আমাদের প্রতিষ্ঠানের মূল দর্শনই হলো দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও মফস্বল এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা এবং তাদের টেকসই ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করা।
প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই আমরা কৃষি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, উৎপাদন, ট্রেডিং, সেবা এবং বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে এসএমই অর্থায়ন করে আসছি। বিশেষ করে বগুড়ার কৃষিযন্ত্র ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প, সিরাজগঞ্জের বেলকুচি পাওয়ার লুম ক্লাস্টার, দিনাজপুরের রাইস প্রসেসিং শিল্পসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ক্লাস্টারের উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের মাধ্যমে আমরা স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখে চলেছি।
আমরা বিশ্বাস করি, এসএমই অর্থায়ন শুধু ঋণ প্রদান নয়; বরং এটি উদ্যোক্তার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নযাত্রার অংশীদার হওয়া। ইউনাইটেড ফাইন্যান্সের অনেক গ্রাহক ক্ষুদ্র ব্যবসা দিয়ে যাত্রা শুরু করে আজ মাঝারি ও বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছেন। এ দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক এবং উদ্যোক্তাদের বিকাশে সহযাত্রী হওয়াকেই আমরা আমাদের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখি।
নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও টেকসই অর্থায়ন আমাদের ব্যবসায়িক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করি এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ব্যবসায় অর্থায়নে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি। ২০২৫ সালে আমাদের মোট অর্থায়নের প্রায় ৮২ শতাংশই ছিল টেকসই ও গ্রিন ফাইন্যান্সিং সংশ্লিষ্ট খাতে, যা আমাদের দায়িত্বশীল অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিকে প্রতিফলিত করে।
অর্থায়নের পাশাপাশি আমরা উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রম, ব্যবসায়িক সচেতনতা বৃদ্ধি, বাজার সংযোগ সৃষ্টি, ক্লাস্টারভিত্তিক উন্নয়ন উদ্যোগ এবং আর্থিক শিক্ষার প্রসারে বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করি। একই সঙ্গে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের উদ্যোক্তাদের আরো সহজে আর্থিক সেবার আওতায় আনার জন্য কাজ করছি।
নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার প্রতিষ্ঠানের বিশেষ কোনো অর্থায়ন বা সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে কি?
ইউনাইটেড ফাইন্যান্স সবসময় নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিফাইন্যান্সিং সুবিধার আওতায় আমরা ‘ইউ-রাইজ’ নামে একটি স্টার্টআপ ফাইন্যান্সিং প্রডাক্ট চালু করেছি, যা বিশেষভাবে নতুন ও উদ্ভাবনী উদ্যোক্তাদের জন্য তৈরি করা হয়েছে। আবেদন প্রক্রিয়াকে সহজ ও দ্রুত করার জন্য আমরা এটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল করেছি এবং এরই মধ্যে এ কর্মসূচির আওতায় অর্থায়ন প্রদান শুরু হয়েছে।
এছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আমরা বিশেষ অর্থায়ন সুবিধা, অগ্রাধিকারভিত্তিক সেবা এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা প্রদান করে থাকি। আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা এসএমই খাতের অর্থায়ন ও ব্যবসা পরিচালনায় আরো কীভাবে কাজে লাগানো যায়?
আমরা বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতের এসএমই অর্থায়ন হবে ডেটা-নির্ভর, কাগজবিহীন ও দ্রুত সিদ্ধান্তভিত্তিক। এজন্য ই-কেওয়াইসি, ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন, ডেটা অ্যানালিটিকস, বিকল্প তথ্যভিত্তিক ক্রেডিট মূল্যায়ন এবং স্বয়ংক্রিয় প্রসেসিং ধীরে ধীরে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের ব্যবসা ব্যবস্থাপনা, হিসাবরক্ষণ, ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
আইএফসির পরামর্শে আমরা এসএমই উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল সক্ষমতা উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতায় বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। ভবিষ্যতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু অর্থায়ন প্রদানকারী নয়, বরং ডিজিটাল সক্ষমতা উন্নয়নের অংশীদার হিসেবেও কাজ করবে বলে আমি মনে করি।
বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতের জন্য পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
একটি দায়িত্বশীল আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউনাইটেড ফাইন্যান্স শুরু থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন এসএমই পুনঃঅর্থায়ন তহবিল, প্রণোদনা প্যাকেজ এবং উন্নয়নমূলক কর্মসূচির সক্রিয় অংশীদার হিসেবে কাজ করে আসছে। কয়েক বছরে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক রিফাইন্যান্সিং কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছি এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কাছে এসব সুবিধা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ তহবিলগুলোর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো উদ্যোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী সুদে অর্থায়ন নিশ্চিত করা। আমরা সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছি, যাতে উদ্যোক্তারা তুলনামূলক কম খরচে অর্থায়ন পেতে পারেন এবং দ্রুততম সময়ে ঋণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের সফল বাস্তবায়ন, সুশাসন ও গ্রাহকসেবার মান বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত রিফাইন্যান্সিং সুবিধাও প্রদান করেছে, যা আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
তবে আমরা রিফাইন্যান্সিংকে শুধু একটি অর্থায়ন কর্মসূচি হিসেবে দেখি না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতায় আমরা বিভিন্ন উদ্যোক্তা উন্নয়ন, সচেতনতামূলক ও সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছি, যাতে উদ্যোক্তারা শুধু অর্থায়নই নয়, বরং ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানও অর্জন করতে পারেন। এসব কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য ইউনাইটেড ফাইন্যান্সে একটি বিশেষায়িত টিম কাজ করছে, যারা দেশব্যাপী ব্যবসা টিমের সঙ্গে সমন্বয় করে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করে, পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করে এবং গ্রাহকরা যেন সহজে ও দ্রুত এসব সুবিধা পেতে পারেন তা নিশ্চিত করে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে আমরা আমাদের প্রথম স্টার্টআপ ঋণ বিতরণ সম্পন্ন করেছি, যা নতুন উদ্যোক্তা উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আমি মনে করি, বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা কর্মসূচিগুলো এসএমই খাতের জন্য একটি শক্তিশালী সহায়ক ব্যবস্থা। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা একসঙ্গে কাজ করলে এ সুবিধাগুলো আরো বেশি উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছবে এবং কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আরো বড় অবদান রাখবে।










