এটা সত্য যে সাম্প্রতিক সময়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নানা পরিস্থিতি এ খাতেও কিছুটা ধাক্কা লেগেছে। তবে আমাদের একটা বড় ইতিবাচক দিক হলো এ দেশের প্রায় ১৮ কোটি ভোক্তা রয়েছে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক মার্কেট বা বড় বাজার নিয়ে কাজ করলেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা স্থানীয় চাহিদা মেটাতে কাজ করেন। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের ব্যবসার চাহিদা সবসময়ই থাকে।
আবার আর্থিক দিক থেকে বিবেচনা করলেও সিএমএসএমই খাতের পারফর্ম্যান্স সুবিধাজনক। বর্তমানে ব্যাংক খাতে যে প্রায় ৩২ শতাংশ খেলাপি ঋণ রয়েছে, তার সিংহভাগই করপোরেট খাতের। সিএমএসএমই খাতে রাজনৈতিক প্রভাব কম থাকায় এ ঋণগুলো সময়মতো পরিশোধিত হয়। বর্তমান সরকার যদি সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন ও নীতিগত সহায়তা দিয়ে ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রডাক্টের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নে এগিয়ে আসে, তাহলে এ খাত দেশের অর্থনীতিতে আরো বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে।
এসএমই খাতে পূবালী ব্যাংকের পোর্টফোলিওর আকার কেমন?
বর্তমানে আমাদের অর্থায়ানের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি এসএমই খাতে। তবে লক্ষ্য আছে, এটিকে ৩৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। মুশকিল হলো বর্তমানে দেশের সামগ্রিক ঋণ প্রবৃদ্ধি খুবই দুর্বল। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সবাই ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ নীতিতে আছে। বেসরকারি প্রবৃদ্ধি বাড়তে একটু সময় লাগতে পারে। তখন এসএমইতেও ঋণ বাড়বে। তবে আমরা প্রতি বছরই এসএমই খাতে আমাদের প্রবৃদ্ধি বাড়াচ্ছি।
সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সরাসরি ব্যাংক থেকে ঋণ পান না। এ সমস্যা দূরীকরণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে?
সিএমএসএমই খাতে ঋণ না পাওয়ার মূল কারণটি শুধু ব্যাংকগুলোর অনীহা নয়, বরং কিছু কাঠামোগত ও পদ্ধতিগত জটিলতা। আমরা সবসময়ই চাই সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করতে, কারণ এটি আমাদেরও ব্যবসার অংশ। কিন্তু ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে আমাদের আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার দিকেও নজর রাখতে হয়। উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ আসলে আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে থাকে। তাদের ব্যবসার হিসাব-কিতাব ঠিকঠাকমতো থাকে না। এর ফলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের ঋণ দিতে পারে না। কারণ ব্যাংকে তো তাদের লেনদেন পরিস্থিতি বুঝে ঋণ দিতে হবে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে হয়তো এ সমস্যা কিছুটা কমে আসবে। আর্থিক ব্যবস্থায় যদি নগদ প্রবাহ কমে আসে, তখন তাদের লেনদেনের চিহ্ন থাকবে। তাদের যথাযথ ডকুমেন্ট থাকলে ব্যাংকগুলোর পক্ষেও ঋণ দেয়া সহজ হবে।
দেশে চেইন শপের বিস্তার ঘটছে। এটি কী খুচরা বিক্রেতাদের জন্য কোনো হুমকি তৈরি করছে?
এখানে কাস্টমার সেগমেন্টেশনটা বুঝতে হবে। চেইন শপগুলো সাধারণত উচ্চ-মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে। আর পাড়া-মহল্লার দোকানগুলো মূলত নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের চাহিদা মেটায়। কিন্তু চেইন শপগুলো যদি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের সেগমেন্টে কাজ শুরু করে, তবে তা অবশ্যই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য হুমকি হবে। কারণ বড় কোম্পানিগুলোর নিজস্ব ব্র্যান্ড ভ্যালু ও আর্থিক সক্ষমতা আছে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রত্যন্ত এলাকার দোকানি ব্যবসায় টিকে থাকতে পারবে না।
একই সঙ্গে আমাদের পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ করতে হবে। যেমন আলুকে শুধু আলু হিসেবে না বেচে চিপস বানিয়ে বিক্রি করা, কিংবা ডমেস্টিক ও হাইজিনিক ফুড সাপ্লাই চেইন তৈরি করা গেলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পরিসর আরো বাড়বে। আজ যারা বড় করপোরেট, তারা প্রত্যেকেই একসময় ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে শুরু করেছিলেন। সঠিক গাইডলাইন, প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারলে আমাদের সিএমএসএমই খাতই দেশের অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
এ পরিস্থিতিতে সরকার বা নীতিনির্ধারকদের কী ধরনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেয়া উচিত?
বাংলাদেশ ব্যাংক, এসএমই ফাউন্ডেশনসহ আমরা সবাই এসএমই নিয়ে কাজ করছি। ক্লাস্টারিং সুবিধাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে আমি মনে করি আরো বড় কিছু করা দরকার। আমাদের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের তৈরি পণ্যই কিন্তু বড় করপোরেটরা কিনে নিয়ে নিজেদের ব্র্যান্ডের লোগো বসিয়ে বেশি দামে বিক্রি করছে। চীনে আলিবাবা রয়েছে। আমাদের দেশেও যদি সিএমএসএমইদের জন্য এমন একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল এক্সপোর্ট প্লাটফর্ম থাকত, তবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সরাসরি বিদেশে পণ্য পাঠাতে পারত। এটি কোনো স্টার্টআপ বা বেসরকারি খাতের উদ্যোগেও হতে পারে।
দেশে পাট এবং চামড়ার মতো প্রচুর নিজস্ব কাঁচামাল রয়েছে। চামড়ার দাম দিন দিন কমছে, অথচ জুতা বা ব্যাগের দাম বাড়ছে। আমরা কাঁচামাল কম দামে এক্সপোর্ট করছি, আবার তৈরি পণ্য বেশি দামে কিনছি। দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। আমরা যদি টেকনোলজি, মার্কেটিং সাপোর্ট, ব্র্যান্ডিং এবং কোয়ালিটি কন্ট্রোলের মাধ্যমে এ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্ত করতে পারি, তাহলে অনেক বেশিসংখ্যক এসএমইকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। শুধু স্থানীয় বাজার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে এত বিশাল খাতকে টেকসই করা যাবে না।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে উচ্চসূদহারসহ নানা জটিলতায় পড়েন। এক্ষেত্রে কী করা যায়?
বড় হোক বা ছোট, যেকোনো বিনিয়োগের জন্য সবাই ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে পরদিন থেকেই সুদ শুরু হয়, যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বোঝা তৈরি করে। এর বিকল্প হিসেবে আমাদের বন্ড মার্কেট, ইকুইটি মার্কেট বা স্টক এক্সচেঞ্জকে কাজে লাগাতে হবে।
যদি স্টার্টআপ বা ক্ষুদ্র উদ্যোগে ইকুইটি ফাইন্যান্সিং বা অংশীদারত্বের মাধ্যমে তহবিল দেয়া যায়, তবে উদ্যোক্তাকে সঙ্গে সঙ্গে সুদের চিন্তা করতে হবে না। চীন তাদের এসএমই খাতকে বন্ড ও শেয়ার মার্কেটে নিয়ে আসতে পারলে আমরা কেন পারব না? আমাদের দেশে অনেক দক্ষ লোক আছে। তাদের জন্য যদি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বা ইকুইটি পার্টনারের ব্যবস্থা করা যায়, তবে তারা বড় করপোরেটের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে স্বাধীনভাবে ব্যবসা বাড়াতে পারবে।










