বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-জিআই ইকোনমিক সেনসাস ২০২৪ অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১.১৭ কোটি অর্থনৈতিক ইউনিট কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ১ কোটি ১৬ লাখ ৯২ হাজার এমএসএমই কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের ৯৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। একই সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ এমএসএমই খাত থেকে আসে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এ খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ এমএসএমই খাতের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে এবং দেশের কয়েক কোটি মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এমএসএমই খাতের আরেকটি বড় শক্তি হলো এটি তুলনামূলক কম মূলধনে অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। নারী উদ্যোক্তা, তরুণ উদ্যোক্তা এবং প্রথম প্রজন্মের ব্যবসায়ীদের জন্য এ খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার।

সরকার এরই মধ্যে ন্যাশনাল এসএমই পলিসি ২০২৫-এর মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ৩৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমইএসপিডি মাস্টার সার্কুলার নং-০১/২০২৫-এর মাধ্যমে ২০২৯ সালের মধ্যে মোট বিনিয়োগের ২৭ শতাংশ এসএমই খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, প্রযুক্তি গ্রহণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাজার সম্প্রসারণকে আরো জোরদার করতে হবে।

আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশের আগামী অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রে থাকবে একটি শক্তিশালী, প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রতিযোগিতামূলক এমএসএমই খাত।

আপনাদের ব্যাংক এসএমই খাতের জন্য কী করছে?

শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এমএসএমই অর্থায়নকে কেবল বিনিয়োগ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে নয় বরং উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির একটি কৌশলগত প্লাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশের এসএমই খাতে এখনো উল্লেখযোগ্য অর্থায়ন ঘাটতি রয়েছে। ইডকল ও এসএমই ফাউন্ডেশন আয়োজিত আনলকিং সিএমএসএমই পটেনশিয়াল: ব্রিজিং দ্য গ্যাপস শীর্ষক এক আলোচনায় উল্লেখ করা হয় যে বাংলাদেশের সিএমএসএমই খাতে অর্থায়ন ঘাটতি ৭৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা দেশের বিপুলসংখ্যক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাকে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের বাইরে রেখে দিচ্ছে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক সম্প্রতি উদ্যোক্তাদের বহুমাত্রিক প্রয়োজন অনুযায়ী ১২টি নতুন এসএমই প্রডাক্ট চালু করেছে। এসব পণ্য ব্যবসার জীবনচক্রভিত্তিক অর্থায়ন, দ্রুত সেবা, ডিজিটাল অ্যাকসেস এবং খাতভিত্তিক আর্থিক সমাধান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে। আমাদের ব্যাংক কার্যকর মূলধন, ব্যবসা সম্প্রসারণ, যন্ত্রপাতি ক্রয়, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, সাপ্লাই চেইন সাপোর্ট এবং নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির মতো ক্ষেত্রগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে অর্থায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

একই সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংকিং, দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া, প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ মূল্যায়ন এবং গ্রাহককেন্দ্রিক সেবার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ও কার্যকর আর্থিক সেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু বিনিয়োগ দেয়া নয়, বরং একজন উদ্যোক্তার দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির অংশীদার হওয়া। ২০২৫ সালে ৪ হাজার ৫৫৪ জন নতুন গ্রাহককে মোট ৭৩৬.৫০ কোটি টাকার এসএমই বিনিয়োগ বিতরণ করা হয়েছে, যেখানে ২৭৭ জন নারী উদ্যোক্তার অনুকূলে ৫৫ কোটি ৫১ লাখ টাকার বিনিয়োগ বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। উল্লেখ্য, ওই বিনিয়োগের মধ্যে গ্রাম অঞ্চলে ১ হাজার ৮০৮ জন গ্রাহককে ৫৫৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বিনিয়োগ বিতরণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে ২৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ব্যাংকের এসএমই খাতে বিনিয়োগ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ১৫১ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা ব্যাংকের মোট বিনিয়োগের ২৬ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ।

নারী উদ্যোক্তা ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার প্রতিষ্ঠানের বিশেষ কোনো অর্থায়ন বা সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে কি?

নারী ও তরুণ উদ্যোক্তারা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাই শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এ দুই শ্রেণীর উদ্যোক্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, উদ্যোক্তাবান্ধব সেবা, দ্রুত প্রসেসিং এবং ব্যবসা উন্নয়ন সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, যাতে তারা দীর্ঘমেয়াদে আরো দক্ষ ও টেকসই উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারেন।

অন্যদিকে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য উদ্ভাবনভিত্তিক ব্যবসা, উৎপাদনমুখী উদ্যোগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রকল্পকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আমরা শুধু অর্থায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নই; বরং উদ্যোক্তার সক্ষমতা উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, আর্থিক পরিকল্পনা, বাজারে প্রবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিচ্ছি। নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ও স্বল্প মুনাফায় বিনিয়োগের জন্য রয়েছে প্রত্যয়ী ও প্রথম উদ্যোগ নামক দুটি বিনিয়োগ সুবিধা। এছাড়া তাদের জন্য রয়েছে প্রধান কার্যালয় ও শাখা/উপশাখায় ডেডিকেটেড সার্ভিস ডেস্ক।

আমাদের বিশ্বাস, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে একটি আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক, উদ্ভাবননির্ভর ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।

আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা এসএমই খাতের অর্থায়ন ও ব্যবসা পরিচালনায় আরো কীভাবে কাজে লাগানো যায়?

শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এসএমই উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে আরো সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করার লক্ষ্যে আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার ব্যবহারকে গুরুত্ব প্রদান করে থাকে।

ডিজিটাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা সহজে ব্যাংকিং লেনদেন, অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এসএমই উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ আবেদন প্রক্রিয়া সহজীকরণ, দ্রুত সেবা প্রদান, ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা এবং ব্যবসায়িক লেনদেনের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ ও আধুনিক ক্রেডিট মূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যবসার সম্ভাবনা বিবেচনায় কার্যকর অর্থায়ন নিশ্চিত করা যায়।

শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এসএমই উদ্যোক্তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি, পরিচালন ব্যয় হ্রাস এবং ব্যবসায়িক দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা করে আসছে। এছাড়া দ্রুত বিনিয়োগ অনুমোদন ও বিতরণের লক্ষ্যে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এরই মধ্যে ডিজিটাল ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ডিআইএমএস) নামক প্রযুক্তিনির্ভর অটোমেটেড প্রপোজাল অ্যাপ্রুভাল সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া শাহজালাল টাচ পে ব্যবহার করে গ্রাহকরা ঘরে বসেই যেকোনো ধরনের লেনদেন ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করতে পারছেন। এ ধরনের উদ্যোগ এসএমই খাতের টেকসই উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতের জন্য পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ঘোষিত এসএমই খাতের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য সহজলভ্য ও সময়োপযোগী অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে আসছে। ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা ও নির্দেশনা অনুসরণ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগ সুবিধা সম্প্রসারণ, দ্রুত সেবা প্রদান এবং প্রয়োজনভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী এবং সম্ভাবনাময় এসএমই উদ্যোগগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ১২টি পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের জন্য সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। এ তহবিলের আওতায় এরই মধ্যে ৬ হাজার ৮১৮ গ্রাহককে সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া নতুন আরো একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের জন্য সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর প্রক্রিয়াধীন রয়েছ। এছাড়া পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে উদ্যোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি, শাখা পর্যায়ে কার্যকর তদারকি, সহজ প্রক্রিয়ায় আবেদন নিষ্পত্তি এবং উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি মনে করে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসএমই খাতের অর্থায়ন প্রবাহ বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক সক্ষমতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।