বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতি, স্থানীয় উৎপাদন, নারী অংশগ্রহণ এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে এমএসএমই খাতের ভূমিকা অনন্য। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বড় শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাই অর্থনীতিকে গতিশীল রাখছেন। তারা স্থানীয় চাহিদা পূরণ করছে এবং তাদের উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে বড় ধরনের সহযোগিতা করছে। আমি মনে করি, এমএসএমই খাত তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনার বড় ক্ষেত্র।
এসএমই খাতের জন্য এসবিএসি ব্যাংক কী করছে?
এসবিএসি ব্যাংক পিএলসি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কৃষি, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। আমরা বিশ্বাস করি, দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে এসএমই খাতকে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। এ কারণেই ব্যাংকটির মোট ঋণ পোর্টফোলিওতে এসএমই অর্থায়নের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি এবং ভবিষ্যতে এটিকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের শাখা ও উপশাখা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দ্রুত ও সহজ শর্তে এসএমই ঋণ প্রদান করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন বিবেচনায় আমরা কর্মপরিধি, ব্যবসার ধরন এবং নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণ করে অর্থায়নের ব্যবস্থা করছি। পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক শিল্প, উৎপাদনমুখী উদ্যোগ, নারী উদ্যোক্তা এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও নীতিমালা অনুসরণ করে একটি দায়িত্বশীল ও গ্রাহকবান্ধব এসএমই ব্যাংকিং পরিবেশ গড়ে তোলার কাজ করছি।
অর্থনীতির এ চ্যালেঞ্জিং সময়ে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আরো কী ধরনের ভূমিকা রাখা দরকার বলে মনে করেন?
বর্তমানে অর্থনীতিতে নানামুখী চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ পরিচালন ব্যয় এবং বাজারের অনিশ্চয়তা এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি ঋণের সুদহার তুলনামূলক বেশি থাকায় উদ্যোক্তাদের মাঝে অসন্তোষ দেখা যায়। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা কেবল ঋণদাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, বরং উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে। ব্যাংকগুলো গ্রাহকভেদে সুদহার নির্ধারণে কিছু ছাড় দিতে পারে। এজন্য উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনভিত্তিক ও নমনীয় অর্থায়ন কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃত ব্যবসার সক্ষমতা মূল্যায়নের মাধ্যমে দ্রুত ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি আর্থিক স্বাক্ষরতা, ব্যবসা পরিকল্পনা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত।
নারী উদ্যোক্তা ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার ব্যাংকের বিশেষ কোনো অর্থায়ন বা সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে কি?
অবশ্যই। এসবিএসি ব্যাংক নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুসরণ করে আমরা নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, বিশেষ কাউন্সেলিং এবং দ্রুত ঋণ প্রক্রিয়াকরণের সুবিধা দিচ্ছি। একই সঙ্গে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র ব্যবসা অর্থায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিকল্পনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবহারে পরামর্শ প্রদান করা হয়। আমরা বিশ্বাস করি, নারী ও তরুণদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরো বেশি সম্পৃক্ত করা গেলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরো ত্বরান্বিত হবে।
আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা এসএমই খাতের অর্থায়ন ও ব্যবসা পরিচালনায় আরো কীভাবে কাজে লাগানো যায়?
ডিজিটাল প্রযুক্তি এসএমই খাতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। বর্তমানে অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ ‘বাংলা পে’, ডিজিটাল পেমেন্ট, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট সেবার মাধ্যমে উদ্যোক্তারা দ্রুত ও নিরাপদ আর্থিক লেনদেন করতে পারছেন। প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো আরো দ্রুত ঋণ মূল্যায়ন ও অনুমোদন দিতে পারে। একই সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ে সহায়তা করে। ভবিষ্যতে ই-কমার্স, সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স এবং ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোরিংয়ের ব্যবহার বাড়লে এসএমই অর্থায়ন আরো সহজ ও স্বচ্ছ হবে বলে আমি মনে করি। এ লক্ষ্যে আমরা সম্প্রতি তথ্য-উপাত্তভিত্তিক টেকসই কৃষি অর্থায়ন কর্মসূচি পরিচালনা প্রতিষ্ঠান ‘অঙ্কুর’-এর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি।
বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতের জন্য পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসূচি এসএমই খাতের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ। এ অর্থায়নের মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে স্বল্পসুদে ঋণ দেয়া যায়। এসবিএসি ব্যাংক এ সুবিধাগুলো মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। আমরা শাখা পর্যায়ে উদ্যোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি, যোগ্য গ্রাহক নির্বাচন এবং দ্রুত ঋণ বিতরণে গুরুত্ব দিচ্ছি। নারী উদ্যোক্তা, উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠান এবং গ্রামীণ ব্যবসাগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, নিয়মিত মনিটরিং ও রিপোর্টিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন ব্যয় কমানো এবং উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে কার্যকর অবদান রাখা।
এমএসএমই খাতের বড় চ্যালেঞ্জগুলো—যেমন জামানত সংকট, উচ্চ অর্থায়ন ব্যয় বা বাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা মোকাবেলায় কী ধরনের নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
এমএসএমই খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হলো পর্যাপ্ত জামানতের অভাব, উচ্চ অর্থায়ন ব্যয় এবং বাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম আরো সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন, যাতে জামানতবিহীন বা সীমিত জামানতে অর্থায়ন সহজ হয়। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্প ব্যয়ী তহবিলের প্রাপ্যতা বাড়াতে হবে। উদ্যোক্তাদের জন্য বাজারসংযোগ, ই-কমার্স প্লাটফর্ম এবং রফতানি সহায়তা জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে ব্যবসা নিবন্ধন, কর ব্যবস্থা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া আরো সহজ করা প্রয়োজন। সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সমন্বিত উদ্যোগই এমএসএমই খাতকে আরো প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই করে তুলতে পারে।










