সহজ ঋণ সুবিধা: আমরা উৎপাদনশীল, সেবা ও ব্যবসা খাতের সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য চলতি মূলধন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য সহজ শর্তে চলমান ঋণ, মেয়াদি ঋণ এবং তলবি ঋণের ব্যবস্থা রেখেছি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে ঢাকা ব্যাংক দেশজুড়ে ১৫০টিরও বেশি আউটলেট, শাখা এবং উপশাখা পরিচালনা করছে। এছাড়া কৃষি ও কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্পের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়নের আওতায় স্বল্প সুদের বিশেষ অর্থায়ন করা হচ্ছে।

অর্থনীতির এ চ্যালেঞ্জিং সময়ে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আরো কি ধরনের ভূমিকা রাখা দরকার বলে মনে করেন?

বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে রয়েছেন। এ সময়ে ব্যাংকগুলোর কেবল প্রথাগত ঋণ দেয়ার মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। শুধু মূলধন দেয়াই শেষ কথা নয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে কীভাবে ব্যবসার ব্যয় কমানো যায় এবং ক্যাশ ফ্লো ঠিক রাখা যায়, তার জন্য ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি বা আর্থিক জ্ঞান দেয়া প্রয়োজন। বর্তমান বাজার পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা নমনীয় করা বা বিশেষ গ্রেস পিরিয়ডের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কাঁচামাল কেনা এবং পণ্য বাজারজাতের প্রক্রিয়া সহজ করতে ডিস্ট্রিবিউটর ও সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিং সেবা জোরদার করা উচিত। বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার পরিধি বাড়ানো উচিত।

নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার প্রতিষ্ঠানের বিশেষ কোনো অর্থায়ন বা সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে কি?

হ্যাঁ, নারী ও তরুণদের ব্যবসায় অংশগ্রহণ ও সক্ষমতা বাড়াতে ঢাকা ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট কিছু কর্মসূচি চলমান রয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে আমাদের বিশেষ ‘অদ্বিতীয়া‘ ঋণ স্কিম রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় সহজ শর্তে এবং কম সুদে নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়া হয়। এছাড়া ওই ঋণ সময়মতো পরিশোধ করলে উদ্যোক্তাদের ১ শতাংশ ইনসেন্টিভ বা ছাড় দেয়া হয়। তরুণ এবং নতুন ধারণার স্টার্ট-আপ উদ্যোক্তাদের জন্য আমাদের বিশেষ তহবিল রয়েছে, যেখান থেকে কম সুদে মূলধন সহায়তা দেয়া হয়। ঢাকা ব্যাংক পিএলসি নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনা, বিপণন ও হিসাব সংরক্ষণের ওপর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও মেলার আয়োজন করে থাকে।

আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা এসএমই খাতের অর্থায়ন ও ব্যবসা পরিচালনায় আরো কীভাবে কাজে লাগানো যায়?

ঢাকা ব্যাংক বিশ্বাস করে, কাগজের ফাইল থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে রূপান্তরই ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ। ব্যাংকের বার্ষিক থিম—পেপারস টু পিক্সেলস: দ্য ফিউচার অব ব্যাংকিং থ্রু এআই—এ লক্ষ্যকেই নির্দেশ করে।

ঢাকা ব্যাংক পিএলসি ই-রিন অ্যাপের মাধ্যমে এআই এবং ডিজিটাল ডেটার সহায়তায় প্রথাগত কাগজের নথির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত ঋণের আবেদন মূল্যায়ন করে এবং ঋণ বিতরণ করছে। ব্যবসায়ীদের লেনদেন সহজ করতে কিউআর কোড এবং অ্যাপভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা সরবরাহ করা হচ্ছে, যা ব্যবসায়িক খরচ কমায়। এছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ডিস্ট্রিবিউটরদের সহজে ঋণ প্রদানের জন্য মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রোভাইডারদের সহায়তায় ঋণ প্রদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতের জন্য পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা প্যাকেজগুলোয় ঢাকা ব্যাংক পিএলসি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং এসব পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় অর্থায়ন করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা বা বিশেষ তহবিলের টাকা যেন প্রকৃত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পান, তা নিশ্চিত করতে আমাদের একটি বিশেষ তদারকি দল কাজ করছে।

ঢাকা ব্যাংক সম্প্রতি এসএমই ফাউন্ডেশনের অধীনে জাইকা অর্থায়িত ‘ফুড ভ্যালু চেইন ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’ এবং ‘স্পেশাল এসএমই ক্রেডিট হোলসেলিং প্রোগ্রাম’-এর চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ চুক্তির আওতায় সিএমএসএমই খাত এবং বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের ৮-৯ শতাংশ সুদে এবং সহজ শর্তে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা দেয়া হচ্ছে।

এমএসএমই খাতের বড় চ্যালেঞ্জগুলো—যেমন জামানত সংকট, উচ্চ অর্থায়ন ব্যয় বা বাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা—মোকাবেলায় কী ধরনের নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

এমএসএমই খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকটগুলো কাটিয়ে উঠতে ব্যাংক ও নীতিনির্ধারক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। জামানত বা বন্ধকি সম্পত্তির সংকটের সমাধান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‹ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম› আরো সহজ ও বিস্তৃত করা দরকার। এর মাধ্যমে জামানত ছাড়াই ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নির্ভয়ে ঋণ দিতে পারবে। প্রথাগত ব্যাংকিং নথির বদলে মোবাইল ওয়ালেট লেনদেন, ইউটিলিটি বিল বা সাপ্লাই চেইনের ডেটা ব্যবহার করে ঋণ দেয়ার আইনি কাঠামো আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্দিষ্ট পণ্যের যে শিল্প গড়ে উঠেছে (যেমন—জুতো, হস্তশিল্প বা চামড়াজাত পণ্য), সেগুলোকে সরকারি নীতিমালার মাধ্যমে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা জোনের সঙ্গে যুক্ত করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে হবে।