১৯৮২ সালে যাত্রা শুরু করা সংস্থাটি আজ ৪৪ বছরে পদার্পণ করেছে। এ দীর্ঘ পথচলা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বয়স বৃদ্ধির গল্প নয়; এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের নিরলস প্রয়াসের ইতিহাস।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে মোকাবেলা করতে হয়েছে নানা প্রতিকূলতা। দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, বেকারত্ব, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং বারবার আঘাত হানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের উন্নয়নযাত্রাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, আম্পান, ভয়াবহ বন্যা কিংবা সাম্প্রতিক করোনা মহামারীসহ প্রতিটি সংকটই মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপর্যস্ত করেছে। কিন্তু প্রতিটি দুর্যোগের পর বাংলাদেশের মানুষ যেমন ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তেমনি উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোও মানুষের পাশে থেকে পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

আরআরএফ সে দায়িত্ববোধ থেকে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশের ২৫টি জেলায় সংস্থার কার্যক্রম বিস্তৃত। প্রায় ছয় লাখ পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আরআরএফের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের উপকারভোগী। মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আয় উন্নয়ন এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে এসব উদ্যোগ।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় ক্ষুদ্রঋণ বা মাইক্রোফাইন্যান্স একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে স্বীকৃত। আরআরএফ প্রায় তিন লাখ পরিবারকে আর্থিক সেবার আওতায় এনে তাদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়নে এ কর্মসূচির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজ অসংখ্য নারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, পরিবার ও সমাজে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় হয়েছে এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ বেড়েছে।

তবে উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি শুধু আর্থিক সহায়তা নয়; প্রয়োজন দক্ষতা, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন। আরআরএফ এ বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিশু-কিশোরদের মানবিক ও নৈতিক বিকাশ এবং নেতৃত্ব উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে কৃষি উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা এবং জীবন ও জীবিকা উন্নয়নে বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে একটি জনমিতিক সুযোগের মুখোমুখি। বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কিন্তু এ সম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন। আরআরএফ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে সংস্থাটি কাজ করে যাচ্ছে। কারণ কর্মসংস্থান শুধু আয় বাড়ায় না; এটি মানুষের আত্মমর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা তৈরি করে।

আরআরএফের আরেকটি শক্তিশালী প্রয়াস হলো সামাজিক দায়বদ্ধতা। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রমের মাধ্যমে সংস্থাটি শিশুদের উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং সমাজে তাদের সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। এসব কার্যক্রম প্রমাণ করে যে উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়; বরং মানুষের জীবনকে আরো মানবিক, মর্যাদাপূর্ণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি তার মানবসম্পদ। আরআরএফের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এর নিবেদিত, দক্ষ ও উদ্যোমী কর্মীবাহিনী। দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে শহরাঞ্চল পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে কর্মরত হাজারো কর্মকর্তা-কর্মচারী মানুষের কল্যাণে প্রতিদিন কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের আন্তরিকতা, পেশাদারত্ব ও মানবিক দায়বদ্ধতা সংস্থার সাফল্যের ভিত্তি রচনা করেছে। প্রতিকূল পরিবেশ, দুর্যোগ কিংবা মহামারীর সময়ও তারা মানুষের পাশে থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা আরআরএফের মানবিক দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন।

এ দীর্ঘ অভিযাত্রার পেছনে রয়েছে দূরদর্শী নেতৃত্ব। সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ফিলিপ বিশ্বাস ও তার সহযোগী মিসেস পিংকু রীতা বিশ্বাস মানুষের উন্নয়নকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাদের নেতৃত্বে আরআরএফ একটি উন্নয়ন সংস্থা থেকে মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তাদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন আজও সংস্থার প্রতিটি কার্যক্রমে প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করছে।

৪৪ বছরের এ সুদীর্ঘ অভিযাত্রায় আরআরএফ শুধু অতীতের অর্জনকে স্মরণ করছে না; বরং ভবিষ্যতের প্রতিও নতুন অঙ্গীকার ব্যক্ত করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, কর্মসংস্থান, সামাজিক বৈষম্য এবং মানবিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আরো কার্যকর ও উদ্ভাবনী ভূমিকা রাখার প্রত্যয়ে সংস্থাটি এগিয়ে যেতে চায়।

‘তোমার প্রতিবেশীকে ভালোবাসো নিজের মতো করে’ আরআরএফের এ মূলমন্ত্রই সংস্থার ৪৪ বছরের পথচলার সারবস্তু। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সামাজিক ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা এবং অংশীদারত্বের এ দর্শনকে ধারণ করেই আরআরএফ আগামী দিনগুলোয়ও একটি উন্নত, মানবিক, টেকসই ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রেখে যাবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা, এটাই আমাদের অঙ্গীকার।