একই সময়ে এ খাতে খেলাপি ঋণও বেড়েছে। এসব কিছুই এটাই নির্দেশ করে যে টেকসই প্রবৃদ্ধির ওপর মনোযোগ দেয়ার পরিবর্তে খাতটি টিকে থাকার লড়াই করছে। তবু বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সিএমএসএমই খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ; শিল্প খাতেরও প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান সিএমএসএমই খাত থেকেই আসে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কভিড-১৯, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক সংঘাত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের সম্মিলিত প্রভাব ঋণের চাহিদা ও সরবরাহ—উভয়কেই দুর্বল করেছে। ফলে ব্যবসার সম্প্রসারণ ব্যাপকভাবে ধীরগতির হয়ে পড়েছে। এর মাঝেও কিছু আশার দিক রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নীতিসহায়তা, পুনঃঅর্থায়ন স্কিম এবং ডিজিটাল উদ্যোগের মাধ্যমে কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করতে এবং অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে কাজ করছে। অর্থনীতি স্থিতিশীল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিএমএসএমই খাত পুনরায় গতি ফিরে পাবে বলে আশা করছি।
অর্থনীতির এ চ্যালেঞ্জিং সময়ে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকগুলোর কী ধরনের ভূমিকা রাখা দরকার বলে মনে করেন?
বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হলো সিএমএসএমই। বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিম ও নীতিগত প্রণোদনা থাকা সত্ত্বেও অর্থায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। মূল চ্যালেঞ্জ হলো এ খাতের গ্রাহকদের সেবা দেয়ার উচ্চ ব্যয়। অনেক ব্যাংকের কাছে সিএমএসএমই অর্থায়নকে লাভজনক করার মতো বিশেষায়িত অবকাঠামো, উপযুক্ত পণ্য ও ডিজিটাল সেবাপ্রদান মাধ্যম নেই। আবার উদ্যোক্তাদের আর্থিক সাক্ষরতার অভাব, দুর্বল রেকর্ড-কিপিং ও পর্যাপ্ত জামানতের অভাব ঋণ মূল্যায়নের কাজকে কঠিন করে তোলে। তবে টেকসই সিএমএসএমই প্রবৃদ্ধির জন্য জামানতভিত্তিক থেকে ক্যাশ ফ্লো-ভিত্তিক অর্থায়নে রূপান্তর হওয়ার সময় এসেছে বলে মনে হয়।
সিএমএসএমই খাতে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?
সিএমএসএমইকে সহায়তা করা এমটিবির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। প্রতিটি ব্যবসার আর্থিক চাহিদা ভিন্ন; বিশেষ করে উৎপাদন ও বাণিজ্য খাতে। তাই আমরা ক্যাশ ফ্লো-ভিত্তিক ঋণ, বিশেষায়িত অ্যাকাউন্ট, ২৪/৭ ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট, স্বয়ংক্রিয় ঋণ প্রক্রিয়াকরণ, নির্দিষ্ট টিম এবং ক্লাস্টার উন্নয়ন কর্মসূচির মতো সমাধান প্রদান করি। আমাদের ঋণ পোর্টফোলিওতে তা দেখা যায়। আমাদের সিএমএসএমই ঋণের ৩৬ শতাংশই জামানতবিহীন (ক্যাশ ফ্লো-ভিত্তিক) ঋণ। ২০ শতাংশ নারীদের, ৭৮ শতাংশ কুটির, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোগে এবং ৫৩ শতাংশ উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
আমরা ডিজিটাল ঋণদান ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন সম্প্রসারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গেও কাজ করছি। এমটিবি ২০৩০ সালের মধ্যে উদ্ভাবনী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রযুক্তিচালিত সমাধান প্রদানের মাধ্যমে সিএমএসএমই ব্যাংকিংয়ে নেতৃত্বস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হতে চায়।
রফতানি বাণিজ্যে সিএমএসএমই খাত অনেক পিছিয়ে আছে। এ চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবেলা করা যায়?
বাংলাদেশের অনেক সিএমএসএমই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু ছোট আমদানিকারকরা পর্যাপ্ত জামানতের অভাব, বাজার সম্পর্কে সীমিত জ্ঞান এবং দুর্বল দরকষাকষির ক্ষমতার কারণে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে এবং অর্থায়ন পেতে হিমশিম খান। অধিকাংশ সিএমএসএমই বড় রফতানিকারকদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। ফলে তাদের নিজস্ব রফতানি সক্ষমতার সনদ তৈরি করা এবং বিশেষায়িত অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বড় করপোরেট গ্রুপগুলো সিএমএসএমইর প্রচলিত বাজারগুলোয় প্রবেশ করায় প্রতিযোগিতা বাড়ছে, যা ছোটদের কোণঠাসা করে ফেলছে। এছাড়া সাম্প্রতিক বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা বাণিজ্যনির্ভর সিএমএসএমই ব্যবসায় বিঘ্ন ঘটিয়েছে। তবে ব্যাংকগুলো রিভলভিং ক্রেডিট সুবিধা, চলতি মূলধন সহায়তা এবং বিশেষায়িত ট্রেড ফাইন্যান্স সমাধান নিয়ে আসায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। সঠিক আর্থিক পণ্য, পরামর্শ সেবা এবং ডিজিটাল ট্রেড প্লাটফর্মের মাধ্যমে ট্রেড ফাইন্যান্স বাংলাদেশের সিএমএসএমইগুলোর জন্য প্রবৃদ্ধির একটি বড় চালিকাশক্তি হতে পারে।
দেশের সিএমএসএমই খাতের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই সরাসরি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পায় না। এ চ্যালেঞ্জ কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়?
সিএমএসএমই অর্থায়নের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি, ডেটা ও ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের ওপর গড়ে উঠবে। প্রচলিত রিলেশনশিপ ম্যানেজারনির্ভর ঋণ প্রদান ব্যয়বহুল এবং এখানে মুনাফার হারও কমে আসে। ব্যাংকগুলো ঋণগ্রহীতাদের মূল্যায়নের জন্য লেনদেনের ইতিহাস, মোবাইল ওয়ালেট অ্যাক্টিভিটি, ই-কমার্স রেকর্ড ও মার্চেন্ট পেমেন্টের ডিজিটাল ডেটার ওপর নির্ভরতা বাড়াবে। স্বয়ংক্রিয় ক্রেডিট স্কোরিং ঋণ প্রদানকে দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে।
ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলো ব্যাংকগুলোকে বড় শাখা নেটওয়ার্ক ছাড়াই দেশব্যাপী উদ্যোক্তাদের সেবা দেয়ার সুযোগ করে দেবে, যা খরচ কমাবে এবং অন্তর্ভুক্তির প্রসার ঘটাবে। ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা ঝুঁকি মূল্যায়ন উন্নত করবে এবং ঋণদানের পরিধি বাড়াবে। যারা প্রযুক্তি, ডেটা ও গ্রাহককেন্দ্রিক উদ্ভাবন ব্যবহার করে নিরবচ্ছিন্ন ও টেকসই সিএমএসএমই অর্থায়ন নিশ্চিত করতে পারবে, তারাই সফল হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ ও টিকে থাকতে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া যায়?
বিশ্বায়ন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ—উভয়ই নিয়ে আসে। আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য সিএমএসএমইগুলোকে শুধু দামের দিকে তাকালে হবে না, বরং গুণমান, কমপ্লায়েন্স, উদ্ভাবন ও স্থায়িত্বের দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। এজন্য নিয়ন্ত্রণমূলক কমপ্লায়েন্স শক্তিশালী করা, সনদ অর্জন, পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি গ্রহণ এবং পণ্যের গুণমান ও দক্ষতা বাড়ানো উচিত। প্রযুক্তি, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও জনশক্তির দক্ষতার পেছনে বিনিয়োগ অপরিহার্য। নীতিনির্ধারকরা প্রণোদনা, বাজারে প্রবেশাধিকার সহজতর করা, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাস্টারকে সহায়তা করার মাধ্যমে সাহায্য করতে পারেন। সঠিক উদ্যোগ, উদ্ভাবন, নীতিসহায়তা ও অর্থায়নের সমন্বয়ে বাংলাদেশের সিএমএসএমই বিশ্ববাজারে সফল হতে পারে।










