কৃষি খাতের বাইরে সর্বাধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি এমএসএমই খাত তরুণ, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্যোক্তা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তুলনামূলক কম মূলধনে ব্যবসা শুরু করার সুযোগ থাকায় নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে এ খাতের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এ খাতের অবদান অপরিসীম। তাই টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সহজ অর্থায়ন, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে আরো গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৯ সালের মধ্যে মোট ঋণ ও অগ্রিমের ২৭ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিতরণের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমরা ধারাবাহিকভাবে আমাদের সিএমএসএমই ঋণ পোর্টফোলিও সম্প্রসারণ করছি এবং এ লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাচ্ছি। ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরো জোরদার হবে, আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি পাবে এবং সারা দেশে অধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এসএমই খাতের জন্য ডাচ্-বাংলা ব্যাংক কী করছে?
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক সিএমএসএমই খাতের উন্নয়নকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে আমরা সারা দেশের ক্ষুদ্র, ছোট, মাঝারি ও কুটির উদ্যোক্তাদের জন্য সহজলভ্য ও প্রয়োজনভিত্তিক অর্থায়ন সেবা প্রদান করছি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগের আওতায় পুনঃঅর্থায়ন তহবিল, নারী উদ্যোক্তা ঋণ, ক্লাস্টার ফাইন্যান্সিং, ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম (CGS), প্রি-ফাইন্যান্স ও রি-ফাইন্যান্স সুবিধা এবং স্টার্টআপ ফান্ড বাস্তবায়নে আমরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছি।
অর্থায়নের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নেও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতায় পরিচালিত Skills for Industry Competitiveness and Innovation Program (SICIP) এর মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫০ জন নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, যাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে সফলভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছেন।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে আরো শক্তিশালী করতে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। বর্তমানে আমাদের ২৪৩টি শাখা, ৩৪৪টি উপশাখা, ৬ হাজার ৩২৯টি সিআরএম ও এটিএম, ১ হাজার ৫১৬টি ফাস্ট ট্র্যাক এবং ৫ হাজার ৬৩৫টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট রয়েছে।
বর্তমানে আমরা ৬.৫৮ কোটিরও বেশি গ্রাহককে সেবা প্রদান করছি। এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহকদের প্রায় ৭৫ শতাংশ গ্রামীণ এলাকার এবং ৪১ শতাংশের বেশি নারী, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। একই সঙ্গে ‘একটি গ্রাম, একটি পণ্য (OVOP)’ উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় উদ্যোক্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে আমরা কাজ করছি।
আমাদের লক্ষ্য শুধু ঋণ প্রদান নয়; বরং প্রযুক্তিনির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি সহায়ক আর্থিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, যা দেশের সিএমএসএমই খাতের টেকসই উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদে ভূমিকা রাখবে।
অর্থনীতির এ চ্যালেঞ্জিং সময়ে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আরো কী ধরনের ভূমিকা রাখা দরকার বলে মনে করেন?
বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে এসএমই উদ্যোক্তাদের টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আরো সক্রিয় ও উদ্যোক্তাবান্ধব ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে সহজ শর্তে ও দ্রুত ঋণ প্রদান, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা এবং পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের আর্থিক সাক্ষরতা, ব্যবসা উন্নয়ন পরামর্শ, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং বাজার সংযোগে সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।
এছাড়া তথ্যভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন, ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থায়ন এবং পরিবেশবান্ধব ও উদ্ভাবনী উদ্যোগে বিশেষ প্রণোদনা প্রদান করলে এসএমই খাত আরো শক্তিশালী হবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল অর্থায়নকারী নয়, বরং উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করতে হবে।
এ বছর এমএসএমই দিবসে তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে আপনার ব্যাংক কী ধরনের বিশেষ ঋণপণ্য বা সেবা দিচ্ছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগের আওতায় ডাচ্-বাংলা ব্যাংক নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষায়িত অর্থায়ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে।
ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণে সহায়তা দিতে আমরা সহজ শর্তে ঋণ, সহজ ডকুমেন্টেশন, প্রতিযোগিতামূলক সুদহার এবং পরামর্শসেবা দিয়ে থাকি। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচি এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নবিষয়ক সচেতনতামূলক সেশনের আয়োজন করা হয়।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকের দুটি বিশেষায়িত এসএমই ঋণপণ্য—‘সফলতা’ ও ‘উৎসাহ’। এসব পণ্যের আওতায় বার্ষিক ৫ শতাংশ সুদে ক্যাশ ক্রেডিট ও টার্ম লোন সুবিধা দেয়া হচ্ছে।
এছাড়া উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক স্টার্টআপ ফান্ড ‘অংকুর’-এর মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
আমরা বিশ্বাস করি, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার অন্যতম পূর্বশর্ত। তাই অর্থায়নের পাশাপাশি আর্থিক সাক্ষরতা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও পরামর্শসেবার মাধ্যমেও তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা এসএমই খাতের অর্থায়ন ও ব্যবসা পরিচালনায় আরো কীভাবে কাজে লাগানো যায়?
আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সিএমএসএমই খাতের অর্থায়ন ও ব্যবসা পরিচালনাকে আরো সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করে তুলতে পারে। ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং ই-কমার্স প্লাটফর্মের ডেটা ব্যবহার করে উদ্যোক্তাদের ঋণযোগ্যতা দ্রুত ও নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব, যা অর্থায়ন প্রক্রিয়াকে আরো গতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে।
অনলাইন ঋণ আবেদন, ডিজিটাল কেওয়াইসি, ই-সিগনেচার এবং স্বয়ংক্রিয় ঋণ অনুমোদন ব্যবস্থার মাধ্যমে ঋণপ্রাপ্তির সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের উদ্যোক্তারাও সহজে ব্যাংকিং সেবা ও অর্থায়নের আওতায় আসতে পারেন।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক তার সমন্বিত ডকুমেন্টেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ডিএমএস) ব্যবহার করে ঋণ আবেদন, মূল্যায়ন, অনুমোদন, বিতরণ থেকে শুরু করে নথি সংরক্ষণ পর্যন্ত পুরো সিএমএসএমই ঋণপ্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করেছে। স্বয়ংক্রিয় কর্মপ্রবাহ ও ডেটাভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা সেবার গতি ও দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে।
এ ছাড়া NexusPay-এর মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি গ্রাহক দেশ ও বিদেশ থেকে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করছেন। মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং, কিউআর কোডভিত্তিক পেমেন্ট, ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ ও ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট সেবা উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক লেনদেনকে আরো সহজ, নিরাপদ ও স্বচ্ছ করছে।
সিএমএসএমই খাতের টেকসই উন্নয়ন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবার প্রসার এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতের জন্য পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা প্যাকেজকে আমরা সিএমএসএমই খাতের উন্নয়নে একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে দেখি। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ এবং ক্লাস্টারভিত্তিক ব্যবসা উদ্যোক্তাদের জন্য এসব উদ্যোগ অর্থায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন কর্মসূচি—যেমন পুনঃঅর্থায়ন তহবিল, প্রি-ফাইন্যান্স সুবিধা, ক্লাস্টার ফাইন্যান্সিং, ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম (সিজিএস), নারী উদ্যোক্তা অর্থায়ন এবং স্টার্টআপ ফান্ড—বাস্তবায়নে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে।
আমাদের বিশ্বাস, অর্থায়নের সুযোগ শুধু বড় শহর বা প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তাই আমরা ঋণপ্রক্রিয়া সহজ করছি, ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়াচ্ছি এবং আমাদের শাখা, এজেন্ট ব্যাংকিং ও ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছি।
আমাদের লক্ষ্য শুধু ঋণ বিতরণ নয়; বরং উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সহায়ক আর্থিক পরিবেশ গড়ে তোলা, যাতে তারা টেকসইভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারেন এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আরো বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।










