নারী উদ্যোক্তা ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার প্রতিষ্ঠানের বিশেষ কোনো অর্থায়ন বা সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে কি?

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ফিনিক্স ফাইন্যান্সসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ ঋণ সুবিধা ও কর্মসূচি পরিচালনা করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন—বাংলাদেশ ব্যাংকের রি-ফাইন্যান্সিং স্কিমের আওতায় নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণ দেয়া হয়। এছাড়া ব্যবসার ক্যাশ ফ্লো এবং ব্যক্তিগত গ্যারান্টির বিপরীতে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন (ক্যালাটারাল-ফ্রি) ঋণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তরুণ ও স্টার্ট-আপ অর্থায়ন—নতুন তরুণ উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনায় জামানতের বিকল্প হিসেবে নিশ্চিত কার্যাদেশের বিপরীতে ‘কার্যাদেশ অর্থায়ন’ (ওয়ার্ক অর্ডার ফাইন্যান্সিং) দেয়া হয়। পাশাপাশি নতুন উৎপাদনমুখী ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট বা বাণিজ্যিক গাড়ি ক্রয়ে দীর্ঘমেয়াদি লিজ ফাইন্যান্সিং সুবিধা দেয়া হয়। সক্ষমতা উন্নয়ন—উদ্যোক্তাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা বা ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি (যেমন হিসাবরক্ষণ, ক্যাশ ফ্লো এবং ভ্যাট-ট্যাক্সের নিয়ম) বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন মেলার মাধ্যমে পণ্য প্রদর্শনী ও নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ করে দেয়া হয়। একজন নারী বা তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে এ সুবিধাগুলো পেতে আপনার ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং বিজনেস প্ল্যানসহ ফিনিক্স ফাইন্যান্সের ঢাকার দিলকুশায় ‘এসএমই ব্রাঞ্চ’ অথবা নিকটস্থ শাখায় সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতের জন্য পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বাস্তবায়নে ফিনিক্স ফাইন্যান্স বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। যেমন অংশগ্রহণ চুক্তি (পার্টিসিপেশন এগ্রিমেন্ট)—কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো তহবিল ঘোষণা করলে যোগ্যতা অনুযায়ী প্রথমেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। এর মাধ্যমে কম সুদের তহবিল সংগ্রহ ও গ্রাহক পর্যায়ে তা বিতরণ করা সম্ভব হয়।

বিশেষায়িত ডেস্ক ও দক্ষ জনবল—ঢাকার দিলকুশায় ‘এসএমই ব্রাঞ্চ’সহ বড় শাখাগুলোতে ‘এসএমই ও উইমেন অন্ট্রাপ্রেনিউর ডেস্ক’ চালু আছে। ব্রাঞ্চগুলোতে শর্তাবলি বোঝানো ও দ্রুত লোন প্রসেস করার জন্য ডেডিকেটেড রিলেশনশিপ ম্যানেজাররা কাজ করেন।

টার্গেটেড ডিসবার্সমেন্ট (অগ্রাধিকার প্রদান)—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে তহবিলের একটি নির্দিষ্ট অংশ (১০ থেকে ১৫ শতাংশ) বাধ্যতামূলকভাবে নারী উদ্যোক্তা এবং একটি বড় অংশ কুটির ও ক্ষুদ্র (মাইক্রো স্মল) উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণে অগ্রাধিকার দেয়া হয়।

ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম (সিজিএস)—যেসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার স্থাবর বন্ধক বা জামানত নেই, তাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের সিজিএস সুবিধার আওতায় এনে জামানতবিহীন ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হয়। কঠোর মনিটরিং ও কমপ্লায়েন্স—ঋণের অর্থ যাতে অনুৎপাদনশীল খাতে অপব্যবহার না হয়, সেজন্য নিয়মিত ফিল্ড ভিজিট ও অডিট করা হয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রতিবেদন পাঠানো হয়।

এমএসএমই খাতের বড় চ্যালেঞ্জগুলো—যেমন জামানত সংকট, উচ্চ অর্থায়ন ব্যয় বা বাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা—মোকাবেলায় কী ধরনের নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

বাংলাদেশের এমএসএমই খাতকে অর্থনীতির প্রকৃত ‘প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন’ করতে জামানত সংকট, উচ্চ অর্থায়ন ব্যয় ও বাজারজাতের মতো কাঠামোগত সমস্যা সমাধানে কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন :

প্রথমত, জামানত সংকট মোকাবেলা—ভ্যাট রিটার্ন, ইউটিলিটি বিল ও এমএফএস লেনদেনের ডেটা নিয়ে একটি ‘জাতীয় ডিজিটাল ক্রেডিট রেজিস্ট্রি’ গঠন করে এআই-চালিত বিকল্প ক্রেডিট স্কোরিংকে আইনি স্বীকৃতি দেয়া দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমকে (সিজিএস) আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত ও ‘অটোমেটেড ওয়ান-স্টপ’ করা এবং যন্ত্রপাতি বা ইনভেন্টরির মতো অস্থাবর সম্পত্তি বন্ধক আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, অর্থায়ন ব্যয় হ্রাস—বড় করপোরেট ও এসএমই ঋণের সুদের হারের ব্যবধান কমাতে সুনির্দিষ্ট স্প্রেড নীতি নির্ধারণ করা দরকার। কাগজবিহীন ডিজিটাল লোনের জন্য ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ সাবসিডি বা প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। এছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য তহবিল বিতরণে বাণিজ্যিক ব্যাংকের পাশাপাশি এনবিএফআই ও এমএফআইকে যুক্ত করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, বাজারের সীমাবদ্ধতা দূরীকরণ—সরকারি কেনাকাটায় ন্যূনতম ২০ শতাংশ স্থানীয় নিবন্ধিত এসএমই থেকে নেয়া বাধ্যতামূলক করতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) সংশোধন করা উচিত। মধ্যস্বত্বভোগী কমাতে সরকারি উদ্যোগে জাতীয় বিটুবি ও বিটুসি ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস তৈরি এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং বা হস্তশিল্পের মতো খাতের জন্য বিশেষ ‘এসএমই ক্লাস্টার’ ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা দরকার।

চতুর্থত, ব্যবসার সহজীকরণ ও কর রেয়াত—ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট ও পরিবেশ ছাড়পত্রসহ সব সেবাকে এক করে সিএমএসএমই খাতের জন্য তিন বছর মেয়াদি অনলাইন ‘স্মার্ট লাইসেন্স’ চালু করা উচিত। পাশাপাশি নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য প্রথম তিন বছর শতভাগ আয়কর ও ভ্যাট ছাড় (ট্যাক্স হলিডে) দেয়া প্রয়োজন।

মূলকথা হলো পলিসি বা নীতি কাগজে-কলমে যতই চমৎকার হোক না কেন, তার সুফল তখনই মিলবে যখন এর যথাযথ বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিতা থাকবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এসএমই কোটা পূরণ করছে কিনা, তা কঠোরভাবে মনিটর করা এবং নীতি প্রণয়নে খোদ এসএমই অ্যাসোসিয়েশন বা তৃণমূলের উদ্যোক্তাদের প্রতিনিধিদের মতামত নেয়া এখন সময়ের দাবি।