বিশেষ করে তরুণ ও নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে এমএসএমই খাত সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। আগামী দিনের টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে এ খাতকে আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। আইপিডিসি দীর্ঘদিন ধরে উদ্যোক্তাভিত্তিক অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে এবং দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।

এসএমই খাতের জন্য আইপিডিসি কী ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে?

আইপিডিসি ফাইন্যান্সের ব্যবসায়িক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে এমএসএমই খাত। ২০২৫ সালের শেষে আমাদের মোট ঋণ পোর্টফোলিও ছিল প্রায় ৭ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা, যার ৩২ দশমিক ২৪ শতাংশ এসএমই ও উদ্যোক্তা খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। একই সময়ে আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ হাজার ৯০ কোটি টাকা এবং শেয়ারহোল্ডারস ইকুইটি ৭৩০ কোটির বেশি। আমরা শুধু অর্থায়ন প্রদান করি না, বরং উদ্যোক্তাদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে কাজ করি। ‘ফাইন্যান্স বিয়ন্ড ফাইন্যান্সিং’ ধারণার আওতায় ব্যবসা উন্নয়ন, বাজার সংযোগ, প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগও তৈরি করা হচ্ছে।

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কী ধরনের ভূমিকা রাখা উচিত?

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শুধু অর্থায়ন নয়, টেকসই ব্যবসা পরিচালনায় সহায়তা করাও জরুরি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্যোক্তাদের নগদ প্রবাহ ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল রূপান্তর, ব্যবসায়িক দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাজার সংযোগে সহযোগিতা করতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত ঋণ অনুমোদন, প্রয়োজনভিত্তিক আর্থিক পণ্য এবং ঝুঁকিনির্ভর অর্থায়ন মডেল সম্প্রসারণের মাধ্যমে এমএসএমই খাতকে আরো সহনশীল করে তোলা প্রয়োজন।

নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ কোনো কর্মসূচি রয়েছে?

নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য আমাদের অন্যতম সফল উদ্যোগ হলো ‘জয়ী’ প্লাটফর্ম, যা ২০১৮ সালে চালু হয়। বর্তমানে এটি শুধু ঋণ কর্মসূচি নয়, বরং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন প্লাটফর্মে পরিণত হয়েছে। জয়ী চারটি স্তম্ভের ওপর পরিচালিত হচ্ছে—অর্থায়ন, বাজার সংযোগ, ব্যবসায়িক সহায়তা ও সক্ষমতা উন্নয়ন। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ব্যবসা ঋণের পাশাপাশি বাজার সম্প্রসারণ, ব্যবসায়িক পরামর্শ, ডিজিটাল মার্কেটিং প্রশিক্ষণ এবং নেটওয়ার্কিং সুবিধা দেয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালে জয়ী পোর্টফোলিও ৪৪৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে এবং নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ২০০ নারী উদ্যোক্তা আর্থিক সাক্ষরতা ও সক্ষমতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। সম্প্রতি ঢাকার মিরপুরে ‘জয়ী ৩৬০’ নামে একটি বিশেষায়িত শাখা চালু করা হয়েছে। এখানে ‘জয়ী আলাপন’ নামে বিজনেস মিটিং স্পেস এবং ‘জয়ী পাঠশালা’ নামে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার ব্যবস্থা রয়েছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি এসএমই খাতের অর্থায়ন ও ব্যবসা পরিচালনায় কীভাবে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে?

ডিজিটাল প্রযুক্তি এমএসএমই খাতের প্রবৃদ্ধিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। ডিজিটাল ঋণ আবেদন, দ্রুত ক্রেডিট মূল্যায়ন, তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ, অনলাইন লেনদেন এবং ক্যাশ ফ্লো মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অর্থায়ন আরো দ্রুত ও সহজ করা সম্ভব। আইপিডিসি প্রযুক্তিনির্ভর গ্রাহকসেবা সম্প্রসারণে কাজ করছে, যাতে উদ্যোক্তারা কম সময় ও কম খরচে প্রয়োজনীয় আর্থিক সেবা পেতে পারেন। ডিজিটালাইজেশন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বাজার সম্প্রসারণ এবং উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা কর্মসূচি বাস্তবায়নে আইপিডিসির ভূমিকা কী?

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা কর্মসূচির সুবিধা প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে আমরা সক্রিয়ভাবে কাজ করছি। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং উৎপাদনমুখী খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসব সুবিধা বিতরণ করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সহায়তাকে মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা, যাতে উদ্যোক্তারা স্বল্প ব্যয়ে অর্থায়ন পেয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারেন।

এমএসএমই খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় কী ধরনের নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন?

এমএসএমই খাতের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে জামানতের অভাব, আর্থিক তথ্যের সীমাবদ্ধতা এবং বাজারে প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা। এসব সমস্যা মোকাবেলায় ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের পরিধি বাড়ানো, ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থায়ন, তথ্যভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজার সংযোগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধির উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এমএসএমই খাতকে আরো প্রতিযোগিতামূলক ও শক্তিশালী করা সম্ভব।

এমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য আইপিডিসির নতুন কী উদ্যোগ আছে?

সম্প্রতি আমরা ‘আইপিডিসি উচ্ছ্বাস কার্ড’ চালু করেছি। এটি কোনো পেমেন্ট বা ক্রেডিট কার্ড নয়; বরং উদ্যোক্তা ও গ্রাহকদের জন্য একটি বিশেষ প্রিভিলেজ প্লাটফর্ম। এর মাধ্যমে ভ্রমণ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও জীবনধারাভিত্তিক বিভিন্ন সুবিধা ও ডিসকাউন্ট পাওয়া যায়। বর্তমানে ‘জাগো’, ‘জয়ী’, ‘এলিট’ ও ‘ইনফিনিট’—এ চারটি সেগমেন্টে কার্ডটি পরিচালিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে আমরা প্রচলিত অর্থায়নের বাইরে গ্রাহকদের জন্য মূল্যসংযোজিত অভিজ্ঞতা তৈরি করছি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরবর্তী ধাপের নেতৃত্ব দেবে এমএসএমই খাত। উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি ব্যবহার ও বাজার সংযোগ—এ চারটি ক্ষেত্রকে একসঙ্গে শক্তিশালী করা গেলে দেশের টেকসই প্রবৃদ্ধি আরো গতিশীল হবে। সেই লক্ষ্যেই আইপিডিসি শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি, টানা আট বছর ‘এএএ’ ক্রেডিট রেটিং এবং উদ্ভাবনী উদ্যোক্তা উন্নয়ন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।