বর্তমানে আমাদের সিএমএসএমই বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা এবং এর আওতায় নয় হাজারেরও বেশি উদ্যোক্তা আর্থিক সেবা গ্রহণ করছেন। এ বিপুলসংখ্যক উদ্যোক্তার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, সঠিক সময়ে উপযুক্ত অর্থায়ন একটি ক্ষুদ্র উদ্যোগকেও সফল ও টেকসই ব্যবসায় রূপ দিতে পারে।

আমরা সবসময় এমন অর্থায়ন মডেল গড়ে তোলার চেষ্টা করি, যা উদ্যোক্তাদের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমরা সম্প্রতি চারটি নতুন বিনিয়োগ পণ্য চালু করেছি—তিজারা, নিসা, আল-তাওফিক ও আল-আওয়ানা। এর মধ্যে তিজারা ও নিসা জামানতবিহীন বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করে, আর আত-তাওফিক ও আল-আওয়ানা জামানতের বিপরীতে বিনিয়োগ সুবিধা দেয়। পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যাংকিং, ট্রেড ফাইন্যান্স, ক্যাশ ম্যানেজমেন্টসহ বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবাও উদ্যোক্তাদের জন্য সহজলভ্য করা হয়েছে।

অর্থনীতির এ চ্যালেঞ্জিং সময়ে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আরো কী ধরনের ভূমিকা রাখা দরকার বলে মনে করেন?

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এসএমই উদ্যোক্তারা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারের অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। এ অবস্থায় ব্যাংকের ভূমিকা শুধু অর্থায়ন প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।

আমার মতে, ব্যাংকগুলোকে উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করতে হবে। অর্থায়নের পাশাপাশি ব্যবসা ব্যবস্থাপনা, আর্থিক পরিকল্পনা, বাজার বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে নারী, তরুণ এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনভিত্তিক ও সহজলভ্য অর্থায়ন ব্যবস্থার পাশাপাশি সক্ষমতা উন্নয়ন কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে।

নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার প্রতিষ্ঠানের বিশেষ কোনো অর্থায়ন বা সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে কি?

নারী উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকি। বর্তমানে আমাদের নারী উদ্যোক্তা বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকা এবং এর আওতায় প্রায় ৯০০ জন নারী উদ্যোক্তা আর্থিক সেবা গ্রহণ করছেন। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং দেশের নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমাদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার প্রতিফলন।

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আমরা ‘নিসা’ ও ‘আল-আওয়ানা’ নামে দুটি বিশেষায়িত বিনিয়োগ পণ্য চালু করেছি। এর মধ্যে ‘নিসা’ জামানতবিহীন এবং ‘আল-আওয়ানা’ জামানতের বিপরীতে বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করে। একই সঙ্গে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্যও আমরা সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করছি, যাতে নতুন উদ্যোক্তারা ব্যবসার প্রাথমিক পর্যায়েই প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন।

আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা এসএমই খাতের অর্থায়ন এবং ব্যবসা পরিচালনায় আরো কীভাবে কাজে লাগানো যায়?

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা এসএমই খাতের জন্য একটি গেম-চেঞ্জার হিসেবে কাজ করছে। এটি একদিকে যেমন লেনদেনকে সহজ করছে, অন্যদিকে ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও গতি বাড়াচ্ছে। অনলাইন আবেদন, ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন, ই-কেওয়াইসি, ক্যাশলেস লেনদেন এবং তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকিং সেবা গ্রহণকে অনেক সহজ করেছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তির ফলে ব্যবসায়িক তথ্য সংরক্ষণ, লেনদেন ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক পরিকল্পনাও আরো কার্যকর হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে এসএমই খাতের জন্য অর্থায়ন আরো দ্রুত, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনামূলক কর্মসূচিগুলো সিএমএসএমই খাতের বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় আমাদের পুনঃঅর্থায়নভিত্তিক বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। এর মাধ্যমে অসংখ্য ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক শর্তে অর্থায়নের সুযোগ পেয়েছেন। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং অপেক্ষাকৃত অনুন্নত অঞ্চলের উদ্যোক্তাদের এসব সুবিধার আওতায় আনতে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি।

এমএসএমই খাতের বড় চ্যালেঞ্জগুলো যেমন জামানত সংকট, উচ্চ অর্থায়ন ব্যয় বা বাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা মোকাবেলায় কী ধরনের নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

বাংলাদেশের এমএসএমই খাতের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো জামানত সংকট, অর্থায়ন প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা, বাজারে প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের পরিধি বৃদ্ধি, বিকল্প ঝুঁকি মূল্যায়ন পদ্ধতির উন্নয়ন এবং তথ্যভিত্তিক উদ্যোক্তা মূল্যায়ন ব্যবস্থা আরো সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বাজার সংযোগ বৃদ্ধি, ই-কমার্স প্লাটফর্মে অংশগ্রহণ, সরবরাহ শৃঙ্খলে অন্তর্ভুক্তি এবং পণ্যের মানোন্নয়নে সহায়তা জোরদার করতে হবে।

আমার বিশ্বাস, সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই একটি শক্তিশালী, প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই এমএসএমই ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এমএসএমই খাত যত শক্তিশালী হবে, বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও তত বেশি সুদৃঢ় হবে।