একসময় মঙ্গাপীড়িত এলাকা হিসেবে পরিচিত রংপুরের এ উদ্যোক্তা সব সংকটকে জয় করে দুই সন্তানকে নিয়ে জীবন-বাস্তবতা হাসিমুখে গ্রহণ করেছেন। সীমিত পেশাগত সুযোগ, পারিবারিক দায়িত্ব ও কঠিন সামাজিক বাস্তবতা—কোনোটিই তাকে থামাতে পারেনি।
পারিবারিক সমস্যার কারণে দুই সন্তানকে নিয়ে যখন তিনি রংপুরে ফিরে আসেন, তখন সামনে ছিল অনিশ্চয়তা। চাকরির সুযোগ ছিল সীমিত, বয়স ও দায়িত্ব মিলিয়ে সময়টাও ছিল কঠিন। তবে তার বিশ্বাস ছিল, পথ শেষ হয়ে যায় না; বরং নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করতে হয়। সেই বিশ্বাস ও অদম্য মনোবল থেকেই শুরু হয় তার নতুন যাত্রা। ‘আহ্লাদ ফ্যাশনস’ কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থেকে শুরু হয়নি; এটি ছিল প্রয়োজন, সাহস ও আত্মসম্মান নিয়ে টিকে থাকার এক প্রচেষ্টা।
খুব সামান্য মূলধন ও একটি সেলাই মেশিন নিয়ে ঘরে বসেই কাজ শুরু করেন তিনি। শুরুর দিনগুলোয় সুযোগ ছিল সীমিত, কিন্তু শেখার আগ্রহ ছিল অটুট। নিজেকে প্রস্তুত করতে তিনি সেলাইয়ের বৈচিত্র্য, পণ্যের নকশা ও উন্নয়ন, রঙের সমন্বয়, কোম্পানি ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল প্লাটফর্ম পরিচালনার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। এক্ষেত্রে এসএমই ফাউন্ডেশন, বিসিক, জেডিপিসি, ডব্লিউকানেক্ট ইন্টারন্যাশনাল, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতার কথা তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। শেখার প্রতি দায়বদ্ধতাই আজকের ‘আহ্লাদ’-এর ভিত্তি।
বর্তমানে আহ্লাদ ফ্যাশনসের পরিবারে রয়েছেন ১৫ জন স্থায়ী কর্মী এবং ৮০ জনের বেশি গ্রামীণ নারী কারিগর। তাদের নিপুণ হাতের কাজই এই ব্র্যান্ডের অন্যতম পরিচয়। একটি সেলাই মেশিন থেকে শুরু হওয়া উদ্যোগটি এখন এমন এক কর্মপরিবেশে পরিণত হয়েছে, যেখানে নারীরা নিরাপদে, সম্মানের সঙ্গে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন।
আহ্লাদের প্রতিটি পণ্য হাতে তৈরি। প্রতিটি ব্যাগ, প্রতিটি নকশা, প্রতিটি সেলাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন নারীর শ্রম ও জীবনের গল্প। গ্রামের ঘরোয়া পরিবেশে কাজ করা এসব নারী শুধু পণ্য তৈরি করছেন না; তারা তৈরি করছেন আত্মমর্যাদা, আর্থিক সক্ষমতা এবং নিজের পরিচয়ের নতুন ভিত্তি।
নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পথচলায় সামাজিক বাধা, নিরাপত্তাজনিত সংকট ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়েছে জুয়েনা ফেরদৌসকে। বড় আকারের অনেক কার্যাদেশও ফিরিয়ে দিতে হয়েছে শুধু মূলধন ও চলতি পুঁজির অভাবে। তবে শেখার আগ্রহ, এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা এবং নারীদের জন্য একটি সম্মানজনক কর্মপরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি কখনো কমেনি।
এ লক্ষ্য থেকেই তিনি গড়ে তুলেছেন ‘আহ্লাদ ক্রাফট অ্যান্ড ইনোভেশন একাডেমি’। আহ্লাদ ফ্যাশনসের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত এ অনানুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে শহর ও গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত নারীরা হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ পান। সেলাই ও হস্তশিল্প প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ পর্যন্ত দুই শতাধিক নারী দক্ষতা অর্জন করেছেন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন। এই একাডেমি শুধু প্রশিক্ষণের জায়গা নয়, এটি আত্মবিশ্বাস তৈরির একটি ক্ষেত্র।
বর্তমানে আহ্লাদ ফ্যাশনসের পণ্য দেশের বাজারের পাশাপাশি পৌঁছে যাচ্ছে নেদারল্যান্ডস, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও লন্ডনের বাজারে। এসএমই ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, জাতীয় মহিলা পরিষদ, জার্মান কালচারাল সেন্টার, জার্মান দূতাবাস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের আস্থা অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এভাবেই ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করছে ‘আহ্লাদ ফ্যাশনস’।
এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠানটি ক্রমান্বয়ে অর্জন করেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মানজনক স্বীকৃতি ও পুরস্কার। আন্তার্জাতিক ক্রেতাদের প্রশংসা ও আস্থা
উল্লেখ্য, চলতি বছর ২০২৫ সালে স্পেনের একটি আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে বড় রফতানি চুক্তি হয়েছে, যা প্রমাণ করে এ প্রতিষ্ঠানের মান এবং প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ব্র্যান্ড কখনই অঙ্কুরে বিনষ্ট হবে না।
এ অভূতপূর্ব সাফল্য প্রতিষ্ঠানটির সব পর্যায়ের জনবলের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফসল। তাদের শ্রম, প্রতিভা ও স্বপ্নের মিথস্ক্রিয়ায় ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়। তাদের জন্য একটি পরিবেশ গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করা, যেখানে আমিত্ব থেকে আমরা নিরাপদ, সম্মানিত ও সৃজনশীলভাবে কাজ করার মাধ্যমে প্রতিটি কাজে তাদের নিষ্ঠা দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে।
আর এভাবেই আহ্লাদ সবার কাছে শুধু একটি হস্তশিল্প ব্র্যান্ড নয়, জীবনদর্শনও বটে। এখানে শ্রম, সম্মান, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং মানুষের স্বপ্ন এক সুতোয় গাঁথা। এটি একটি টেকসই উন্নয়ন তথা সামাজিক প্রতিশ্রুতি, নারীর নিরাপত্তা, মানসিক স্বস্তি এবং শিশুদের যত্নকেও গুরুত্ব দেয়া হয়। এটি একটি আন্দোলন, যেখানে প্রতিটি নারীর জীবনে ‘আহ্লাদ’ ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলে অবিরত।










