একদম ছোট পুঁজি নিয়ে শুরু করে আজকে তারা এ পর্যায়ে এসেছেন। একসময় ট্রেডিংই ছিল তাদের মূল ব্যবসা, সেখান থেকে ধীরে ধীরে সবাই উৎপাদনমুখী খাতে গেছেন। তবে বর্তমানে এমএসএমই থেকে ধাপে ধাপে বড় করপোরেট হওয়ার সে রূপান্তর আর সহজে হচ্ছে না। এটার জন্য আমাদের আরো অনেক কাজ করতে হবে।

রূপান্তর বা বড় হওয়ার ক্ষেত্রে মূল বাধাটা কোথায়? ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা এখানে কেমন হওয়া উচিত?

এখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো ‘হ্যান্ড হোল্ডিং’ বা হাত ধরে উদ্যোক্তাকে এগিয়ে নেয়া। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবসিডাইজড ফান্ড বা রিফাইন্যান্সিং স্কিম দিয়ে একটা এসএমইকে বড় করা কঠিন। যারা মাঠপর্যায়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা করছেন, তারা সবাই কিন্তু বিজনেস গ্র্যাজুয়েট বা উচ্চশিক্ষিত নন। তারা ব্যবসার ভেতরে থেকেই কাজটা শেখেন। তাই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হলো তাদের গাইড করা—কীভাবে বুক-কিপিং করতে হয়, ক্যাশ ফ্লো মেইনটেইন করতে হয়।

লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং বা অন্যান্য ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে এমএসএমই খাতের সম্ভাবনা কেমন?

প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আমরা অনেক কিছু করতে পারি। আমরা এখনো হেভি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে যাইনি। আমরা যদি টেক্সটাইল করতে পারি, তবে টেক্সটাইল মেশিনারি কেন আমাদের দেশে তৈরি হবে না? হ্যাঁ, এগুলো ক্যাপিটাল ইনটেনসিভ, হয়তো শুরুতে বিদেশী পার্টনারশিপ বা জয়েন্ট ভেঞ্চার লাগবে। কিন্তু একটা বড় মেশিনারি ভেঙে গেলে বা কোনো পার্টস নষ্ট হলে সেটা কিন্তু আমাদের স্থানীয় লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এমএসএমইরাই সারিয়ে দিচ্ছে। গাড়ি মেরামত থেকে শুরু করে ছোট যন্ত্রাংশ তৈরি সবখানেই তাদের অবদান আছে। তবে পুরো বিষয়টাকে একটা কাঠামোগত জায়গায় আনতে হবে।

রাষ্ট্রের নীতি বা কর কাঠামো কি এমএসএমই-বান্ধব? এখানে কী ধরনের পরিবর্তন দরকার?

সত্যি কথা বলতে, এত বছর পরও আমরা কার্যকরভাবে এমএসএমই-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারিনি। বর্তমান যে কর কাঠামো সেটি কোনোভাবেই এ খাতের জন্য সহায়ক নয়। যেখানে প্রফিট মার্জিন দিন দিন কমে যাচ্ছে, সেখানে আপনি ‘টার্নওভার ট্যাক্স’ চাপিয়ে দিচ্ছেন। টার্নওভার ট্যাক্স তো কোনো সমাধান হতে পারে না, আপনাকে প্রকৃত মুনাফার ওপর চিন্তা করতে হবে। তাছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাইন্ডসেট বদলাতে হবে। আমরা অনেক বেশি কমার্শিয়াল হয়ে গেছি। বড় বড় করপোরেটকে বড় আকারের ঋণ না দিয়ে নিজেদের মুনাফার একটা অংশ দেশের স্বার্থে এ ছোট উদ্যোক্তাদের দিতে হবে, যাতে তাদের তারল্য চাহিদা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হয়।

লংকাবাংলা ফাইন্যান্স এমএসএমই খাতে বিশেষ করে তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে কী ভূমিকা রাখছে?

আমরা নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রচুর কাজ করছি। আমাদের এমএসএমই টিম খুবই স্ট্রাকচার্ড ও স্ট্রং। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যতগুলো স্পেশাল উইন্ডো বা ফান্ড আছে, আমরা সবগুলো সফলভাবে নিতে পেরেছি। কভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের জন্য একটি তহবিলে মাত্র ১১-১২টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়েছিল, লংকাবাংলা তার মধ্যে অন্যতম ছিল। যেখানে মাত্র ৩০০ উদ্যোক্তাকে অর্থায়নের লক্ষ্য ছিল, সেখানে আমাদের প্রতিষ্ঠান প্রায় ১৩০০-এর কাছাকাছি এমএসএমই উদ্যোক্তাকে সাপোর্ট দিয়েছে, যা মোট পোর্টফোলিওর ১০ শতাংশের বেশি। আমরা বিশ্বাস করি, দেশের ভবিষ্যৎ এই এমএসএমই খাতের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।

এমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে আধুনিক প্রযুক্তি কীভাবে সাহায্য করতে পারে?

প্রযুক্তি এখানে বড় গেম চেঞ্জার হতে পারে, বিশেষ করে এআই-ড্রিভেন ভয়েস সিস্টেম। প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের ইংরেজি বা জটিল ফরম্যাটে আর্থিক বিবরণী বানানোর ক্ষমতা নেই। ব্র্যাক বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কিছু মডেল তৈরি করেছে, কিন্তু আমাদের আরো সহজ করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি বাংলায় হতে হবে। অ্যাপ বা সিস্টেমে ভয়েসের মাধ্যমে উদ্যোক্তাকে ব্যবসার মৌলিক প্রশ্নগুলো করা হবে এবং তিনি মুখে বাংলায় উত্তর দেবেন, যা রেকর্ড হয়ে যাবে। এরপর তার গত তিন-চার বছরের ব্যবসায়িক লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড দেখে ইন্টারনাল বিহেভিয়ারের ওপর ভিত্তি করে একটি ক্রেডিট রেটিং তৈরি করা সম্ভব। এর জন্য বিশাল কাগজের ফাইলের কোনো দরকার নেই।

দেশে স্টার্টআপ বা নতুন উদ্যোগের জন্য ইকুইটি ফান্ডিংয়ের ব্যবস্থা কেন গড়ে উঠছে না?

ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন উইন্ডো বা লং-টার্ম ইকুইটি ফান্ডের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা হয়েছে। ইকুইটি একটি পেইনফুল প্রসেস। আমাদের দেশে এটা না হওয়ার মূল কারণ—আমাদের সেকেন্ডারি মার্কেট বা ক্যাপিটাল মার্কেট ও ডেট ইনস্ট্রুমেন্ট এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। অতীতের কিছু কেলেঙ্কারির কারণে ডিবেঞ্চার বা ডেট ইনস্ট্রুমেন্টের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন কোম্পানির জন্য শুরুতে কিন্তু প্রায় ৬০০ কোটি টাকার বেশি ইকুইটি ফান্ড গঠন করার কথা বলেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান সেই ফান্ড সঠিকভাবে ডিস্ট্রিবিউট করেনি।

এমএসএমই খাতের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন প্যাকেজ বা রিফাইন্যান্সিং স্কিম কি পর্যাপ্ত, নাকি এর আকার আরো বাড়ানোর প্রয়োজন আছে?

ফান্ড বাড়ালে অবশ্যই ভালো। তবে আমার প্রশ্ন হলো—বছরের পর বছর শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকই কেন ফান্ড দিয়ে যাবে? ব্যাংকাররা নিজেরা কী করবে? বড় বড় ব্যাংক যাদের কাছে উদ্বৃত্ত তারল্য আছে, তারা কেন নিজেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এমএসএমই খাতে অর্থায়ন করবে না। তাছাড়া আমরা কতদিন এডিবি বা জাইকার ফান্ডের মতো বিদেশী সংস্থার দিকে তাকিয়ে থাকব? দেশের বয়স তো এখন ৫৫ বছর হতে চলল। এখন সরকারের উচিত স্ট্রাকচার্ড লং-টার্ম বন্ড ইস্যু করা। সরকারের ঝুঁকিবিহীন বন্ডের সর্বোচ্চ সুদের হার ৭-৮ শতাংশ হতে পারে এবং এটি সম্পূর্ণ করমুক্ত করা উচিত। তাহলে ব্যাংকগুলো এ বন্ডের মাধ্যমে ফান্ডিং পেয়ে উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ১২-১৩ শতাংশ সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে পারবে।