা প্রত্যাশা করেন?
কাঁচামাল, জ্বালানি ও ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়ের ত্রিমুখী চাপের মাঝে বাজারে নিজেদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বেশকিছু অভ্যন্তরীণ কৌশল ও নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমরা সরকারের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিগত ও শুল্কগত সহায়তা প্রত্যাশা করছি, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করে বিভিন্ন দেশে কাচ রফতানি বাড়িয়ে উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহারের চেষ্টা করছে নাসির ফ্লোট গ্লাস। আমদানির ক্ষেত্রে কাস্টমস ডিউটি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেয়ায় স্থানীয় উৎপাদকরা চীন ও ভারত থেকে আসা সস্তা আমদানির তীব্র ও অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছেন। নাসির ফ্লোট গ্লাস এ আমদানি শুল্কের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস এবং দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় অ্যান্টি-ডাম্পিং বা প্রতিরক্ষামূলক শুল্ক আরোপের দাবি জানায়। এছাড়া কাচ শিল্পের প্রধান চালিকাশক্তি হলো গ্যাস। গ্যাসের অপর্যাপ্ত চাপ বা সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বড় ধরনের উৎপাদন বিপর্যয় ঘটে। তাই শিল্পাঞ্চলে যৌক্তিক মূল্যে ও নিরবচ্ছিন্ন চাপে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা চাই আমরা। পাশাপাশি দেশের আবাসন খাতে আধুনিক ‘বিল্ডিং কোড’ বা নির্মাণ বিধিমালা সংস্কার করে পরিবেশবান্ধব কাচ ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা বা উৎসাহ প্রদানমূলক নীতিমালার প্রত্যাশা করছি আমরা।

পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক নগরায়ণে গ্লাস শিল্পকে আপনি কী ভূমিকায় দেখতে চান? এর জন্য আগামী পাঁচ বছরে কোন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন?
পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক নগরায়ণে গ্লাস বা কাচ শিল্পকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং টেকসই সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমান যুগে নগরায়ণকে পরিবেশবান্ধব করতে উন্নত প্রযুক্তির গ্লাসের ব্যবহার দিন দিন অপরিহার্য হয়ে উঠছে। এ খাতকে পরিবেশবান্ধব ও যুগোপযোগী করতে আগামী পাঁচ বছরে নিম্নলিখিত লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন:
- জ্বালানি সাশ্রয় ও গ্রিন বিল্ডিং
- কার্বন নির্গমন হ্রাস: হালকা কিন্তু অত্যন্ত মজবুত গ্লাস স্ট্রাকচার কংক্রিট বা ইটের ব্যবহার কমিয়ে দেয়। ফলে আবাসন খাতের সামগ্রিক কার্বন ফুটপ্রিন্ট উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়
- শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ: জনবহুল আধুনিক শহরে সাউন্ডপ্রুফ বা অ্যাকোস্টিক ল্যামিনেটেড গ্লাস ব্যবহারের মাধ্যমে ঘরের ভেতরের পরিবেশ শান্ত ও বাসযোগ্য রাখা যায়
এ খাতকে পরিবেশবান্ধব ও যুগোপযোগী করতে আগামী পাঁচ বছরে নিম্নলিখিত লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন:
- আধুনিক প্রযুক্তি ও স্মার্ট গ্লাসের উৎপাদন বৃদ্ধি
- নীতিগত সহায়তা ও গ্রিন সার্টিফিকেশন
- গ্রিন বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন: আবাসন নীতিমালায় নির্দিষ্ট মাত্রার এনার্জি-সেভিং গ্লাস ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা
- ট্যাক্স রেয়াত ও প্রণোদনা: পরিবেশবান্ধব গ্লাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং যেসব ভবন নির্মাণে এ গ্লাস ব্যবহৃত হবে, তাদের জন্য বিশেষ শুল্কছাড় বা ঋণের ব্যবস্থা করা।










