সেই সম্ভাবনা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজে লাগানোর লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে ‘ডুবোটেক ডিজিটাল লিমিটেড’। এটি বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আন্ডারওয়াটার রোবোটিকস স্টার্টআপ, যা পানির নিচের জগৎ অনুসন্ধান ও ব্যবহারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।
ডুবোটেকের যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। সে সময় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল উদ্যমী তরুণ পানির নিচের অজানা জগৎ অনুসন্ধানের স্বপ্ন থেকে প্রতিষ্ঠা করেন ব্র্যাকইউ ডুবুরি, দেশের প্রথম আন্ডারওয়াটার রোবোটিকস গবেষণা দল। অদম্য কৌতূহল, হাতে তৈরি প্রোটোটাইপ, একের পর এক পরীক্ষা এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেয়ার মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের সক্ষমতা তৈরি করে।
দীর্ঘ গবেষণা ও পরিশ্রমের পর দলটি জায়গা করে নেয় বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ আন্ডারওয়াটার রোবোটিকস প্রতিযোগিতা রোবোসাব, ইউএসএর বিশ্বমঞ্চে। এ প্রতিযোগিতায় ওয়ার্ল্ড রানার্সআপ অর্জনের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করে, বাংলাদেশ থেকেও বিশ্বমানের প্রযুক্তি উদ্ভাবন সম্ভব। পরবর্তী সময়ে শার্কট্যাংক বাংলাদেশে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ডুবোটেক দেখিয়েছে, দেশীয় উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ বিনিয়োগের জন্যও সম্ভাবনাময়।
গবেষণা থেকে শিল্প সমাধান—ডুবোটেকের যাত্রা মূলত সেই রূপান্তরের গল্প। গবেষণাভিত্তিক অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠানটি শুধু প্রতিযোগিতামূলক রোবট তৈরি করেনি, বরং দেশের শিল্প ও মেরিটাইম খাতের বাস্তব সমস্যার প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরিতে মনোনিবেশ করেছে।
ডুবোটেক এরই মধ্যে তৈরি করেছে উন্নতমানের আরওভি (রিমোটলি অপারেটেড ভেহিকল)। এসব রোবট ব্যবহার করা যাবে জাহাজ পরিদর্শন, বন্দর এলাকায় নিবিড় পর্যবেক্ষণ, সেতুর পাইল ও অবকাঠামো মূল্যায়ন, পাইপলাইন ও আন্ডারওয়াটার স্থাপনা পরীক্ষা, নদী ও সমুদ্র জরিপ এবং মেরিটাইম নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন কাজে।
প্রতিষ্ঠানটির তৈরি ‘ইনসপেকট্রা’ একটি বিশ্বমানের Underwater Inspection ও Data Intelligence প্লাটফর্ম, যা পানির নিচের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি DUBO OS নামে সহজে ব্যবহারযোগ্য রোবট অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করেছে ডুবোটেক, যা আন্ডারওয়াটার রোবোটিকস ব্যবহারে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
আন্ডারওয়াটার রোবোটিকস শিল্পের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ডুবোটেক। জাতিসংঘের এসডিজি ১৪: Life Below Water লক্ষ্য অর্জনে প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ডুবোটেকের সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ নয়; এটি বাংলাদেশের তরুণদের জন্য একটি অনুপ্রেরণার গল্প। বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি অর্জন, গবেষণাকে ব্যবসায়িক সমাধানে রূপ দেয়া এবং বিশ্বমানের রোবোটিকস তৈরি—সবকিছুই দেখিয়েছে, সৃজনশীলতা, অধ্যবসায় ও সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে বাংলাদেশ থেকেও বৈশ্বিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন সম্ভব।
ডুবোটেক আজ তরুণ উদ্ভাবকদের মধ্যে একটি বিশ্বাস তৈরি করেছে—‘আমরাও পারি।’
প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের প্রথম এইউভি (অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিকল) তৈরি করা। স্বয়ংক্রিয়ভাবে দীর্ঘ সময় পানির নিচে মিশন পরিচালনা, মানচিত্রায়ণ ও তথ্য সংগ্রহে সক্ষম এ প্রযুক্তি দেশের আন্ডারওয়াটার সক্ষমতাকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও সামুদ্রিক কার্যক্রমে এটি যোগ করতে পারে নতুন গতি ও দক্ষতা।
এসএমই ফাউন্ডেশন বিশ্বাস করে, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও তরুণ নেতৃত্বই ভবিষ্যতের মূল চালিকাশক্তি। ডুবোটেক সেই বিশ্বাসের একটি অনন্য উদাহরণ। গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এবং জাতীয় স্বার্থে প্রযুক্তির প্রয়োগ—সব দিক বিবেচনায় ডুবোটেক একটি সফল স্টার্টআপ হিসেবে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছে।
ডুবোটেকের এ সাফল্য বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের অগ্রযাত্রায় একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে—এমন প্রত্যাশা এসএমই ফাউন্ডেশনের।










