আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছি। ব্যাংকটির এসএমই ও কৃষি ব্যাংকিং বিভাগ বর্তমানে ২০ হাজারের বেশি উদ্যোক্তাকে আর্থিক সেবা দিচ্ছে। প্রায় ৭ হাজার ২৫৯ কোটি টাকার ঋণ পোর্টফোলিও নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা করছে ইউসিবি। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, এ পোর্টফোলিওর প্রায় ৮৩ শতাংশই নিজস্ব তহবিলভিত্তিক, যা ব্যাংকটির শক্তিশালী আমানত ব্যবস্থাপনা ও টেকসই অর্থায়ন সক্ষমতার প্রতিফলন।

ইউসিবির এ শক্তিশালী অর্থায়ন সক্ষমতার মূল ভিত্তি গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের আস্থা। গত সাড়ে ১৮ মাসে ব্যাংকটির মোট আমানত বেড়ে ৭২ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ আমানত এসেছে রিটেইল ও এসএমই গ্রাহকদের কাছ থেকে, যা তৃণমূল পর্যায়ে ইউসিবির প্রতি মানুষের গভীর আস্থা, ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের এক অনন্য প্রতিফলন। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত সঞ্চয়কারী—দেশজুড়ে লাখো গ্রাহক ইউসিবিকে তাদের নির্ভরযোগ্য আর্থিক অংশীদার হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মাননা পেয়েছে ইউসিবি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় বাস্তবায়িত ‘সাপোর্টিং পোস্ট কভিড-১৯ অ্যান্ড স্মল স্কেল এমপ্লয়মেন্ট ক্রিয়েশন প্রজেক্ট’-এ সফল অংশগ্রহণের মাধ্যমে ইউসিবি শতাধিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন সহায়তা প্রদান করে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অর্থনীতির এ চ্যালেঞ্জিং সময়ে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আরো কী ধরনের ভূমিকা রাখা দরকার বলে মনে করেন?

বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সময়ে এসএমই উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ানো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। শুধু ঋণ প্রদান নয়, বরং উদ্যোক্তাদের ব্যবসার প্রয়োজন ও সম্ভাবনা বুঝে উপযোগী আর্থিক সমাধান প্রদান করা জরুরি।

আমার মতে, এ সময়ে ব্যাংকগুলোকে আরো বেশি ক্যাশ-ফ্লোভিত্তিক ও তথ্যনির্ভর ঋণ মূল্যায়নের দিকে যেতে হবে, যাতে জামানতের সীমাবদ্ধতার কারণে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তারা অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত না হন। একই সঙ্গে দ্রুত ও সহজ ডিজিটাল ঋণ প্রক্রিয়া, সাপ্লাই চেইন-ভিত্তিক অর্থায়ন এবং নারী ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষায়িত পণ্য ও সেবা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।

পাশাপাশি আর্থিক সাক্ষরতা, ব্যবসা ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং বাজার সংযোগ বৃদ্ধিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ টেকসই উদ্যোক্তা গড়ে তোলা শুধু অর্থায়নের বিষয় নয়; এটি সক্ষমতা উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বেরও বিষয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের ভিত্তি হিসেবে এমএসএমই খাতকে আরো শক্তিশালী করতে ব্যাংক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার প্রতিষ্ঠানের বিশেষ কোনো অর্থায়ন বা সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে কি?

২১-৪৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী: শিক্ষিত বেকার, কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, চাকরি ছেড়ে নিজস্ব ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী ব্যক্তি কিংবা বিদেশফেরত দক্ষ জনশক্তি—যারা জীবনের প্রথম ব্যবসা শুরু করতে চান, তাদের জন্য রয়েছে বিশেষায়িত ঋণসেবা ‘ইউসিবি সূচনা’। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো ধরনের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ছাড়াই ঋণ প্রাপ্তির এমন অনন্য সুযোগ খুব কম ব্যাংকেই সহজলভ্য আছে।

এছাড়া চলমান ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য রয়েছে ‘ইউসিবি এসএমই ইনস্টলমেন্ট লোন (ইউএসআইএল)’। এ ঋণ সুবিধার আওতায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছর মেয়াদে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদান করা হয়।

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য রয়েছে পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং সেবা ‘ইউসিবি আয়মা দীপ্তি’। এর মাধ্যমে উদ্যোগী নারীরা সহজেই ঋণসহ বিভিন্ন ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন।

পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও উদীয়মান এসএমই উদ্যোক্তাদের বৈদেশিক বাণিজ্য-সংক্রান্ত সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা প্রদান করে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ইউসিবি সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। চলতি বছরে ইউসিবির এসএমই রফতানি ব্যবসায় প্রায় ৩৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যেখানে একই সময়ে দেশের সামগ্রিক রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক ৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতের জন্য পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

সাম্প্রতিক সময়ে ৬০ হাজার কোটি টাকার রিফাইন্যান্সিং ও স্টিমুলাস প্যাকেজের বিস্তৃত প্রণোদনা কর্মসূচি চালু করার সরকারি পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার অধীনে এসএমই, কৃষি ও রফতানি খাতের জন্য প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ইউসিবি এসব প্রণোদনা ঋণ বিতরণ কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সহজে, স্বল্প সুদে ও দ্রুত অর্থায়ন সুবিধা পাবেন।

পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ প্রদান ও নারী উদ্যোক্তাদের বাজার সংযোগ আরো শক্তিশালী করার জন্য প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন নন-ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদান করছে ইউসিবি। যাতে তাদের মূলধারার ব্যাংকিংয়ের আওতায় নিয়ে আসা যায়। সম্প্রতি আশুলিয়ায় ইউসিবি অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়িত এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে পরিচালিত ‘‌স্কিলস ফর ইন্ডাস্ট্রি কমপেটিটিভনেস অ্যান্ড ইনোভেশন প্রোগ্রাম (এসআইসিআইপি)’-এর আওতায় আয়োজিত এ রকম মাসব্যাপী উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্পন্ন করেছে। প্রশিক্ষণসম্পন্ন উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংক ঋণ প্রদান করা হবে।