শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে এ খাত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতি, নারী ক্ষমতায়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এসএমই খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার বিশ্বাস, দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে এসএমই খাতের অবদান ভবিষ্যতে আরো বাড়বে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতের অগ্রগতিতে আপনার প্রতিষ্ঠানের অবদান কী?
অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স এসএমই অর্থায়নকে তার অন্যতম কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে। আমরা কার্যকর মূলধন, ব্যবসা সম্প্রসারণ, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ক্রয় এবং বাণিজ্যিক যানবাহন সংগ্রহের জন্য গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন সুবিধা প্রদান করছি।
পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় নারী উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ ও ক্লাস্টারভিত্তিক ব্যবসার জন্য স্বল্প সুদে অর্থায়ন সুবিধা প্রদান করছি। আমাদের সহযোগী মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রামীণ ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের কাছেও অর্থায়নের সুযোগ পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।
অর্থায়নের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমরা নিয়মিত আর্থিক সচেতনতা ও প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। আমাদের লক্ষ্য শুধু অর্থায়ন প্রদান নয়, বরং এসএমই উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে পাশে থাকা।
অর্থনৈতিক সংকটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা ও করণীয় কী হওয়া উচিৎ বলে মনে করেন?
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী অর্থায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু জামানতনির্ভর মূল্যায়নের পরিবর্তে ব্যবসার নগদ প্রবাহ, সম্ভাবনা এবং উদ্যোক্তার সক্ষমতাকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
এছাড়া দ্রুত ঋণ অনুমোদন, সহজ ডকুমেন্টেশন, ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ, আর্থিক পরামর্শ এবং উদ্যোক্তাদের আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধির উদ্যোগ আরো জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের কার্যকর ব্যবহার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ আরো বাড়াতে পারে।
অর্থনৈতিক মূল ধারায় নারী ও যুব সমাজকে সম্পৃক্ত করতে আপনার প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন বা সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে চাই।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় স্বল্প সুদে বিশেষ অর্থায়ন সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। ফলে নারী উদ্যোক্তারা তুলনামূলক সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ পাচ্ছেন।
তরুণ ও উদীয়মান উদ্যোক্তাদের জন্য আমরা স্টার্টআপ ফাইন্যান্সিং সুবিধা প্রদান করছি, যা নতুন ও সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলোকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করছে। পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং সক্ষমতা উন্নয়নেও সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতের অর্থায়ন ও ব্যবসা পরিচালনায় আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা আরো কীভাবে সমন্বয় করা যায়?
প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা এসএমই অর্থায়নকে আরো দ্রুত, স্বচ্ছ ও সহজ করতে পারে। ই-কেওয়াইসি, ডিজিটাল অনবোর্ডিং, অনলাইন আবেদন এবং তথ্যভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন পদ্ধতি অর্থায়ন প্রক্রিয়াকে আরো কার্যকর করে তুলছে।
অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স এরই মধ্যে ই-কেওয়াইসি ও এসএমএস অ্যালার্ট সেবা বাস্তবায়ন করেছে। পাশাপাশি ন্যানো ঋণের একটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য দ্রুত ও সহজ অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি করবে। ভবিষ্যতেও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন ও ডিজিটাল সমাধানের মাধ্যমে এসএমই গ্রাহকদের জন্য আরো দ্রুত, সহজ ও কার্যকর সেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ ঋণ সুবিধা ও প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বিতরণে আপনাদের প্রতিষ্ঠান কী ধরনের নীতিমালা বা গাইডলাইন অনুসরণ করছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা কর্মসূচি বাস্তবায়নে অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। নারী উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ উদ্যোক্তা, ক্লাস্টারভিত্তিক ব্যবসা এবং অন্যান্য এসএমই গ্রাহকের জন্য এসব সুবিধা নিশ্চিত করতে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি।
এছাড়া যোগ্য গ্রাহক চিহ্নিতকরণ, দ্রুত ঋণ প্রক্রিয়াকরণ, মাঠ পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী উপযোগী অর্থায়ন কাঠামো তৈরির মাধ্যমে এসব তহবিলের সুফল উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এসএমই খাতের টেকসই রূপান্তরে কী ধরনের নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
এসএমই খাতের টেকসই বিকাশের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম ও ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থার সম্প্রসারণের মাধ্যমে জামানতনির্ভরতা কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত, নগদ প্রবাহভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন পদ্ধতির ব্যবহার আরো বাড়াতে হবে।
এছাড়া অর্থায়নের খরচ কমানো, ঋণ প্রক্রিয়ার ডকুমেন্টেশন সহজ করা, ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তার এবং বিকল্প ঋণ মূল্যায়ন পদ্ধতির উন্নয়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও ব্যবসায়িক দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি গ্রহণে সহায়তা এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
আমার বিশ্বাস, সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং উদ্যোক্তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এসএমই খাত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই উন্নয়নে আরো বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।










