তবু ফুলচাষীদের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। দিগন্তবিস্তৃত মাঠে রয়েছে গোলাপ, গাঁদা, জারবেরা, চন্দ্রমল্লিকাসহ কত বাহারি ফুলের সমাহার। তবু মৌসুম শেষে লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে ফুলচাষীদের। ক্রমাগত বাড়তে থাকা রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের দাম, অতিরিক্ত পানি ব্যবহার ও সেচের খরচ, জমিতে জমে থাকা আগাছা আর ফুল সংগ্রহের পর গাছের অবশিষ্টাংশ—সব মিলিয়ে অন্য সব ফুলচাষীর মতোই রেশমা খাতুনের (৩০) চোখে প্রতিনিয়ত নেমে আসত অনিশ্চয়তার ছায়া।

রেশমার কণ্ঠে আক্ষেপটা রয়ে গেছে, ‘বাপ-দাদার হাত ধরে শেখা পদ্ধতিতে ফুল চাষ করলেও লাভের টাকা ঘরে তোলা কঠিন ছিল।’ প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষ করতে গিয়ে ক্রমাগত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা শুধু খরচই বাড়ায়নি, নষ্ট করছিল রেশমার জমির মাটির গুণাগুণও। পোকামাকড় দমনে অতিরিক্ত ওষুধ ব্যবহারে ফুলের মান কমছিল। অনেক সময় ফুল বাজারে সঠিক দামও পেত না। পানির অপচয় ছিল আরেকটি বড় সমস্যা। অতিরিক্ত সেচে যেমন বিদ্যুৎ বিল বাড়ছিল, তেমনি চাপ বাড়ছিল ভূগর্ভস্থ পানির ওপর।

লোকসানের মাত্রা বাড়তে থাকায় দুই বিঘা জমিতে ফুল চাষ চালিয়ে যাওয়া রেশমার জন্য হয়ে উঠেছিল এক অসম লড়াই।

এ সংকটের মাঝেই আশার আলো হয়ে দেখা দেয় পিকেএসএফের এসএমএআরটি প্রকল্প। একবুক আশা নিয়ে পিকেএসএফের সহযোগী সংস্থা রুরাল রিকনস্ট্রাকশন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হন রেশমা। শুরুতে কিছুটা সংশয় থাকলেও প্রশিক্ষণ নিয়ে বদলে যেতে থাকে তার প্রচলিত ধ্যানধারণা। প্রকল্পের উদ্যোগে রেশমা প্রথম জানতে পারেন পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি (আরইসিপি) সম্পর্কে। প্রশিক্ষণ আর পরিবেশবান্ধব চাষ পদ্ধতির মাধ্যমে কম খরচে, অপচয় কমিয়ে এবং পরিবেশের ক্ষতি না করে আধুনিক পদ্ধতিতে ফুল চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি জানতে পারেন। প্রকল্পের আওতায় ৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শুরু হয় তার পরিবেশবান্ধব ফুল চাষের যাত্রা।

রেশমা নতুন উদ্যমে শুরু করেন জৈব সার ও জৈব কীটনাশক ব্যবহার। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে তার ও শ্রমিকদের যে স্বাস্থ্যগত ক্ষতি হতো, তারও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়। পাশাপাশি পোকামাকড় দমনে রাসায়নিক স্প্রে নয়, বরং ব্যবহার করা শুরু করেন রঙিন ফাঁদ আর ফেরোমন ট্যাপ। এতে খরচ কমে, ফুলের মান ভালো হয় এবং ফুল বেশি দিন সতেজও থাকে। এছাড়া আগের ‘বন্যা সেচ’ পদ্ধতি পরিহার করে তিনি হোস পাইপ ব্যবহারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে ফুলের জমিতে সেচ দিতে থাকেন। এতে পানির অপচয় কমার পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিলও কম আসে তার, কমে যায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা।

ফুল সংগ্রহের পর যে বর্জ্য আগে জমিতে জমে থাকত, সেটাই এখন প্রকল্পের পরামর্শে হয়ে উঠেছে এক নতুন শক্তি। ফুলের অবশিষ্টাংশ ও জৈব বর্জ্য থেকে তিনি এখন তৈরি করছেন জৈব সার। রেশমা বলেন, ‘আগে যেটা ফেলে দিতাম, এখন সেটাই আমার জমির খাবার। এ জৈব সার এখন মাটির পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে।’

এ পরিবর্তনের ফল তিনি নিজ চোখেই প্রত্যক্ষ করেন। একসময় যেখানে তার মৌসুমি আয় ছিল প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, সেখানে এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকায়। মাত্র এক বছরে রেশমার দুই বিঘা জমিতে আয় বেড়েছে ৫০ হাজার টাকা।

খামার যান্ত্রিকীকরণ ও আধুনিকায়নের জন্য রেশমা ক্রয় করেন একটি মিনি পাওয়ার টিলার। এতে শ্রমিকনির্ভরতা কমার সঙ্গে সঙ্গে কাজের গতিও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। হাস্যোজ্জ্বল মুখে রেশমা বলেন, ‘চাষাবাদ ও নিড়ানির জন্য আগে আমার বেশি শ্রমিক লাগত। এখন একজন শ্রমিকের দ্বারাই যন্ত্রের মাধ্যমে চাষ ও নিড়ানির কাজ সম্ভব হচ্ছে।’

আজ হাড়িয়া গ্রামের সেই ফুলের মাঠ আর শুধু দুশ্চিন্তার ছবি নয়। সেখানে আছে পরিবর্তনের চিহ্ন। রেশমা নিজেই এখন অন্যদের শেখান পরিবেশবান্ধব ফুল চাষ পদ্ধতির বিষয়ে। তিনি পরিবেশ ক্লাবের সভায় যুক্ত করছেন আশপাশের মানুষদের। তার দেখানো পথ ধরে অন্য ফুলচাষীরাও নতুন করে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করেছেন।

অতীতের লোকসান কাটিয়ে রেশমা আজ একজন সফল ফুলচাষী। তিনি প্রমাণ করেছেন সঠিক পরামর্শ, জ্ঞান, প্রশিক্ষণ, সময়োপযোগী সহায়তা আর পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে একজন নারীর জীবন, একটি মাঠ, এমনকি একটি গ্রামের ভবিষ্যৎও।

বিকালের নরম আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে ফুলের খেতে। বাতাসে দুলছে সারি সারি গাঁদা আর জারবেরা ফুল। রেশমা খাতুন দাঁড়িয়ে আছেন ফুলখেতের মাঝে। চোখে তার ক্লান্তি নেই, আছে দূরের দিকে তাকিয়ে থাকা এক গভীর প্রত্যাশা। তিনি স্বপ্ন দেখেন একদিন আরো বৈচি ফুল চাষ করবেন। তার ফুলের নিজস্ব ব্র্যান্ড উন্নয়ন হবে। অনলাইনে বিক্রি হবে আর সেই ফুলের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।