বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অর্থনীতিকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে এমএসএমই খাতের ভূমিকা অনন্য। এটি শুধু ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্র নয়, বরং নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, নারী ক্ষমতায়ন, যুবসমাজের কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসের একটি কার্যকর মাধ্যম।

এনআরবিসি ব্যাংক এসএমই খাতের জন্য কী করছে?

এনআরবিসি ব্যাংক শুরু থেকেই এসএমই খাতকে ব্যবসায়িক কৌশলের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। বর্তমানে আমরা দেশের প্রায় ৪৭ হাজার ৭৯০ জন এসএমই গ্রাহককে ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছি। এ পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট এসএমই ঋণ বিতরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৫৮৭.৬২ কোটি টাকা এবং বর্তমানে আমাদের এসএমই ঋণ পোর্টফোলিওর স্থিতি প্রায় ৩ হাজার ৮৬১.৭২ কোটি টাকা।

আমরা উৎপাদন, ট্রেডিং, কৃষি প্রক্রিয়াজাত, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, শিক্ষা, সেবা খাত, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন খাতে উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনভিত্তিক অর্থায়ন করে আসছি। আমাদের লক্ষ্য শুধু ঋণ প্রদান নয়; বরং উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু, পরিচালনা ও সম্প্রসারণে অংশীদার হিসেবে পাশে থাকা।

অর্থনীতির এ চ্যালেঞ্জিং সময়ে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আরো কী ধরনের ভূমিকা রাখা দরকার বলে মনে করেন?

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শুধু অর্থায়ন করলেই যথেষ্ট নয়। এসএমই উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন বাজার তথ্য, ব্যবসা উন্নয়ন পরামর্শ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং দক্ষতা উন্নয়ন। ব্যাংকগুলোকে প্রচলিত ঋণদাতার ভূমিকা থেকে বেরিয়ে এসে ব্যবসা উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করতে হবে।

বর্তমান সময়ে ব্যবসাগুলোকে উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, বাজারের অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নমনীয় সুদে অর্থায়ন, পুনঃতফসিল সুবিধা, ডিজিটাল সেবা, আর্থিক পরামর্শ এবং উদ্যোক্তাবান্ধব ব্যাংকিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি।

নারী উদ্যোক্তা ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার প্রতিষ্ঠানের বিশেষ কোনো অর্থায়ন বা সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে কি?

আমরা বিশ্বাস করি নারী উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো জাতীয় উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য এনআরবিসি ব্যাংক নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধাগুলোও সক্রিয়ভাবে বাস্তবায়ন করছে।

একইভাবে তরুণ উদ্যোক্তারাও বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ। প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপ, উদ্ভাবনী ব্যবসা এবং ডিজিটাল উদ্যোগগুলোকে আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য উপযোগী অর্থায়ন, ব্যবসা পরামর্শ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নমূলক বিভিন্ন উদ্যোগে আমরা অংশগ্রহণ করছি। আমরা বিশ্বাস করি, আগামী দিনের অর্থনৈতিক রূপান্তরে যুব উদ্যোক্তারাই নেতৃত্ব দেবে।

আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা এসএমই খাতের অর্থায়ন ও ব্যবসা পরিচালনায় আরো কীভাবে কাজে লাগানো যায়?

ডিজিটাল প্রযুক্তি এসএমই খাতের জন্য একটি গেম-চেঞ্জার। বর্তমানে উদ্যোক্তারা দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছ ব্যাংকিং সেবা প্রত্যাশা করেন। ডিজিটাল ব্যাংকিং প্লাটফর্ম, অনলাইন ঋণ আবেদন, স্বয়ংক্রিয় পেমেন্ট সল্যুশন, ডেটাভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন এবং ডিজিটাল গ্রাহকসেবা ব্যবসার কার্যক্রমকে আরো কার্যকর ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে।

এনআরবিসি ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে যাতে উদ্যোক্তারা সহজে ব্যাংকিং সুবিধা নিতে পারেন। প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্যের অসমতা কমবে, ঋণপ্রাপ্তি সহজ হবে, লেনদেন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং এমএসএমই খাতের সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতের জন্য পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন তহবিল, প্রণোদনা প্যাকেজ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচি এসএমই খাতের বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এনআরবিসি ব্যাংক সফলতার সঙ্গে এসব তহবিল ব্যবহার করে উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধা দিয়েছে।

আমরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যোগ্য উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার আওতায় নিয়ে আসছি। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা, ক্লাস্টারভিত্তিক শিল্প এবং নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে এসব সুবিধা পৌঁছে দেয়ার জন্য দেশব্যাপী বিস্তৃত ৫ শতাধিক শাখা ও উপশাখা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের সুবিধাগুলো যেন প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করে।

এমএসএমই খাতের বড় চ্যালেঞ্জগুলো—যেমন জামানত সংকট, উচ্চ অর্থায়ন ব্যয় বা বাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কী ধরনের নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

এমএসএমই খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো জামানতভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থা। অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক সক্ষমতা থাকলেও পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় তারা অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হন। তাই ভবিষ্যতে ক্যাশ-ফ্লোভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন, বিকল্প ক্রেডিট স্কোরিং ব্যবস্থা এবং কার্যকর ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম চালু ও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে বাজারে প্রবেশাধিকারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসএমইগুলোকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত করা, ই-কমার্স প্লাটফর্মে অংশগ্রহণ বাড়ানো, রফতানি সহায়তা এবং ব্যবসা উন্নয়ন সেবার সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।

আমি বিশ্বাস করি, সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এমএসএমই খাত বাংলাদেশের টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে আরো বড় ভূমিকা রাখবে।

উদ্যোক্তাদের শ্রম, উদ্ভাবন ও সাহসিকতাই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি ভবিষ্যতেও উদ্যোক্তাদের বিশ্বস্ত আর্থিক অংশীদার হিসেবে পাশে থাকবে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাবে।