ব্যবসা সম্প্রসারণের স্বপ্ন ছিল, কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণে প্রয়োজনীয় পুঁজি ছিল না। সেই সময় এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন পদক্ষেপ মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রের কথা। প্রথমবার মাত্র ১ লাখ টাকা ঋণ নেন তিনি। সেই অর্থের পরিমাণ হয়তো খুব বড় ছিল না, কিন্তু সেটিই হয়ে ওঠে তার জীবনের মোড় পরিবর্তনের সূচনা।
আজ সেই সাধনা ঘোষ শুধু দুধ ব্যবসায়ী নন। তিনি নিজের একটি মিষ্টির দোকানের মালিক। গ্রামের মধ্যে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন দোতলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন। ভবিষ্যতে তার ব্যবসাকে উপজেলা ও জেলা শহর পর্যন্ত সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রায় একই রকম আরেকটি গল্প নওগাঁর মান্দা উপজেলার শামুকখোল গ্রামের মোছা. মন্জুয়ারা বেগমের। বাজারের একটি ছোট্ট চায়ের দোকান ছিল তার পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস। সীমিত আয় দিয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেলেও তিনি কখনো বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেননি। সেই স্বপ্নের পাশে দাঁড়ায় পদক্ষেপ মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র।
পদক্ষেপের ঋণ সহায়তা নিয়ে তিনি চায়ের দোকানের পাশাপাশি মুদি ব্যবসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে ব্যবসা বড় হতে থাকে। বর্তমানে তিনি মুদি ব্যবসার পাশাপাশি ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য আরো একটি দোকান ভাড়া নিয়েছেন। এলাকায় একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি এখন পরিচিত মুখ।
সাধনা ঘোষ কিংবা মন্জুয়ারা বেগমের গল্প কোনো ব্যতিক্রম নয়। একসময় সংসারের নিত্যপ্রয়োজন মেটাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হতো, আজ সেই নারীরাই নিজেদের ব্যবসা পরিচালনা করছেন, কর্মসংস্থান তৈরি করছেন এবং পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করছেন। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির নীরব এ বিপ্লবের পেছনে রয়েছে হাজারো সংগ্রামের গল্প, অগণিত স্বপ্নের গল্প। সেই গল্পগুলোর পরিবর্তনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী হয়ে জড়িয়ে আছে পদক্ষেপ মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র।
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর টেকসই উন্নয়নকে কেন্দ্র করে ১৯৮৬ সাল থেকে প্রায় ৪০ বছর ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে পদক্ষেপ মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র। দীর্ঘ এ চার দশকের যাত্রায় প্রতিষ্ঠানটি শুধু আর্থিক সেবা প্রদানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সক্ষমতা উন্নয়ন, অর্থায়ন সহযোগিতা, বাজার সংযোগ, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ এবং সামাজিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে একটি সমন্বিত উন্নয়ন চক্র মডেল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৭৫০টিরও বেশি শাখা কার্যালয় এবং ১১ হাজারের বেশি নিবেদিত কর্মীর মাধ্যমে পদক্ষেপ এক কোটিরও অধিক উপকারভোগীর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে ভূমিকা রাখছে। এতে শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক উন্নয়ন নয়, স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে পদক্ষেপ।
নারী উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে তুলতে পদক্ষেপ এ পর্যন্ত প্রায় ২৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। বর্তমানে পদক্ষেপ ৪ লাখ ৬১ হাজার ১৬৮ জন নারী ঋণগ্রহীতার মাধ্যমে প্রায় ২৩ লাখ নারী উদ্যোক্তার পাশে দাঁড়িয়েছে।
পদক্ষেপের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ঋণ গ্রহণ করছেন ৩৬-৪৫ বছর বয়সী নারীরা। মোট নারী ঋণগ্রহীতার ৪৩ শতাংশ এ বয়সসীমার, যার সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের নারীরাও ধীরে ধীরে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে এগিয়ে আসছেন। ২৬-৩৫ বছর বয়সী নারীদের অংশগ্রহণ ২৫ এবং ১৮-২৫ বছর বয়সী তরুণীদের অংশগ্রহণ ৮ শতাংশ।
খাতভিত্তিক বিনিয়োগের চিত্রও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। গবাদিপশু, পোলট্রি ও মৎস্য পালন খাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যা নারী উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ ক্ষেত্র। কৃষি, চাষাবাদ, বাগান ও কৃষি সহায়ক কর্মকাণ্ডে বিতরণ করা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। ক্ষুদ্র ব্যবসা, ক্ষুদ্র উৎপাদন ও সেবা খাতে অর্থায়নের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৪৫ কোটি টাকা। পাশাপাশি আইসিটি ও ডিজিটাল ব্যবসা খাতে প্রায় ২৩ কোটি টাকা এবং হস্তশিল্প খাতে প্রায় ২৩ কোটি টাকা।
পদক্ষেপের উপনির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ রিসালাত সিদ্দীক বলেন, ‘দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, নারীদের মধ্যে স্বপ্ন, দক্ষতা ও পরিশ্রম করার অদম্য মানসিকতার কোনো অভাব নেই। অনেক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধতা তৈরি করে পুঁজি, বাজার সংযোগ কিংবা তথ্য ও প্রযুক্তির সুযোগের অভাব। কিন্তু সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে তারাই হয়ে ওঠেন পরিবার, সমাজ ও স্থানীয় অর্থনীতির পরিবর্তনের অগ্রদূত। ।’
তিনি আরো বলেন, ‘ বর্তমানে আমরা দেখছি, অনেক নারী উদ্যোক্তা ডিজিটাল আর্থিক সেবা, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন লেনদেন ও প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। এ ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি তাদের ব্যবসাকে আরো টেকসই, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে।’
পদক্ষেপের নির্বাহী পরিচালক মো. সালেহ বিন সামস বলেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় নারীরা এখন আর শুধু অংশগ্রহণকারী নন, তারা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। একজন নারীর হাতে যখন আয় ও আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আসে, তখন তার সুফল শুধু একটি পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক মর্যাদা ও স্থানীয় অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে। এ কারণেই পদক্ষেপ নারীকে শুধু ঋণগ্রহীতা হিসেবে নয়, বরং সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা হিসেবে দেখার চেষ্টা করে।’
বিশ্ব এমএসএমই দিবসের প্রেক্ষাপটে পদক্ষেপের এ উদ্যোগ নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের সবচেয়ে কার্যকর বিনিয়োগ হলো মানুষের সম্ভাবনার ওপর বিনিয়োগ। সেই সম্ভাবনার সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ দেখা যায় একজন নারীর আত্মবিশ্বাসে, তার স্বাবলম্বিতায় ও তার স্বপ্নপূরণের গল্পে।










