বাংলাদেশের অর্থনীতি, ইকোসিস্টেম ও অর্থনৈতিক ন্যায়সংগত উন্নয়ন (ইকুইটি) নিশ্চিত করতে এ খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। এসএমই ও এমএসএমই উদ্যোগ ব্যক্তি ও পারিবারিক আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড (আইজিএ) সম্প্রসারণের পাশাপাশি বৃহৎ ও মেগা শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গ্রামীণ এলাকার অশিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিত, অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ জনগোষ্ঠীর জন্য এ খাত ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। ফলে বেকার যুবসমাজের সামনে উন্নয়নের বাস্তব উদাহরণ তৈরি হয়, যা তাদের উৎপাদনশীল কাজে উদ্বুদ্ধ করে এবং কুচিন্তা ও অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে রাখে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রতিযোগিতারও জন্ম দেয়। তাই এসএমই ও এমএসএমই খাতের বিকাশে সরকার এবং সামর্থ্যবান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
বেসরকারি সংস্থা টিএমএসএস এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান (এমএফআই) স্বল্পসুদে পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে পরিকল্পিতভাবে বৃহৎ পরিসরে এসএমই ও এমএসএমই খাতে বিনিয়োগ করতে পারছে না। তবুও টিএমএসএসের প্রায় ২৫ লাখ বরোয়ারের মধ্যে প্রায় সাত লাখ বরোয়ারকে এসএমই ও এমএসএমই ঋণ প্রদান করা হয়েছে। তবে এসব ঋণের আকার তুলনামূলক বড় হওয়ায় উদ্যোক্তাদের ব্যবসা উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনায় আর্থিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
যেভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে স্বল্পসুদে অর্থায়ন সুবিধা দিয়ে থাকে, একইভাবে দক্ষ ও পরীক্ষিত এমএফআইগুলোকেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগ দেয়া প্রয়োজন। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং তৃণমূল পর্যায়ে আরো বেশি উদ্যোক্তা অর্থায়নের আওতায় আসবেন।
মূলধনের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও টিএমএসএস নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্পসুদে প্রাথমিক পুঁজি সরবরাহ করছে। তবে উদ্যোক্তা তৈরিতে শুধু অর্থায়ন নয়, প্রয়োজন ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি। করোনা মহামারীর পর সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণ তহবিল সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে অর্থায়ন কার্যক্রমও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সম্প্রসারণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা পরিচালনায় সক্ষম করে তুলতে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সরঞ্জাম সরবরাহ জরুরি। স্মার্টফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ইন্টারনেট সংযোগ ও ওয়াই-ফাই সুবিধাসহ একটি প্রযুক্তিবান্ধব ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে ক্লাস্টারভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার।
আইজিএ কার্যক্রমের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানে সফল ব্যক্তিদের লেটারাল এন্ট্রির মাধ্যমে এসএমই ও এমএসএমই খাতে অন্তর্ভুক্ত করে টিএমএসএস সীমিত পরিসরে ইতিবাচক ফলাফল অর্জন করেছে। তবে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাবে এ কার্যক্রমকে বৃহত্তর পরিসরে সম্প্রসারণ করা যাচ্ছে না। তাই টিএমএসএসসহ সমমানের এনজিও-এমএফআইগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে উদার ও কার্যকর প্রণোদনা তহবিল সরবরাহ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার থাকা উচিত।
আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, এসএমই ও এমএসএমই উদ্যোক্তারা সরাসরি বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে না পারায় মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিমুনাফা, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং আড়তদারদের নানা ধরনের শোষণের শিকার হন। তাই উৎপাদক উদ্যোক্তাদের বাজার ব্যবস্থাপনায় সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীনির্ভরতা কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে সাম্প্রতিক সংকট ও অনাস্থার কারণে অনেক পরিবার এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে, এমনকি অনেকে ব্যাংক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষিত ও জনগণের আস্থাভাজন এমএফআইগুলোর জন্য আমানত ও সঞ্চয় সংগ্রহে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা বা ক্যাপিং নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এমএফআইগুলোকে ব্যাপকভাবে সঞ্চয় ও আমানত সংগ্রহের সুযোগ দিলে ঋণগ্রহীতা পরিবারগুলো নিজস্ব সম্পদ ও ইকুইটি গঠনের সুযোগ পাবে এবং ধীরে ধীরে ঋণনির্ভরতার চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। অন্যথায় পরিবারের হাতে থাকা তরল অর্থের অপচয় বাড়বে, যা শিশু-কিশোর ও তরুণদের বিপথগামী হওয়া, নেশাগ্রস্ততা, পারিবারিক অস্থিরতা এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি বাড়াবে।
তাই ব্যাংক মালিকদের আপত্তির কারণে আরোপিত আমানত ও সঞ্চয় সংগ্রহসংক্রান্ত কষ্টদায়ক সীমাবদ্ধতাগুলো অপসারণ করা সময়ের দাবি। তৃণমূল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এসএমই ও এমএসএমই খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সহজ অর্থায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাজার সুবিধা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।










