রাজধানীর আবাসন সংকট সমাধানে আড়াই দশক আগে পূর্বাচলে নতুন শহর প্রকল্প হাতে নিয়েছিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। একই উদ্দেশ্যে কেরানীগঞ্জে ঝিলমিল আবাসন প্রকল্প এবং উত্তরা আবাসিক শহর তৃতীয় পর্ব প্রকল্পও নেয় সংস্থাটি। কিন্তু দীর্ঘ দুই-তিন দশক পেরিয়ে গেলেও এসব প্রকল্পে প্রত্যাশিত আবাসন গড়ে ওঠেনি। বরং প্লট বরাদ্দ ও মালিকানা বদলের মধ্য দিয়ে এসব প্রকল্প পরিণত হয়েছে জমির বড় বাজারে। কয়েক দফা হাতবদলে জমির দাম বেড়েছে কয়েক গুণ, কোথাও তা পৌঁছেছে কোটি টাকায়।

নগর পরিকল্পনাবিদদের ভাষ্যমতে, পূর্বাচলকে এখন দেশের সবচেয়ে বড় জমির বাজারগুলোর একটি বলা যায়। কম মূল্যে অধিগ্রহণ করা জমি প্লট আকারে বরাদ্দ দিয়েছে রাজউক। এরপর প্রতিবার মালিকানা বদলের সঙ্গে বেড়েছে জমির দাম। সিএজির এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের জন্য ৬ হাজার ২১৩ দশমিক ৫৫ একর জমি অধিগ্রহণে রাজউকের ব্যয় হয়েছে ৫২৪ কোটি ৭৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ একরপ্রতি গড়ে ৮ লাখ ৭৩ হাজার ৫০১ টাকা এবং কাঠাপ্রতি প্রায় ১৪ হাজার ৪৩৮ টাকা।

প্রকল্পের শুরুর দিকে বরাদ্দপ্রাপ্তদের কাছ থেকে কাঠাপ্রতি দেড় থেকে আড়াই লাখ টাকার মতো নেয়া হলেও বর্তমানে পূর্বাচলে জমির কাঠাপ্রতি গড় দাম ১ কোটি টাকার বেশি। ফলে প্লট পাওয়ার পর সেখানে বাড়ি নির্মাণের চেয়ে কিছুদিন অপেক্ষা করে বেশি দামে বিক্রি করে দেয়ার প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্রয়মূল্যের চেয়ে ১৫-২০ গুণ বেশি দামে প্লট বিক্রির নজিরও রয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা (ইউআরপি) বিভাগের অধ্যাপক ড. ইশরাত ইসলাম বলেন, ‘রাজউকের আবাসন প্রকল্পগুলো বিশেষ একটি শ্রেণীর টাকা বানানোর মেশিনে পরিণত হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘রাজউক কম মূল্যে জমি বিক্রি করেছে। পূর্বাচলে প্লট জমি বিক্রি করেছে আড়াই লাখ টাকায়। এখন এর দাম উঠেছে কোটি টাকায়। এখানে রাজউক বা যারা আদি নিবাসী তারা কেউই লাভবান হলো না। লাভবান হয়েছে তৃতীয় পক্ষ। এ তৃতীয় পক্ষের টাকার মেশিন তৈরির জন্যই কি রাজউকের এত কর্মযজ্ঞ? উচ্চবিত্তরা বাজার থেকেই উচ্চমূল্যে আবাসন কিনতে পারে। এখন রাজউকও যদি উচ্চবিত্তদের কথা ভেবে পরিকল্পনা করে তাহলে বাকিরা কোথায় যাবে?’

পূর্বাচলের মতো একই চিত্র ঝিলমিল আবাসন প্রকল্পেও। রাজধানীর বাসস্থান সংকট কমানোর লক্ষ্য নিয়ে প্রায় তিন দশক আগে কেরানীগঞ্জে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কসংলগ্ন ১৬০ একর জমিতে প্রকল্পটি হাতে নেয় রাজউক। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্প এলাকায় নির্মাণকাজই শুরু হয়নি। এরই মধ্যে প্রকল্প এলাকার বেশকিছু অংশ ময়লা-আবর্জনা ফেলার স্থান হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।

রাজউকের দাবি, ঝিলমিল প্রকল্পে প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বরাদ্দপ্রাপ্তদের দ্রুত ভবন নির্মাণ শুরু করার নির্দেশও দেয় সংস্থাটি। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চার বছরের মধ্যে বাড়ি নির্মাণ না করলে প্লটের বরাদ্দ বাতিল করা হবে। তবে বিজ্ঞপ্তির পর আট মাস পেরিয়ে গেলেও ভবন নির্মাণে উল্লেখযোগ্য সাড়া মেলেনি।

পূর্বাচল ও ঝিলমিলের প্লট মালিক এবং জমি কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন মধ্যস্থতাকারীর ভাষ্যমতে, এসব প্রকল্পে আবাসন গড়ে না ওঠার অন্যতম কারণ জমির উচ্চমূল্য। একবার হাতবদল হলেই দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফলে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার পরও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আবাসন গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে।

উত্তরা আবাসিক শহর তৃতীয় পর্বেও একই বাস্তবতা। ১৯৯৯ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্প ২০১৭ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে রাজউকের হিসাব অনুযায়ী প্রকল্পের অগ্রগতি ছিল ৮৩ শতাংশ। প্রকল্পে মোট প্লট ৮ হাজার ২৯৫টি। এর মধ্যে ৯৫ শতাংশই বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অথচ দুই যুগের বেশি সময় পরও প্রকল্প এলাকায় অধিকাংশ প্লট খালি পড়ে আছে। কোথাও কোথাও আবাসনের পরিবর্তে গড়ে উঠেছে নার্সারি। মেট্রোরেল চালুর পর অবশ্য বরাদ্দপ্রাপ্তদের মধ্যে নতুন করে জমির মূল্য বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

রাজউকের তথ্যানুযায়ী, মূল রাজধানীর যানবাহন ও জনঘনত্বের চাপ কমানো এবং আবাসনের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যেই উত্তরা তৃতীয় পর্ব প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। প্রকল্পটি ১৫-১৮ নম্বর—চারটি সেক্টরে বিভক্ত। ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। অন্য তিনটি সেক্টর আবাসিক। এসব আবাসিক সেক্টরের প্লটও একাধিকবার হাতবদল হয়েছে। ফলে কয়েক হাত ঘুরে এখনো খালি পড়ে আছে বেশির ভাগ প্লট।

এ নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউআরপি বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান জানান, রাজউকের প্লটভিত্তিক প্রকল্পগুলো আবাসন সংকট সমাধানের পরিবর্তে জমির দাম বাড়িয়ে মালিকদের বিত্তবান হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, ‘রাজউকের উচিত ছিল প্লট বিক্রি না করে ফ্ল্যাট বানিয়ে তা বিক্রি করা। তাহলে আবাসন সমস্যা সমাধানে এ প্রকল্প কিছুটা হলেও কাজে লাগত। কিন্তু রাজউক তা না করে প্লট বরাদ্দ দিচ্ছে। এখন এসব প্লটের ক্রেতারা পরিশ্রম ছাড়াই কোটিপতি বনে যাচ্ছেন। এটি সম্পূর্ণভাবে আইনের শাসন ও ন্যায্যতাবিরোধী কার্যক্রম। বিষয়টিকে এখন অনেকটা জুয়া খেলার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। কারণ লটারিতে ভাগ্যগুণে প্লট পেলেই কোটিপতি হওয়া যায়। রাজউকের কাজ মানুষকে জুয়ার পদ্ধতিতে ধনী করা নয়।’

নগর পরিকল্পনাবিদদের বক্তব্য ও প্রকল্পগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, আবাসন তৈরির বদলে প্লট বরাদ্দই রাজউকের মূল ফল হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে মধ্যবিত্তের আবাসন সংকট কমানোর কথা ছিল, সেখানে সরকারি উদ্যোগে সৃষ্ট জমির বাজারে মূল্যবৃদ্ধির সুবিধা পাচ্ছেন প্লটের মালিক ও পরবর্তী ক্রেতারা। আর আবাসন সংকট সমাধানের মূল লক্ষ্যটি থেকে যাচ্ছে অধরাই।