নিজের জমানো ২৫ হাজার টাকা এবং মায়ের গহনা বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়েই তিনি ব্যবসার ভিত্তি গড়ে তোলেন।
তবে এ পর্যায়ে পৌঁছার পথ সহজ ছিল না। কিশোর বয়সে প্রবাসী বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে তাকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু আমান উল্লাহ দেশে থেকেই নিজের ও পরিবারের জন্য কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারের কাছে তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি দেশেই থাকব, দেশেই কিছু করব।’ সেই সিদ্ধান্তই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
২০০১ সালে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি ঢাকায় আসেন। একটি খেলনা তৈরির কারখানায় মাসিক ১০০ টাকা বেতনে কাজ শুরু করেন। বেতন ছিল সামান্য, কিন্তু শেখার আগ্রহ ছিল প্রবল। কারখানার নিয়মিত কাজের পাশাপাশি উৎপাদন প্রক্রিয়া, বাজারের চাহিদা, ব্যবসার কৌশল ও শিল্প পরিচালনার নানা দিক সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। প্রায় সাত বছরের সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাকে নিজস্ব ব্যবসা গড়ে তোলার সাহস ও প্রস্তুতি এনে দেয়।
এ ব্যবসার শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। বাংলাদেশ সেই সময় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর খেলনা বাজারে অভ্যস্ত। মানুষ দেশীয় খেলনা কিনতে দ্বিধায় ভুগত। কিন্তু আমানের ছিল ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি নিজেরাই খেলনা তৈরি করি, তাহলে দেশের সব শ্রেণীর মানুষ স্বল্প মূল্যে খেলনা ক্রয় করতে পারবে এবং দেশের টাকা দেশেই থাকবে। আর আমাদের দেশের মানুষই পাবে কাজ, মর্যাদা, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ’।
উদ্যোক্তা আমান উল্লাহ মাত্র চারজন শ্রমিককে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। প্রথমে উৎপাদিত পণ্য শিশুদের ঝুনঝুনি বিক্রয় করে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা মুনাফা করেন। এছাড়া লাইট বল নামক নিজস্ব উৎপাদিত খেলনা দেশে ব্যাপক সারা পায়। পরবর্তী সময়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নিজ বড় ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ভাড়া করা কারখানায় ব্যবসা সম্প্রসারণ করা হয়।
পণ্যের গুণগত মান, নিরলস পরিশ্রম ও চেষ্টায় অতি অল্প বয়সে বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মাত্র ১০ বছরে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছেন আমান উল্লাহ। বর্তমানে আমান প্লাস্টিক টয়েজ ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠানে নারী-পুরুষের মিলিত প্রচেষ্টায় ১১৮ জনের পরিবারে পরিণত হয়েছে।
‘আমান প্লাস্টিক টয়েজ ইন্ডাস্ট্রিজ’-এর তৈরি খেলনা দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসর তথা সৌদি আরব, ইতালি, শ্রীলংকা এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। আমান দেখিয়েছেন পরিশ্রম, সততা আর অভিজ্ঞতা দিয়ে দেশেও সোনার হরিণ ধরা যায়। তিনি প্রমাণ করেছেন কেবল শিক্ষাই উন্নত ও মানবিক প্রতিষ্ঠান গড়ার মূল হাতিয়ার নয়। উদ্যোক্তা আমান তার উদ্যোগকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলেছেন এবং উৎপাদন, উৎপাদিত বজ্য পুনর্ব্যবহার, সূর্যের আলো ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি সাশ্রয়, সুষ্ঠু বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাপনার স্বার্থে পিএফআই যন্ত্র স্থাপন, আধুনিক ইলেকট্রনিক হাজিরা ব্যবস্থাপনা, অগ্নিদুর্ঘটনা রোধকল্পে পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা, কর্মীদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, বিনোদনের ব্যবস্থাসহ সার্বিক সন্তোষজনক কর্মপরিবেশ।










