বাজার মন্দা ও মূল্যস্ফীতির এ পরিবেশে যৌক্তিক গ্রেস পিরিয়ড, নমনীয় পুনঃতফসিল এবং সাশ্রয়ী অর্থায়ন-ব্যয় নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে ব্যাংকের দায়িত্ব শুধু ঋণ দেয়া নয়—হিসাবরক্ষণ, ব্যবসা-পরিকল্পনা ও বাজার-সংযোগে উদ্যোক্তাদের হাতেকলমে সহায়তা দেয়া। ঝুঁকি ভাগাভাগির মডেলে নতুন ও ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের প্রতি ব্যাংকগুলোর আস্থা বাড়ানোই এ মুহূর্তের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

সিটি ব্যাংক এ খাতে কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারছে?

সিটি ব্যাংক এসএমই উদ্যোক্তাদের নিছক ঋণগ্রহীতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে দেখে। ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ, চলতি মূলধন ও স্থায়ী সম্পদ কেনার জন্য আমরা ট্রেডিং, ম্যানুফ্যাকচারিং, সেবা এবং কৃষিভিত্তিক ছোট উদ্যোগগুলোর জন্য বিশেষায়িত ঋণপণ্য রাখি—যার আওতায় দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ সুবিধাও দেয়া হয়। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আমাদের আছে দেশের অন্যতম পথিকৃৎ ‘সিটি আলো’। প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছতে আমরা সারা দেশে ১৩৫টি শাখা, ৯৬টি উপশাখা, ৩৪টি এসএমই ইউনিট অফিস, এবং ৪৯৫টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট পরিচালনা করছি। সেই সঙ্গে আলো নারী উদ্যোক্তা ঋণ এবং রেমিট্যান্স বেনিফিশিয়ারি ঋণের মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক পণ্যের মাধ্যমে গ্রামীণ আয় সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন করছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম, এসএমই ফাউন্ডেশনের পুনঃঅর্থায়ন স্কিম, ক্লাস্টার ফাইন্যান্স প্রকল্প ও ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের মতো প্রকল্পে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেও আমরা এ সাশ্রয়ী ঋণপণ্যগুলো উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে কাজ করে যাচ্ছি।

নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সিটি ব্যাংক বিশেষ কী করছে?

নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন সিটি ব্যাংকের কৌশলগত অগ্রাধিকার, যার কেন্দ্রবিন্দু আমাদের ডেডিকেটেড নারীবান্ধব ব্যাংকিং প্রপোজিশন ‘সিটি আলো’। আলো সেভিংস ও কারেন্ট অ্যাকাউন্টে নারী গ্রাহকরা অগ্রাধিকারমূলক সেবা ও উন্নত সুদহার পান; আর ‘আলো উইমেন অন্ট্রাপ্রেনিউর ফাইন্যান্স’-এর আওতায় তারা শুধু অগ্রাধিকারমূলক ঋণ-শর্তই নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় ১ কোটি টাকা পর্যন্ত মাত্র ৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারেন। রেমিট্যান্স বেনিফিশিয়ারি লোনে আমাদের প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রাহকই নারী, যারা কৃষি-খামার, বাড়ি ভাড়া ও ক্ষুদ্র ব্যবসার মতো আয়-সৃষ্টিকারী কাজে যুক্ত হচ্ছেন আমাদের ঋণ নিয়ে। ফলে আমাদের মোট কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র ঋণ পোর্টফোলিওর ২৬ শতাংশই এখন নারী উদ্যোক্তাদের দখলে, যা নিয়ন্ত্রক লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। অর্থায়নের পাশাপাশি নারীর সক্ষমতা উন্নয়নে আমরা বছরজুড়ে আর্থিক শিক্ষা কর্মসূচি ও সচেতনতামূলক ‘উঠান বৈঠক’ পরিচালনা করি এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে দেশের ফ্ল্যাগশিপ ‘সিটি আলো সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম’ পরিচালনা করছি, যা উদীয়মান নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক দক্ষতা গড়ে তোলার কাজ করে যাচ্ছে।

আর্থিক খাতে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এসএমই খাতে এর প্রয়োজনীয়তা কতটা?

প্রযুক্তিই এসএমই অর্থায়নের পরিসর বদলে দিতে পারে। ই-কেওয়াইসি ও ডিজিটাল অনবোর্ডিংয়ের মাধ্যমে কাগজবিহীন, দ্রুত সঞ্চয়-হিসাব খোলা, দ্রুত ঋণ আবেদন ও অনুমোদন সম্ভব। সবচেয়ে রূপান্তরকামী সম্ভাবনা হলো লেনদেনের তথ্য-উপাত্ত ও নগদ-প্রবাহভিত্তিক বিকল্প ক্রেডিট-স্কোরিং, যা জামানতহীন উদ্যোক্তাকেও ঋণযোগ্য করে তুলবে। এজন্য ব্যাংকগুলোর কাছে সিআইবি তথ্যের তাৎক্ষণিক এপিআই-সংযোগ এবং এনজিও গ্রাহকদের জন্য পৃথক ক্রেডিট ব্যুরো গড়ে তোলা দরকার। একই সঙ্গে আমাদের এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক, মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিসের সমন্বয় এবং ডিজিটাল সাপ্লাই-চেইন ফাইন্যান্সকে কাজে লাগিয়ে আমরা প্রত্যন্ত উদ্যোক্তাদেরও আনুষ্ঠানিক অর্থায়নে নিয়ে আসছি। বিকাশের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত আমাদের ফ্ল্যাগশিপ ‘ন্যানো লোন’, সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে তাৎক্ষণিক ক্ষুদ্র ঋণ পৌঁছে দিচ্ছে বিপুল সাধারণ মানুষের কাছে, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি বেসরকারি ক্রেডিট ব্যুরো প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনপ্রাপ্ত অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম সিটি ব্যাংক—‘সিটি ক্রেডিট ব্যুরো’র মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও বিকল্প উপাত্ত—যেমন টেলিকম, ইউটিলিটি বিল ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেনের ধরন কাজে লাগিয়ে ঋণগ্রহীতার সামগ্রিক ঋণযোগ্যতা যাচাই করা সম্ভব, যা এসএমই খাতে ঋণ প্রদানের সক্ষমতা আরো বাড়াবে বলেই আশা রাখি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা বাস্তবায়নে সিটি ব্যাংকের পদক্ষেপ নিয়ে জানতে চাই।

এসএমই ও নারী উদ্যোক্তাবান্ধব নীতিমালা এবং পুনঃঅর্থায়ন স্কিম প্রণয়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিবাচক ও দূরদর্শী ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে, যা সমগ্র খাতের অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে দিচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক সিএমএসএমই খাতের জন্য ১৮ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম, এসএমইডিপি-২ আওতাধীন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম, জামানত-সংকট লাঘবে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালু রেখেছে। আমরা এসব স্কিমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছি। নারী উদ্যোক্তাদের ১ কোটি টাকা পর্যন্ত মাত্র ৫ শতাংশ সুদে ঋণ পৌঁছে দিচ্ছি এবং ৪৯৫টির বেশি এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে এ সুবিধার প্রান্তিক বিস্তার ঘটাচ্ছি। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যার আওতায় বন্ধ শিল্পের জন্য ২০ হাজার কোটি, কৃষি ও গ্রামীণ হাবের জন্য ১৩ হাজার কোটি এবং রফতানি বৈচিত্র্যকরণে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ প্যাকেজে কুটির, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও মাইক্রো (সিএমএসএমই) খাতের জন্য পৃথকভাবে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা সাশ্রয়ী সুদে এসএমই উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন-সুবিধা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের মধ্যে মোট ঋণের ২৫ এবং ২০২৯ সালের মধ্যে অন্তত ২৭ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত; মাইক্রো ও ক্ষুদ্র খাতে আমাদের ২৬ শতাংশ নারী পোর্টফোলিও সেই দিকনির্দেশনার সঙ্গে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ। সেই সঙ্গে শাখা ও এজেন্টভিত্তিক টার্গেট, নিবিড় মনিটরিং এবং সচেতনতামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা এ লক্ষ্য পূরণে কাজ করছি।