ফার্মাসি বিষয়ে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে একটি স্বনামধন্য ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শুরু করেন ওয়াহিদুজ্জামান। ওষুধের উপাদান, কেমিক্যাল ও সেগুলোর প্রভাব সম্পর্কে তার জ্ঞান যত বাড়তে থাকে, ততই বাজারে ব্যবহৃত প্রসাধনীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। ঠিক তখনই এক বন্ধুর দেয়া একটি উপহার তার চিন্তার জগতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।

উপহারটি ছিল একটি অর্গানিক, হ্যান্ডমেড ও রাসায়নিকমুক্ত সাবান। অনলাইনে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, এটি ছিল ২৭ পাউন্ড মূল্যের একটি প্রিমিয়াম পণ্য। তখনই তার মনে প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশে কি এমন নিরাপদ ও সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক প্রসাধনী তৈরি করা সম্ভব নয়?

এ ভাবনা থেকেই ২০১৫ সালে শুরু হয় ‘রিবানা’র যাত্রা।

তবে নতুন উদ্যোগ শুরু করা সহজ ছিল না। শুরুতে পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকেও তেমন সমর্থন পাননি তিনি। অর্থের সংকট ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কয়েকজন বন্ধুর কাছ থেকে অর্থ ধার নিয়ে এবং নিজ গ্রামের প্রাকৃতিক উৎস থেকে মানসম্মত কাঁচামাল সংগ্রহ করে শুরু করেন উৎপাদন। নারকেল, নিম, তিল, ভেন্না, ছাগলের দুধ, গোলাপ, হলুদ, মসুর ডালসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান প্রক্রিয়াজাত করে হাতে তৈরি পণ্য উৎপাদন শুরু করেন।

বর্তমানে ‘রিবানা’ বাংলাদেশের হাতে তৈরি অর্গানিক সাবান উৎপাদনের অন্যতম পরিচিত ব্র্যান্ড। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৯৫ শতাংশ কাঁচামাল আসে গ্রামীণ প্রাকৃতিক উৎস থেকে। ত্বকের ধরন অনুযায়ী আলাদা ফর্মুলেশনে তৈরি প্রতিটি পণ্য কঠোর মাননিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে বাজারজাত করা হয়।

রিবানার হাতে তৈরি সাবান ২১ দিন ধরে কিউরিং করা হয়। এরপর ল্যাব-স্ট্যান্ডার্ড পিএইচ টেস্ট ও অন্যান্য মাননিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তা বাজারজাত করা হয়। তেলের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত বীজ ঘানিতে ভেঙে কোল্ড প্রেসিং প্রক্রিয়ায় উৎপাদন করা হয় এবং ল্যাব পরীক্ষার পর বাজারে ছাড়া হয়। ফেসপ্যাকসহ অন্যান্য পণ্যের উপাদান গ্রামের নারীরা রোদে শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করেন। এতে একদিকে পণ্যের মান নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে শ্রমঘন কর্মসংস্থান।

রিবানার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শতাধিক ছাগল খামারি, নিম, ভেন্না ও বাদাম চাষী এবং প্রায় অর্ধশত গ্রামীণ নারী। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শতাধিক মানুষ এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। কাঁচামাল সরবরাহের মাধ্যমে কৃষক ও নারীরা পাচ্ছেন ন্যায্যমূল্য, তৈরি হয়েছে পরিবারের স্থায়ী আয়ের সুযোগ। উদ্যোক্তার এ সামাজিক উদ্যোগ ২০১৯ সালে UNDP Youth Co:Lab-এ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও লাভ করে।

শুরুর দিকে বাজারে ব্র্যান্ড পরিচিতি তৈরি করাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন ধরনের পণ্যের প্রতি গ্রাহকের আস্থা তৈরি করতে নিজেই ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন ওয়াহিদুজ্জামান। পরবর্তীতে কৌশলগত ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে রিবানার পরিচিতি বাড়তে থাকে।

ব্যবসার শুরুতে লাইসেন্স, বিএসটিআই সার্টিফিকেশন, সরকারি অনুমোদনসহ নানা প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। তবে এসএমই ফাউন্ডেশন, বিএসটিআই ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার সহযোগিতায় একে একে এসব বাধা অতিক্রম করেন।

বর্তমানে রিবানার পণ্য দেশের বিভিন্ন সুপরিচিত খুচরা চেইন স্টোরে পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি দারাজ, সাজগোজ, রকমারিসহ বিভিন্ন ই-কমার্স প্লাটফর্মেও রয়েছে এর উপস্থিতি। ২০২১ সাল থেকে রিবানার পণ্য অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অ্যামাজনের মাধ্যমে রফতানি হচ্ছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রথম বিক্রয় কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে রিবানা। জাতীয় এসএমই পণ্য মেলা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ও অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ বিজনেস এক্সপোতে অংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান আরো শক্ত করেছে।

আজ রিবানা শুধু একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে পরিবর্তনের একটি উদাহরণ। নারীদের স্বাবলম্বী করা, কৃষকদের আয় বাড়ানো এবং নতুন উদ্যোক্তাদের অনুপ্রাণিত করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছে আলাদা পরিচিতি।

একটি ছোট উপহার হিসেবে পাওয়া একটি সাবান থেকেই শুরু হয়েছিল যে ভাবনা, সেটিই আজ রূপ নিয়েছে বাংলাদেশের অর্গানিক কসমেটিকস খাতের একটি সম্ভাবনাময় ব্র্যান্ডে।