তবে একজন আশাবাদী মানুষ হিসেবে তিনি হতাশ হননি। চেষ্টা ও অধ্যবসায় ধরে রেখেছিলেন। সেই অদম্য মানসিকতাই তাকে নিয়ে গেছে সাফল্যের পথে। নিজের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানের নামও তাই দিয়েছেন ‘অপরাজেয়’।

অপরাজেয় লিমিটেড বর্তমানে স্থানীয় বাজার থেকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছে দিচ্ছে মানসম্পন্ন শিল্পকর্মসম ব্যাগ ও ক্রাফট পণ্য। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শুধু সোনালি আঁশ পাট নয়, হোগলা পাতা, সি গ্রাস ও কাইসা ঘাস দিয়ে তৈরি পণ্যও পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

উদ্যোক্তা মনির হোসেনের শুরুটাও ছিল সাহস ও চ্যালেঞ্জে ভরা। কৃষক বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে একটি সম্মানজনক চাকরি করবে। কিন্তু চাকরির গণ্ডি তাকে দীর্ঘদিন আটকে রাখতে পারেনি। ২০১৩ সালে বন্ধুদের সঙ্গে ছোট পরিসরে একটি কারখানা শুরু করেন তিনি। তবে দুর্ঘটনায় কারখানাটি পুড়ে যায়। এরপর ২০১৫ সালে ঝামেলামুক্ত জীবনের আশায় একটি বিদেশী প্রতিষ্ঠানে ভালো সুযোগ-সুবিধার চাকরিতে যোগ দেন। কিন্তু নিজের ভেতরে তাগিদ ছিল নতুন কিছু করার। তিনি ভাবলেন, শুধু নিজের কর্মসংস্থান নয়, এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন যেখানে অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

মনির হোসেন বলেন, ‘আমি শুরু থেকেই চেয়েছিলাম উৎপাদন ও রফতানিমুখী ব্যবসা করব। কারণ উৎপাদকের হাতে পণ্যের মান ও ধরনের নিয়ন্ত্রণ থাকে, আর উৎপাদন সবসময় আনন্দদায়ক’।

চাকরির পাশাপাশি নিয়মিত বাজার বিশ্লেষণ করতেন তিনি। অফিস শেষে ঘুরে দেখতেন বাজার, খুঁজতেন সম্ভাবনার জায়গা। একপর্যায়ে পাটপণ্য ও ক্রাফট ব্যবসাকে সম্ভাবনাময় মনে হয় তার। কারণ এ খাতের কাঁচামাল স্থানীয় ও সহজলভ্য এবং অল্প পুঁজি দিয়েও শুরু করা সম্ভব।

২০১৬ সালে চাকরি ছেড়ে দেন মনির হোসেন। শুরু হয় উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার নতুন অধ্যায়। অনলাইনে বিভিন্ন ক্রেতার ওয়েবসাইট দেখে পণ্যের তালিকা তৈরি করেন। এরপর স্থানীয় একটি কারখানা থেকে স্যাম্পল তৈরি করে প্রস্তুত করেন পণ্যের ক্যাটালগ। ইয়েলোবুক থেকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করে শুরু করেন ই-মেইল যোগাযোগ।

কিন্তু শুরুতে সাড়া পাওয়া সহজ ছিল না। প্রথম ছয় মাসে কোনো ক্রেতার কাছ থেকেই উত্তর পাননি। তবু থেমে যাননি। আবার নতুন করে স্যাম্পল ও ক্যাটালগ তৈরির কাজ শুরু করেন। প্রায় এক বছর পর ক্রেতাদের কাছ থেকে সাড়া আসতে শুরু করে এবং আসে প্রথম অর্ডার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। দ্বিতীয় অর্ডারের পর ২০১৮ সালে ১৩টি মেশিন ও ২৫ জন শ্রমিক নিয়ে ভাড়া করা একটি কারখানায় উৎপাদন শুরু করে অপরাজেয় লিমিটেড। প্রতিষ্ঠার প্রথম বছরেই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় আড়াই লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করে। ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিসর বাড়তে থাকে। বর্তমানে অপরাজেয়র রয়েছে ১৫ হাজার বর্গফুটের নিজস্ব কারখানা। দুটি ইউনিট মিলিয়ে মোট ২৫ হাজার বর্গফুট উৎপাদন এলাকায় কাজ করছেন ২৩৮ জন স্থায়ী ও ১৩০ জন অস্থায়ী শ্রমিক। আরো ২৭ হাজার বর্গফুটের একটি কারখানা ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে।

শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, শ্রমিকবান্ধব কর্মপরিবেশ তৈরিতেও গুরুত্ব দিচ্ছে অপরাজেয়। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের অন্যতম ক্রাফট উৎপাদক প্রতিষ্ঠান, যেখানে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য সরকার ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি কাঠামো অনুসরণ করা হয়। পাশাপাশি শ্রমিক সন্তানদের জন্য শিক্ষা ভাতা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শ্রমিকদের জন্য বিশেষ ভাতা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমানে পাটের তৈরি ব্যাগ ও বিভিন্ন ক্রাফট পণ্য যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, স্পেন, পোল্যান্ড, গ্রিস, ডেনমার্ক, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়েসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করছে অপরাজেয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির রফতানি আয় হয়েছে ২ মিলিয়ন ডলারের বেশি।

আগামী তিন বছরের মধ্যে ভার্টিক্যাল প্রডাকশন লাইন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এ লক্ষ্যে একটি বিশেষায়িত পাটকল স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। মনির হোসেন বিশ্বাস করেন, একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি তার শ্রমিক। শ্রমিকদের সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করতে ‘অপরাজেয়’ একটি চ্যারিটেবল ট্রাস্ট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। শুরুতে প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ শেয়ার ট্রাস্ট পরিচালনা করবে এবং এর আয় কর্মরত শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করা হবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের ৫০ শতাংশ শেয়ার ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন উদ্যোক্তা ও উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী তরুণদের উদ্দেশে মনির হোসেন বলেন, ‘উদ্যোক্তা হতে পুঁজি বিনিয়োগের চেয়ে বেশি জরুরি পরিকল্পনায় সময় দেয়া। সঠিক পরিকল্পনা ও ধৈর্যই পারে যেকোনো উদ্যোগকে সফল করতে।