তার লক্ষ্য ছিল দুটি—বাংলার বিলুপ্তপ্রায় বয়ন ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরা এবং গ্রামীণ নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। স্থানীয় তাঁত শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে তিনি এমন একটি উদ্যোগ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা একই সঙ্গে ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখবে।

তবে পথচলাটা সহজ ছিল না। মফস্বলে একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে তাকে নানা ধরনের সামাজিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। পুঁজি ছিল সীমিত, সহায়তা ছিল কম, আর নারী নেতৃত্বাধীন উদ্যোগ নিয়ে প্রচলিত নানা ধারণাও ছিল বড় বাধা। কিন্তু এসব প্রতিবন্ধকতাকে মনিরা সমস্যা হিসেবে নয়, বরং সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, যে তাঁতের সুতা শাড়ি বোনে তা মানুষের জীবন ও সম্ভাবনার নতুন গল্পও বুনতে পারে। সেই বিশ্বাস থেকেই ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে শুরু করে ‘সুতার কাব্য’।

মনিরা প্রথমে তৈরি করেছিলেন আধুনিক হোম ফার্নিশিং পণ্যের লাইন—নকশিকাঁথা, শতরঞ্জি, জুট রাগ, টেবিল রানার—যা ছিল বাংলার ঐতিহ্যের রঙ আর কারিগরের সৌরভে ভরা। তিনি বলেন, ‘আমার উদ্দেশ্য খুব সরল, শেখার সুযোগ, উপার্জনের পথ এবং নারীর নেতৃত্ব তৈরি করা’।

এ উদ্দেশ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি দিনাজপুরের পার্বতীপুরের রাজাবাসরে প্রতিষ্ঠা করেন বিনামূল্যের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এখানে গ্রামের নারীরা শিখতে থাকেন বয়ন, সেলাই, নকশা, কাঠের হস্তশিল্প। আজ পর্যন্ত ২০০ জনের বেশি নারী এখান থেকে দক্ষতা অর্জন করেছেন; অনেকেই দক্ষ কর্মী হিসেবে পূর্ণকালীন চাকরি পেয়েছেন।

একটি ছোট ঘর থেকে শুরু হওয়া মনিরার বয়ন শিল্পের উদ্যোগ বর্তমানে পরিণত হয়েছে শক্তিশালী একটি উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে। ৪৪টি তাঁত, ১৫টি সেলাই মেশিন, আর কয়েকজন কারিগর নিয়ে গড়া একটি প্রাণবন্ত ইউনিট, যারা প্রতিদিন বুনে চলেছেন নতুন স্বপ্ন। গ্লোবাল ট্রেন্ড বিশ্লেষণকারী ডিজাইন টিম যোগ দিয়েছে সৃষ্টিশীলতার নতুন মাত্রা।

সুতার কাব্যে কারিগররা শ্রমিক নন; তারা অংশীদার। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ পরিবেশ, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন—এটাই প্রতিষ্ঠানটির মেরুদণ্ড। এমনকি তার পণ্যের খুচরা বিক্রেতাদের কেউ মূল্যনীতি ভাঙলে চুক্তি বাতিল করা হয়। ন্যায় ও দৃঢ় অবস্থানই সুতার কাব্যকে আলাদা করে তুলেছে।

প্রতিষ্ঠানটির সাফল্য বাংলাদেশের সীমা ছাড়িয়ে পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক বাজারেও। ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ার গ্রাহকদের কাছে মনিরার ডিজাইন করা জুট রাগ, শতরঞ্জি, টেবিল রানার পৌঁছে গেছে, যা গ্রামীণ নারীদের দক্ষতার প্রতি বিশ্বব্যাপী আস্থা তৈরি করেছে।

বর্তমানে পার্বতীপুরে প্রায় ১০ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে রয়েছে সুতার কাব্যের কারখানা ও শোরুম। সামনে আসছে আরো নতুন সংগ্রহ— ঠাকুরগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী শাহী টেবিল রানার, জুট ব্যাগসহ পরিবেশবান্ধব নানা পণ্য।

সামাজিক প্রভাবের পাশাপাশি স্বীকৃতিও এসেছে একের পর এক; ডিএইচএল-ডেইলি স্টার আউটস্ট্যান্ডিং উইমেন ইন বিজনেস অ্যাওয়ার্ড, ২০২৩, পার্বতীপুরের ‘জয়িতা’ পুরস্কার ২০২৩ ও নবম জাতীয় এসএমই মেলা ২০২১-এ জুট ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ স্টল পুরস্কার উল্লেখযোগ্য।